হারিয়ে যাচ্ছে তুরাগ

../news_img/45694 mri nu.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: রাজধানীর গাবতলী থেকে মিরপুর বেড়িবাঁধ ধরে আশুলিয়া পর্যন্ত তুরাগ নামের নদটি খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। বইয়ে লেখা ইতিহাসে, ওই অংশে নদী আছে; ম্যাপেও জানান দিচ্ছে তুরাগের অবস্থানের প্রকৃত চিত্র। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে ইতিহাসের মিল নেই। মিরপুর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটারের মাঝেমধ্যে তুরাগের বুকে পানির দেখা মিললেও বেশিরভাগ অংশে বালু জমে নদীর পিঠ বেরিয়ে এসেছে। দখল-ভরাট আর দূষণে 'নিখোঁজ' হতে চলেছে তুরাগ।

বেড়িবাঁধ ধরে উত্তর দিকে কিছুদূর এগিয়ে চটবাড়ি এলাকায় পেঁৗছলেই দেখা যায় নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে নেবারল্যান্ড পার্ক। বেশ বড় একটি এলাকা বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে; ভেতরে লাগানো হয়েছে গাছপালা। দুটি অবকাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে। নদীর সীমানা পিলারও পড়েছে ওই পার্কের ভেতরে। এরই পাশ দিয়ে কোনো রকমে বয়ে যাচ্ছে মৃতপ্রায় তুরাগ। স্থানীয়রা জানান,

যেখানে পার্কটি গড়ে তোলা হচ্ছে, তা ছিল জলাশয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে বালু ফেলে ভরাট করে পার্কটি করা হয়েছে, এখনও ভরাট চলছে। পার্কের ভেতরে নদীর জায়গাও পড়েছে। বনভোজনের জন্য পার্কটি ভাড়া দেওয়া হয়। এ ছাড়া ওই স্থানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানও হয়। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে পার্কের মালিকদের একজন কৌশিক আহমেদ দাবি করেন, জলাশয় হলেও এটা ছিল ধানি জমি। তারা ছয়জন মিলে মোট ১৩ বিঘা জমি কিনে পার্কটি করেছেন। নদী দখল বা ভরাট তারা করেননি। পার্কের ভেতরে নদীর সীমানা পিলার থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত বর্ষা মৌসুমে নদীতে অনেক পানি থাকায় আমরা প্রকৃত সীমানা পিলার পুঁততে পারিনি। এখন তা নদীর সীমানায় পোঁতা হবে। তবে ম্যাপে দেখা যায়, ওই পয়েন্টে বেড়িবাঁধের পাড় দিয়েই নদীর অবস্থান। পাড় থেকে প্রায় ১০০ গজ রাস্তা নদীর ভেতরে চলে গেছে। সেখানেই গড়ে উঠেছে নেবারল্যান্ড পার্ক। এরপাশে একইভাবে গড়ে উঠেছে তামান্না ফ্যামিলি ওয়ার্ল্ড নামের আরেকটি পার্ক। নকশা অনুযায়ী সেটারও পুরোটাই নদীর ভেতরে পড়েছে। এর পাশেই রয়েছে রফিকের ভাত-ভর্তা হোটেল। এগুলোও মূল সড়ক থেকে নদীর দিকে এগিয়ে করা হয়েছে।

পার্ক ও হোটেল যে নদীর ভেতরে গড়ে উঠেছে তার প্রমাণ হিসেবে নবাবেরবাগের স্থানীয় বাসিন্দা কেরামত হাজি বেড়িবাঁধের পাশে খালের মতো একটি জায়গা দেখালেন। সেখানে এই শুকনো মৌসুমেও পানি আছে। এপাশ-ওপাশ, দুপাশেই পানি। মাঝখানে পানি না থাকার কারণ সেখানে নদী ভরাট করা হয়েছে। কেরামত হাজি আপেক্ষ করে বলেন, চোখের সামনে কীভাবে নদীটি ধীরে ধীরে দখল-দূষণের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে উঠল এখনও তা আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে। ছোট্ট নদীটা আগে অনেক সুন্দর ছিল। এখন নর্দমা হয়ে গেছে।

১৯১২ সালে প্রকাশিত যতীন্দ্র্রমোহন রায়ের 'ঢাকার ইতিহাস' বইয়ে তুরাগ সম্পর্কে লেখা রয়েছে, 'নদীটি ময়মনসিংহ জেলা হইতে আসিয়া দরিয়াপুরের নিকটে ঢাকা জেলায় প্রবেশ লাভ করিয়াছে। তথা হইতে পূর্বাভিমুখে কিয়দ্দূর আসিয়া রাজাবাড়ি, বোয়ালিয়া প্রভৃতি স্থানের পার্শ্বদেশ ভেদ করিয়া পূর্ববাহিনী হইয়াছে। শেনাতুল্লার সনি্নকটে মোড় ঘুরিয়া প্রায় সরলভাবে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হইয়াছে; এবং মৃজাপুর, কাশিমপুর, ধীতপুর, বিরলিয়া, উয়ালিয়া, বনগাঁও প্রভৃতি স্থান তীরে রাখিয়া মীরপুরের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার সহিত মিলিত হইয়াছে।' ওই বইয়ে টঙ্গী নদীকে তুরাগের শাখা এবং মধুপুরের জঙ্গল থেকে বহির্গত শালদহ, লবণদহ ও গোয়ালিয়র নদী তুরাগে মিলিত হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। ওই বইয়ে উল্লেখিত শালদহ, লবণদহ ও গোয়ালিয়র নদী তিনটির মধ্যে শালদহ ও লবণদহ গাজীপুরের শ্রীপুর অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হতো। এখন এ দুটির অস্তিত্বও নেই। গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় গোয়ালিয়র নদীর অবস্থাও না থাকার মতো এবং ঢাকার কাছে এসে স্বয়ং তুরাগ বিপণ্ন।

২০০৫ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকাশিত 'বাংলাদেশের নদনদী' থেকে জানা যায়, তুরাগের উৎসমুখ ভাওয়াল গড়ের পাহাড়ি বংশী এলাকা এবং পতিতমুখ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বুড়িগঙ্গা। প্রবাহিত গতিপথের মধ্যে রয়েছে কালিয়াকৈর, জয়দেবপুর, মির্জাপুর, গাজীপুর, সাভার, মিরপুর ও মোহাম্মদপুর। দৈর্ঘ্য ৭১ কিলোমিটার। এই ৭১ কিলোমিটারের মধ্যে রাজধানীর উপকণ্ঠের ২২ কিলোমিটার ধারাবাহিক দখল ও দূষণে মরণাপন্ন।

সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর এলাকায় বেড়িবাঁধের সিনি্নরটেক থেকে শুরু করে আশুলিয়া পর্যন্ত তুরাগের পাড়ে কয়েকশ' প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দিয়াবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তুরাগের পাড়ঘেঁষে থরে থরে রাখা আছে বালুরাশি। নদীতে ভেড়ানো কার্গো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বালু এনে পাড়ে ফেলা হচ্ছে। সেই বালু এক্সক্যাভেটর দিয়ে কেটে ট্রাকে তোলা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, যেসব স্থানে বালু ফেলা হচ্ছে, সেগুলো ছিল নিচু জলাশয়। কিছু স্থানের জমি নদীর। এভাবে বালু ব্যবসার কারণেও নদীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। দিয়াবাড়ী পয়েন্টে বালু ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা রিপন আলী জানান, ওই জমি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। সেখানেই তিনি বালুর ব্যবসা করছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, এভাবে বালু ব্যবসার কারণে নদীর ক্ষতি হচ্ছে, তার মতো অনেকেই বালুর ব্যবসা করে ক্ষতি করছেন। বালু ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ নদীর জমি দখল করে ভরাট করছেন বলেও জানান তিনি।

দখলদাররা কোথাও কোথাও নদীর সীমানা পিলারও উপড়ে ফেলেছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্যানুযায়ী, তুরাগে ১৫২টি সীমানা পিলারের মধ্যে ৯০টিই অবৈধ দখলের কারণে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বাপা ও নদী রক্ষা আন্দোলনের করা যৌথ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তুরাগের দখল হওয়া জমির পরিমাণ এক হাজার ৩৯৮ একর। অথচ সরেজমিন তুরাগতীরে গিয়ে দখলদারদের সঙ্গে আলাপের সময় তাদের বেশিরভাগই দাবি করেন, এগুলো তাদের কেনা বা পৈতৃক সম্পত্তি।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষর (বিআইডবি্লউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, নদীর সীমানা পর্যন্ত রক্ষার দায়িত্ব বিআইডবি্লউটিএ কর্তৃপক্ষের। নতুন করে তুরাগের সীমানা যাচাই-বাছাই করতে ঢাকা ও গাজীপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে সাড়ে নয় হাজার পিলার তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে সীমানা পিলার অতিক্রম করেও নদী ভরাট বা দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ এমনটি করে থাকলে শিগগির উচ্ছেদ করা হবে। কেউ নদীর জায়গা দখল করে রাখতে পারবে না। তবে নদীতীর এলাকায় বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠা প্রসঙ্গে তিনি জানান, সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তিনি বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে গিয়ে ওইসব দখল দেখিয়েছেন। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে তাদের অনুরোধ করেছেন। কারণ এগুলো সবই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) প্লাবনভূমি হিসেবে চিহ্নিত আছে।

ড্যাপ অনুযায়ী প্লাবনভূমি সংরক্ষণের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা অনুসরণ করা হলে তুরাগতীরে কারও পৈতৃক কিংবা ক্রয়সূত্রে জমি থাকলেও সেখানে এই জাতীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকার দু'পাশেই রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমি। পাউবোর জমির পর এক সময় তুরাগতীরে কৃষকদের কিছু জমিজমা ছিল, যেসব জমিতে ধানসহ অন্য ফসলের চাষও হতো। ফসলি ওই সব জমি কিনে নিয়ে এবং কেনা অংশের পাশ থেকে পাউবোর জমি ইজারা নিয়ে বা দখল করে শিল্প-কারখানা ও পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর কবির সমকালকে বলেন, একটি কংক্রিট মিক্সের প্ল্যান্ট কোম্পানিকে কিছু জমি লিজ দেওয়া আছে। এ ছাড়া ওই স্থানে কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিও আছে, ওই জমিতে যাতায়াতের অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য কিছু জায়গা লিজ দেওয়া রয়েছে। বাকিরা হয়তো অবৈধভাবে দখল করেছে। কেউ যদি নদী তীরবর্তী নিচু জমি ভরাট করে স্থাপনা তৈরি করে সেগুলো দেখার দায়িত্ব ঢাকা জেলা প্রশাসন ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে সরাসরি ওই এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নদী দখল ও ভরাট রোধে মাঝেমধ্যেই অভিযান চালানো হয়। শিগগির আরেকটি অভিযান চালানোর বিষয় চূড়ান্ত করা আছে। যে কোনোদিন আমরা উচ্ছেদ অভিযানে যাব। তবে তিনি মনে করেন, এভাবে মাঝেমাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে নদী রক্ষা করা যাবে না। এ জন্য সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তারা নদীর সীমানা চিহ্নিত করে দেন। কিছুদিন পর দেখা যায় সেসব পিলার নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিলারের সীমা অতিক্রম করেও নদী ভরাট করা হয়।

গাবতলী থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত এলাকার দায়িত্ব পালনকারী রাজউক কর্মকর্তা মোবারক হোসেন জানান, সম্প্রতি ওই এলাকায় গিয়ে বড় ধরনের ৩৫টি অবৈধ অবকাঠামোর তালিকা তিনি তৈরি করেছেন। তার মধ্যে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, বিভিন্ন ধরনের প্ল্যান্ট ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এগুলো অপসারণের জন্য দখলদারদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তার মতে, যেহেতু ওই জায়গাগুলো বিআইডবি্লউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের; সেহেতু অবৈধ দখলদার উচ্ছেদও তাদের মূল ভূমিকা রাখতে হবে। কিন্তু তারা এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

তুরাগসহ ঢাকার চার নদীর জায়গা থেকে দখলদার উচ্ছেদে সরকার নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি সমকালকে বলেন, গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত নদীর দুই কিলোমিটার এলাকা থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে সেখানে চলাচলের সুবিধার্থে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। মিরপুর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত দখলদার উচ্ছেদ এবং উচ্ছেদের পর তারা যেন আবার দখল করতে না পারে সেজন্য কয়েকটি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সমকাল