চাকরি নামের সোনার হরিণ ও আমাদের আত্মহত্যা

../news_img/shahabuddin shuvo.jpg

শাহাবুদ্দিন শুভ :: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গানে লিখেছেন ‘‘তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই’’। কবির কাছে সোনার হরিণটাই সবচেয়ে মূল্যবান মনে হয়েছে। অন্য কারো কোন লেখাতে এর চেয়ে মূল্যবান কোন কিছু না পাওয়াতে এখন অবধি সোনার হরিণটাই সবচেয়ে দামি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। আর তাই দেশের বেকাররাও চাকরিকে সোনার হরিণে সাথে তুলনা করে আসছেন।  কথায় কথায় বলেও পেলেন চাকরি যেন সোনার হরিণ। আর আসলেও তাই।  দেশে প্রতিনিয়ত শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলছে। তার সাথে যে অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে না তাও নয়। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে পাশ করে বের হওয়ার পরও চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও কম নয় দেশে।

দেশের চাকরি বাজার কেমন তা একটা বাস্তব উদাহরণ দিলে হয়তো বুঝা যাবে। আমার পরিচিত তিনজন একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে জব করতেন। বেতন ভাতা বেশ ভাল ছিল। বছরে দেশের বাহিরে ও ভেতরে ট্রিপ। সাজানো গোছানো অফিস কাজের ফাকে ঘুম আসলে যাতে ঘুমাতে পারেন তার জন্য একটি রুমও আলাদা ছিল ‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি’ নামে। হঠাৎ দু:সংবাদ বাংলাদেশের তাদের কার্যক্রম অনেকটা গুটিয়ে নেবে কোম্পানি। তাই তিন মাসের বেতন দিয়ে বিদায় দেওয়া হল তাদের। একজন ৪ মাসের অন্য জন্য ৬ মাসের মাথায় মোটামুটি আগের বেতনের অর্ধেক দিয়ে চাকরি জোগাড় করতে পেরেছেন। অন্যজন ব্যাঙ্গালুর থেকে আইটিতে অনার্স মাস্টার্স করা। দেশের এস এস সি ও এইচ এস সি সহ সবগুলোতেই ভাল রেজাল্ট। আজ অবধি ৬ মাস চলে যাওয়ার পর এখনও তিনি বেকার। সমাজের স্ট্যাটাস অনুযায়ী চলার মত পাচ্ছে না কোন চাকরি। সেখানে যারা বিশ^বিদ্যালয় থেকে নতুন বের হন। যাতের আদৌ কোন অভিজ্ঞতা হয়নি তাদের কি অবস্থা হয় তা সহজেই অনুমেয়।
চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার ঘটনা কম না। তার সব গুলো খবর হয়তো মিডিয়াতে আসে না বলে আমাদেরও জানা হয় না।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ৪৪৯ নম্বর কক্ষে সাবেক আবাসিক ছাত্র তারেক আজিজের আত্মহত্যা করেন। তারেক আজিজ ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে দর্শন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের কৃষক বাবার ছেলে তারেক ২০১৪ সালে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েও কোথাও চাকরি পাননি। বিভিন্ন স্থানে চাকরির জন্য আবেদন করলেও টাকার জন্য হয়নি। যেখানেই আবেদন করতেন, সেখান থেকে ৮-১০ লাখ টাকার কথা বলা হতো। টাকার কথা শুনে তারেকের বাবা বলেছিলেন, ‘তাহলে পড়ালেখা না করে আমার সঙ্গে মাঠে কাজ করলেই পারতিস। ’ এমন অবস্থায় গত মে মাসে আত্মহত্যা করেন তারেক আজিজ। প্রায় একই পরিস্থিতিতে গত জানুয়ারিতে আত্মহত্যা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস করা মানিকগঞ্জের ঘিওরের মেয়ে সুক্তি। অবশ্য আত্মহত্যার পাঁচ মাস পরে সুক্তির নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরির নিয়োগপত্র এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের কক্ষের ঠিকানায়।


বুদ্ধিমান যন্ত্রের কারণে বেকার হবে বিশ্বের অর্ধেক মানুষ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন যন্ত্র কাজ শুরু করলে মানুষের আর প্রয়োজন হবে না নানা কাজে। বর্তমানে যে হারে বুদ্ধিমান যন্ত্রপাতি তৈরির গবেষণা এগোচ্ছে তার ভিত্তিতে গবেষকরা জানিয়েছেন এ তথ্য। এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানিয়েছে গার্ডিয়ান। এখনই নানা যন্ত্রপাতির কারণে মানুষের কাজ অনেক কমে গেছে। এ ধারা অক্ষুণ্ণ থাকলে আগামী ৩০ বছর পর বিশ্বের অর্ধেক মানুষই বেকার হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন একজন কম্পিউটার গবেষক।
‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সকে (এএএএস) এ বিষয়ে গবেষক মোশে ভার্ডি বলেন, ‘আমরা এমন একটা সময়ের দিকে যাচ্ছি যখন যন্ত্রপাতির ক্ষমতা মানুষকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ’ আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। ঢাকা শহরে যে হারের বিভিন্ন ফ্লাইওভারসহ অনন্য স্থাপনার কাচ চলেছে, সেগুলোতেও মেশিনের আধিক্য বেশী। যে কাজে আগে একশ মানুষের প্রয়োজন হত সে কাজ অনায়াসেই করে দিচ্ছে একটি মেশিন। এতে করে নির্মাণ কাজের সাথে যারা জড়িত ছিলেন তাদের বেকারত্বের সংখ্যাও অনেক বেশী। কৃষি কাজও প্রযুক্তি নির্ভর হওয়ার ফলে যেখানে আগে ধান কাটা থেকে শুরু করে মাড়াই পর্যন্ত  শ্রমিকের প্রয়োজন হত তা এখন কেবল ধান কাঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। কারণ ধান মাড়াই’র কাজ আর গরু দিয়ে যেহেতু হয় না সেক্ষেত্রে শ্রমিকও লাগে না। শুধু মাত্র একটি ধান মাড়াই মেশিন হলে অতি সহজেই কাজ করা যাচ্ছে। এতে করে দেশের সিংহভাগ অদক্ষ শ্রমিক যারা কৃষি কাজের সাথে জড়িত ছিল তারাও বেকার হয়ে যাচ্ছে। এরকম বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা বেকার হচ্ছেন তাদের আমরা নতুন করে কোন কাজে নিতে পারছি না। সাথে সাথে নতুন কোন কর্মসংস্থানেরও যে কোন ব্যবস্থা হচ্ছে তাও নয়। এতে করে প্রতি বছর দেশের উপর বেকারত্বের বুঝা বেড়েই চলছে!

চাকরি ক্ষেত্রে দেশের অবস্থা কেমন তা ফুটে উঠেছে ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদনে, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, বেকারদের মধ্যে চিকিৎসক-প্রকৌশলীর হার ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। নারী চিকিৎসক-প্রকৌশলীর মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩১ শতাংশ। এর পরই আছেন উচ্চমাধ্যমিক ডিগ্রিধারীরা। তাদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০টি সর্বাধিক বেকারত্বের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২। আইএলও ‘বিশ্ব কর্মসংস্থান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ৪.৩৩ শতাংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৬ সাল শেষে মোট বেকার দ্বিগুণ হবে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ’৯৫ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ। কিন্তু ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে ১ কোটি ৩২ লাখে দাঁড়ায়।’  (বাংলাদেশ প্রতিদিন ১০.১২.২০১৬)
অবশ্য বিবিএসসের ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য দিয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৬ লাখ বেকার রয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ যুবক-যুবতী। তারা ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী। এ বয়সী ১৯ লাখ ৩৯ হাজার তরুণ-তরুণী কোনও কাজ করেন না। তারা সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজও করার সুযোগ পান না, অথচ সব সময়ই কাজের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকেন।

ড. ইউনূস ২ বছর আগে বলেছিলেন, ‘সামাজিক ব্যবসা দিয়েই এই বেকারত্বের সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের স্বপ্ন ও উদ্যোগ দিয়ে বেকারত্ব দূর করতে চাই। পৃথিবীতে এমন পরিস্থিতি আসবে, যখন বেকারত্ব বলে কিছু থাকবে না।’ ড. ইউনুস এর কথা যদি ঠিক থাকে তাহলে দেশ থেকে বেকারত্ব কমে যাওয়ার কথা কিন্তু আমাদের দেশের বেকার সংখ্যা কি কমছে? আইএলও ‘বিশ্ব কর্মসংস্থান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ৪.৩৩ শতাংশ। আগামীতে এই হার দ্বিগুণ হবে বলে আশংকা করছে সংস্থাটি।
কর্মসংস্থানের বিষয়ে বলতে গিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘কেউ যদি কোনও চাকরি না পায় তাহলে সমাজ তাকে ব্যর্থ মনে করে। কেন তাকে ব্যর্থ বলতে হবে। আমি নিজেই তো নিজের কর্মসংস্থান করতে পারি। চাকরি করতেই হবে, এটা হলো পুরনো চিন্তাভাবনা। এসব পুরনো চিন্তাভাবনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।’ (২৯০৬.২০১৪ প্রথম আলো ) আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নিজেরা নিজেদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কতটুকু কঠিন তা কেবল ভুক্তভোগী ছাড়া অনুমান করা কঠিন। যেখানে দেশের ৯৫ ভাগের বেশী বাবা-মা স্বপ্ন দেখেন তার ছেলে পড়া-শোনা শেষ করে একটি ভাল চাকরি করবে। তারা ব্যবসা ও বিদেশে পাঠাতে চান না। যখন একদম নিরুপায় হয়ে চাকরি নামের সোনার হরিণ ধরা যায় না ঠিক তখনই যদি সামর্থ্য থাকে সে অনুযায়ী বিদেশে অথবা ব্যবসার দিকে যান কেউ কেউ। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই তাদের জীবনের কঠিনতম সিদ্ধন্ত নিয়ে নেন সুক্তি বা তারেক আজিজের মত!!