বাবা আমার প্রিয় বাবা

../news_img/44502 mrik nu i k.jpg

সুমন মাহবুব চৌধুরী :: ২৩ টি বছর কেটে গেল।২৪ জানুয়ারি ১৯৯৪। চরম শোকের সেই দিনটি জীবন থেকে কখনও বিস্মৃত হবে না। সোহাগ, আদর আর শাসন সব ত্যাগ করে চিরকালের জন্য বাবা পাড়ি দিলেন অপারে ।
আমার জানা সকল পুরুষের মধ্যে বাবা ছিলেন আমার আদর্শ।

কিশোর বয়সে আত্মীয়দের কাছে কত যে শুনেছি 'বাবার মতো বুদ্ধিমান হবি।' এ কথা গুলো কেমন যেন কৌতুহলটাকে আরও শিহরিত করত।দশ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি। স্মৃতি যখন থেকে আমার বিশস্ত তখন থেকেই বাবার প্রতিটি স্মৃতি যেমন স্বচ্ছ তেমনি প্রতিটি অনুভূতিও জীবন্ত।
দুই সন্তানের জনক এই সুশৃংখল অশান্ত যুবককে কখনো যেমন টানা এক বছর একই জায়গায় জব করতে দেখিনি তেমনি এক সপ্তাহ ঘরে থাকতেও দেখিনি। ইন্টারভিউ ভাল যায়নি এমন কথা ছিল খুবই বিরল। কোন মামা-চাচা বা রাজনৈতিক শক্তি ছাড়াই নিজেকে নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়েছিলেন।

নামাজে, দোকানে অথবা অন্য যেকোন জায়গায় যখনই একসাথে বাবার সাথে বের হতাম বাবা সব সময় বিভিন্ন আই কিউ জিজ্ঞেস করতেন। আর এগুলোর উত্তর জেনে বন্ধুদের জব্দ করার মধ্যে ছিল আমার কৃতিত্ব। মামার কাছে শুনেছি। একবার রাত ১২টার দিকে আমি মিষ্টি খাবার জন্য কান্না করছি। বাবার অনুরোধে মেহমান মামা রাত ২টা মিষ্টি নিয়ে ঘরে ফিরলেন। কথা গুলো যখন মামা বলছিলেন তখন শুধু আমার নয় মামার চোখেও ছলছল করছিল।

আমি তখন ক্লাস ফোরে। পাড়ার দোকানে বাবা বলেছিলেন আমি যা খেতে চাই তা দিয়ে বাকীর খাতায়  লিখে রাখতে। চতুর দোকানী প্রথম মাসেই ৪৫০০/= টাকা বিল পাঠালেন। বাবা আমাকে আদর করে জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারলেন ঠিকই কিন্তু কিছুই বললেন না কসাই দোকানীকে।আমার বেশ মনে আছে, আমাদের পরিবারে তখন বেশ টান পোড়ান চলছিল। ঘরের খরচে বেশ প্রভাব পড়ল। বাবা বেনসন ছেড়ে গোল্ড লীফ খেতেন। একদিন আমার নাস্তার দুধ কিনার জন্য চেইন ম্সোকার বাবা তার সিগারেট টাও কেনেন নি। এই ভালোবাসা আমাকে আজও ব্যাকুল করে তুলে।আজ আমিও একজন বাবা। প্রতিদিন অন্তত শতবার বাবা ডাক শুনতে পাই। কিন্তু প্রান ভরে বাবা ডাকার আমার সেই বাবা আজ আর নেই। বাবা হওয়ার অনুভূতি যেন বাবা হারানোর অনুভূতিকে কখনই হার মানাতে পারবে না। আদর্শ পিতা পাওয়া যতটা ভাগ্যের, ভাল বাবা হওয়া তারচেয়ে অনেক অনেক কষ্টসাধ্য।
যখনই বাবার জন্য মনটা ছটফট করে, চেষ্টা করি নিজের ভালো কাজের মধ্যে বাবার আত্মাকে শান্তি দিতে। সেটা হতে পারে কারো নিঃস্বার্থ নিতান্ত কোশলাদি জিজ্ঞেস করা। অথবা কোন অসহায় বাবাকে একটু সাহায্য করা বা একটু সহানুভূতি দেখানো। আসলে নির্মম হলেও সত্য যে আমাদের সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের বা আমাদের প্রজন্মের কর্মই অমর হয়ে থাকবে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অসহায় বাবা যেমন সুলভ তেমনি অনাথ অসহায় শিশুও সহজ লভ্য।
একটু সদিচ্ছা থাকলে এই অমৃত স্বর্গীয় অনুভূতি ভোগ করা যায়। সময় কিংবা অর্থ আমরা প্রতিদিন কত অকারণে অকাজে ব্যয় করি। কিন্তু এর শুধু মাত্র দশ শতাংশ আমরা এদের সাথে ব্যয় করলে সেটা হতে পারতো অন্যের বিরাট সাহায্য অথবা নিজের আত্মার পরম প্রশান্তি। আর বিধাতার প্রতিদান তো রইলো।

``বাবা’’। আমি তোমার যোগ্য সন্তান কিনা জানিনা কিন্তু তুমি আমার প্রতিবারের প্রার্থনার এক বিশেষ অংশ।

-স্টকহোম, সুইডেন।