হাওরের হাহাকার ও আমাদের নববর্ষ

../news_img/49654 mei nu.jpg

মোহাম্মদ সাদিক :: পহেলা বৈশাখ আমাদের নববর্ষ। এ উৎসবের জন্য প্রস্তুত সারা দেশ। নববর্ষের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের অনেকরকম আয়োজন। রঙবেরঙের পোশাক পরা মানুষ, বাঁশি। রঙিন হয়ে উঠবে নগরের রাজপথ, পার্ক, মাঠ, বাড়িঘর। উৎসব-প্রিয় বাঙালির এক মহানন্দের নাম বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। কোনো ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকায় এ উৎসবটির একটি সর্বজনীন ভালোবাসা একে আরও অনেক ব্যাপ্তি দান করেছে। যতদূর জানি- ১৯৬৭ সালে প্রথম নববর্ষের দিনে রমনার বটমূলে ছায়ানট তার প্রথম আয়োজনটি করে। দিন, মাস, বর্ষ পেরিয়ে এখন এ অনুষ্ঠানটি আরও বড় হয়েছে, আরও ব্যাপক হয়েছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রুনিক মাধ্যমের কারণে এটি এখন সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে থাকে। নববর্ষের এই উচ্ছ্বাস এক সময় যেখানে রাজধানীতে আনন্দের উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে, এখন তা বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা এমনকি - আরও অনেক বিস্তৃত হয়েছে। জতির পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তানের উদারতায় এ সংক্রান্ত একটি ভাতা সরকারি কর্মচারীদের দেয়া হয়েছে। এই প্রাপ্তি এই দিনটিকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। নববর্ষের এই আনন্দে কর্পোরেট এবং বেসরকারি উদ্যোগ দিনটিকে একটি অসাধারণ দিনে রূপান্তরিত করেছে। পৃথিবীর যে কোনো দেশের, জাতির, সম্প্রদায়ের চেয়ে বাংলার নববর্ষ উদ্যাপন কোনো অংশে কম নয়।
 
মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে এ দিনের সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। হালখাতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের এই নববর্ষ। এবার আমাদের দেশের একটি বড় অংশে নববর্ষের আনন্দ এবং যাবতীয় রঙ ধুয়ে মুছে গেছে। বৃহত্তর সিলেট অর্থাৎ সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ছাড়া কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ- অনেক এলাকার বড় বড় হাওর- যা হাওর এলাকার মানুষের একমাত্র ফসল, তা বাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে।
 
আমরা জানি, চৈত্রের শেষ এবং বৈশাখের শুরুতে আকাশে মেঘ করলেই হা হা করে ওঠে কৃষকের হৃদয়। এখানে কৃষক বলতে ভূমিমালিক, ভূমিহীন, এমনকি দিনমজুর যারা তাদেরও বুক কেঁপে ওঠে। উদার হাওরজুড়ে হেক্টরের পর হেক্টর ফসলের মাঠ। শীতে কেঁপে, রোদে পুড়ে এই মাঠে ফসল ফলান যারা, তারা জানেন, যদি কোনো কারণে হাওবের ধান ডুবে যায়, তাহলে গৃহস্থ একটি দানাও পাবেন না। একই সঙ্গে সারা বছর যে গৃহস্থের ঘর এই ফসলের জন্য কাজ করেছেন, তিনিও একটি দানা পাবেন না, যিনি একেবারেই দিনমজুর তিনিও জানেন, হাওর ডুবে গেলে হাওরের ধান কাটা, ধান বয়ে নিয়ে আসা, ধান মাড়াই দেয়া, ঝাড় দেয়া, শুকানো- এসবের কোনো পর্বেই তার কোনো কাজ করার সুযোগ থাকবে না। তাকেও রিক্ত, নিঃস্ব হয়ে উদর শূন্য অবস্থায় সারা বছর ফ্যা ফ্যা করতে হবে। হাওর পাড়ের মানুষ তাই হাওরের ফসলের বিষয়ে একই সূত্রে গাঁথা- সে বড় গৃহস্থই হোক আর দিনমজুরই হোক। অন্যান্য অনেক বছরের মতো এবার হাওর পারের সর্বস্তরের মানুষ- নারী-পুরুষ, যুবক-শিশু, ধনী-নির্ধন সবার কান্না এক বিন্দুতে এসেছে মিশেছে।
 
কতভাবে গেছে ধান- শুধু কি পানিতে? বাঁধ রক্ষার দায়িত্ব ছিল পানি উন্নয়ন বোর্ডের যে কর্মকর্তাদের, ঠিকাদার হিসেবে যারা বরাদ্দকৃত অর্থে- বিলাসী জীবন-যাপন করেন, তাদের প্রভাব ও অবহেলায়, হাজার বছর ধরে হাওর পারের নিরীহ সহজ-সরল মানুষের প্রকৃতির ওপর দোষারোপ করে কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে ফেলার শান্ত্বনা- এর সবকিছু মিলিয়ে- বিপদের এক বৈশাখ এসে দাঁড়িয়েছে হাওর পারের মানুষের সামনে।
 
এই নববর্ষে তবু আমরা শহরের মানুষেরা পান্তা খাবো, ইলিশ মাছ ভাজা খাবো- শহরে ইলিশ দুর্লভ হবে। কিন্তু গ্রামবাংলার বাস্তবতা হচ্ছে, দরিদ্র, দুঃখি মানুষেরা ‘চৈতর নিদানে’ (চৈত্র মাসের অভাবের সময়) এমনকি বৈশাখের প্রথম দিনে আনন্দের সঙ্গে পান্তা খাওয়ার উৎসব করতে পারেনি। চৈত্র মাসের শেষে হালখাতা উৎসবে যারা ছোট-বড় মহাজন, তারা হালখাতার আয়োজন করেন। মিঠাই, মণ্ডা, বাতাসা ইত্যাদি দিয়ে গ্রাহককে আপ্যায়ন করেন। কারণ সারা বছরে বাকিতে যারা সওদা করেছে, তারা আজ তাদের পাওনা পরিশোধ করবেন। উৎসব তো বটেই। এই উৎসব মহাজনের- তিনি, যে মাপেরই হউন, তার জন্য উৎসব কারণ তার প্রাপ্তিযোগ আছে। কিন্তু ফাল্গুনের শেষ এবং চৈত্র মাসের শুরু থেকে যে খাতক মহাজনের টাকা পরিশোধের জন্য হন্যে হয়ে টাকার সন্ধান করেছেন, ঋণ করেছেন, স্ত্রীর কানের ছোট-খাট গয়না বিক্রি করেছেন। পোষা গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পর্যন্ত বিক্রি করে ঘর্মাক্ত কলেবরে হাট থেকে কপাল কুঁচকে ক্লান্ত সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছেন তার জন্য হালখাতা কতটা মধুর- সেটি ওই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ জানার কথা নয়। হালখাতার মিষ্টান্ন অন্যদের যেমনই স্বাদ হোক, যে মানুষ অনেক কষ্টে জীবনের সবটুকু নিংড়ে মহাজনের দরবারে হাজির হয়েছেন- তার গলা দিয়ে মিষ্টির নলা নামতে চায় না। তিনি ঘন ঘন জলপান করেন। এগুলো অনেকের স্মৃতির মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
 
পহেলা বৈশাখে বৈশাখী ফসলের তেমন কোনো উত্তোলন হয় না। বৈশাখ হচ্ছে হাওর পাড়ের মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়। প্রকৃতির দয়ায়, দুর্বৃত্ত মানুষদের (যারা বাঁধ নির্মাণের অর্থ আত্মসাৎ করে) মুখে ছাই দিয়ে, যদি প্রাকৃতিক নিয়মে হাওরের ফসল ডুবে না যায়, তখন তাঁতানো রোদের মধ্যে ফসল তোলার যজ্ঞ শুরু হয়। বৈশাখের পনের তারিখ এমনকি বৈশাখজুড়ে উদ্বেগাকুল মানুষের ধান তোলার সময়। তখন পান্তা ভাত যদি পাওয়া যায়, তা অমৃত সমান কারণ তখনও ফসল ওঠেনি। সে পান্তায় ইলিশের টুকরো এমনকি, হাওর পারে ইলিশের আঁশও মেলে না, যদি এক টুকরো শুঁটকি কিংবা একটি লাল মরিচ ও সামান্য লবণ পাওয়া যায়, তা-ই গিলে আগুনের হলকার মতো রোদে ধান কাটতে হয়। মাথায় করে হাওরের পারে বা কোনো উঁচু জায়গায় নিয়ে আসতে হয়। মাড়াই দিতে হয়। ঝাড়তে হয়, শুকাতে হয়, এর মধ্যে কখনো প্রবল বেগে ঝড় আসে, বাতাস আসে, বৃষ্টি নামে তখন এই প্রকৃতির পটভূমিকায় কাটা ধান, অর্ধ-মাড়াই বা অর্ধ-ঝাড়া ধান নিয়ে হাওর পারের কৃষককুলের নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার ছুটোছুটি, মরণপণ যে লড়াই, নাগরিক মানুষের পক্ষে রাজধানীতে বসে কল্পনা করা প্রকৃত অর্থেই কঠিন। অর্ধ শতাব্দি পূর্বে শৈশবে এ ক্ষেত্রে যে বাস্তবতা দেখেছি আজও এ বাস্তবতা থেকে বৈশাখী ফসল, হাওর পারের নারী-পুরুষ, গৃহস্থ-মজুর কেউই পেরিয়ে আসতে পারেননি।
 
আবহমান বাংলায় আমাদের এই ‘চৈত্র্যের নিদান’ আর ‘বৈশাখের যুদ্ধ’ চলে আসছে। অকাল বন্যায় বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল ছাড়াও রয়েছে- শিলাবৃষ্টির ভয়াবহ আঘাত। সারা বছরের আশা-আকাক্সক্ষা আর স্বপ্নের পেছনে যাবতীয় শ্রম নিমিষে ঝরে যায়। এ বছর মরাড় উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে শিলাবৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক। শিলার আয়তনও অনেক বড় হওয়ায় ধান তো গেছেই সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এলাকার সবজি ক্ষেত মাটিতে মিশেছে। এমনকি বাড়িঘরের ছাদ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।
 
টিনের চালে যখন বৃষ্টির পাশাপাশি শিলার আঘাত লাগে রিমঝিম শব্দ যখন ঢন ঢন শব্দে পরিণত হয়, তখন চৈত্রের শেষ এবং বৈশাখের শুরুর দিন, কিংবা রাত ভয়াবহ বার্তা নিয়ে আসে হাওর পারের কৃষকের জন্য। মানুষের কান্নার শব্দ তখন আর্তনাদ হয়ে যায়।
 
আমাদের বাংলা নববর্ষের আনন্দ নিয়ে ধর্মান্ধরা অনেক কথা বলে থাকেন, যা প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য নয়। বাঙালির পঞ্জিকার শুরুতে একটি অসাধারণ উৎসব অবশ্যই সর্বজনীন আনন্দের ধারণাকে প্রতিফলিত করে।
 
আমরা আমাদের শৈশব থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বৈশাখী ফসলের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি হাওর এলাকার সঙ্গে নিবীড়ভাবে মিশে থেকেছি। বৈশাখী ফসলের সঙ্গে সম্পর্কিত আমাদের ভাটি বাংলার লোকালয়ে বৈশাখের শেষে জ্যৈষ্ঠ কিংবা আষাঢ় মাসে- (যদি ফসল ঘরে তোলা যায়), তখন প্রকৃত অর্থে উৎসবের আনন্দ লাগে। তখন অবকাশ আসে সঙ্গীতের, সময় আসে নাইওরীর প্রশান্তির, আসে উৎসবের। অন্যদিকে অঘ্রাণে আমন ধানের ফলন যখন অসাধারণ হয়ে ওঠে, তখন পৌষের- পিঠা পুলির উৎসব আসে ঘরে ঘরে। দু’টো নিদান বাংলায় চিরকালই বড় বিখ্যাত ছিল। একটি ‘চৈত্রের নিদান’ অন্যটি ‘কার্তিকের নিদান’ অর্থাৎ বৈশাখী বোরো ফসলের আগে চৈত্রমাসের নিদান আর অঘ্রানের পূর্বে ‘কার্তিকের নিদান’। এবারের চৈত্র - আমাদের হাওর এলাকার কৃষকদের পাঁজর ভেঙ্গে দিয়েছে।
 
এবারের নববর্ষ তাই অনেক আনন্দের নেপথ্যে অনেক অশ্রুতে ভরা। আমাদের নাগরিক জীবনে হাওরের ফসল ডুবে যাওয়ার শোক কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে জানি না - এই নিরন্তর শোকের বার্তা, এই দীর্ঘশ্বাস হয়তো আমাদের নাগরিক উৎসব এবং গণমাধ্যমের প্রচারণায় তলিয়ে যাবে। যে কৃষক উদয়ান্ত পরিশ্রম করে অর্থ বিত্ত ব্যয় করে ফসলের স্বপ্ন রচনা করেছিলেন, তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন, কাঁদতে ভুলে যাবেন। যে কিষাণী স্বপ্ন বুনেছিলেন- পুত্র-কন্যার জন্য নতুন বস্ত্র ক্রয়ের, তিনি উদাস বসে থাকবেন দাওয়ায়, যে শ্রমিক সারা বছরের সময় দিয়েছিলেন এই ফসলের মাঠে, তিনি অভুক্ত থাকার অজানা আশংকায় কবুতরের মতো কাঁপতে থাকবেন। যে গায়ক আষাঢ়ের ভরা জোছনায় গানের সুরে হাওরের জলে নতুন তরঙ্গ রচনা করার স্বপ্ন দেখেছিলেন ভয়ে তার গলাও শুকিয়ে আসবে। প্রতিটি শিশুর মুখ থাকবে মলিন এবং বিষণœ হাওরের প্রতিটি রাত হবে নিষ্প্রদীপ নিস্তব্ধতার চাদরে ঢাকা। প্রতিটি দিন হবে হা হা করা হাহাকারের দীর্ঘশ্বাসের, দীনতার। ঠিক এরকম একটি সময়ে হে নববর্ষ হে নাগরিক আনন্দ- তুমি আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করো! যদিও বাণের জলে ভেসে গেছে হাওর পারের নববর্ষ। হাওর পারের এই হাহাকারের মধ্যে ১৪২৪ তোমাকে স্বাগতম।