মোগল হেরেমের বিদগ্ধ রমণীকূল

../news_img/49672 mei nu.jpg

ড. মাহফুজ পারভেজ :: ভারতবর্ষে সুদীর্ঘকাল শাসনকারী মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত নারীর কথা জানা যায়, যারা পর্দার অন্তরালে থেকে প্রভূত ক্ষমতা চর্চা করেছেন এবং নানা ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতার পরিচয় রেখেছেন। প্রথাগতভাবেই মোগল রাজবংশে নারী, কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সর্বদা-সর্বাবস্থায় সম্মানের আসনে উপবিষ্ট ছিলেন। সেখানে ‘পাদসা বেগম’ বা ‘পাটরাণী’র প্রথা প্রচলিত ছিল, যার সন্তান সিংহাসনাধিকারে অগ্রাধিকার পেত।

মোগল নারীদের মধ্যে অনেকেই কেবল আক্ষরিক ক্ষেত্রে নয়, বাস্তবিক ক্ষেত্রেও ছিলেন সম্রাটের প্রকৃত ‘অর্ধাঙ্গিনী। মোগল হেরেমের রমণীগণ তাদের মধ্য এশীয় ঐতিহ্যানুযায়ী প্রায় সকলেই অশ্বারোহণ করতেন, যাকে বেখাপ্পা বা পুরুষালী আচরণ বলে মনে করা হত না। তারা পোলো খেলতেন এবং স্বামীর সহগামীরূপে শিকারে গমন করতেন। সকলেই প্রয়োজনীয় প্রাথমিক শিক্ষা গৃহাভ্যন্তরেই পেতেন, যদিও অনেক মোগল নারী বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষত সাহিত্য, কাব্য ও শিল্পকলায় উচ্চতর শিক্ষায় সুশিক্ষিত হয়েছিলেন। সেই স্বাক্ষর সাহিত্য, সংস্কৃতি, এমন কি, জায়গীরদারী, বাণিজ্য-কারখানার মালিকানা এবং স্থাপত্য শিল্পে লক্ষণীয়।

প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের কন্যা, আকবরের ফুফু গুলবদন বেগমের হুমায়ূননামা কেবল প্রামাণ্যিক ঐতিহাসিক দলিলই নয়, প্রকৃষ্ট সাহিত্য-কর্মও বটে। আকবরের মাতা হামিদা বানু ছিলেন বিদুষী ও তেজস্বিনী নারী। আকবরের অন্যতম মহিষী সেলিমা বেগম ছিলেন গুণবতী রমণী। পুত্র জাহাঙ্গীর যখন পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তখন বিমাতা সেলিমা বেগমই মধ্যস্থতা করে শান্তি স্থাপন করেছিলেন। দারাশিকোর কন্যা শাহজাদা আযমের স্ত্রী এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্রবধূ দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন।
মোগল হেরেমের রমণীকূলের মধ্যে নানা কারণে বিখ্যাত হয়ে আছেন বাবর-কন্যা গুলবদন বেগম, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান, শাহজাহান মহিষী মমতাজ মহল, দারাশিকোর স্ত্রী নাদিরা বেগম, আওরঙ্গজেব-কন্যা কবি জেবুন্নিসা, শাজাহান-কন্যা রওশন আরা, শাজাহান-দুহিতা জাহানারা এবং বাহাদুর শাহ জাফরের স্ত্রী জিনাত মহল। তবে প্রায় সকলেই নানা কারণে ও যোগ্যতায় আলোচিত-বিখ্যাত হলেও নূরজাহান আর জাহানারার এবং জেবুন্নেসা ইতিহাস অন্য সকলের চেয়ে আলাদা এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

নূরজাহান বা জগতের আলো নামে খ্যাত এই মোগল রমণী কেবল ভারতবর্ষ বা মোগল ইতিহাসেই নন, বিশ্বইতিহাসেরও এক বিস্ময়কর নারী-ব্যক্তিত্ব। তাবৎ পুথিবীর ইতিহাসে তাঁর সমকক্ষ খুব কম নারীরই দেখা পাওয়া যায়। মোগল প্রশাসন ও কীর্তিতে নূরজাহানের পারিবারিক অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী মমতাজ মহল বিশ্ববিস্ময় তাজমহলে চিরশায়িতা। দৌহিত্রী বাদশাবেগম জাহানারা মোগল ইতিহাসে কল্যাণময়ীর উজ্জ্বল-প্রতীক। তাঁর অধস্থন বংশধর আওরঙ্গজেব-কন্যা জেবুন্নিসা ললিতকলায় অবদানের জন্য চিরনন্দিতা।

নূরজাহানের কাব্য-প্রতিভা স্বরচিত ফারসি কবিতার বই দিওয়ানে মাকফি তে লিপিবদ্ধ, যা তার উচ্চতর কবি পরিচয়কেও অন্যবিধ দক্ষতার পাশাপাশি তুলে ধরে। স্বামী জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাঝে মাঝে স্বরচিত কবিতায় বাক্যালাপ করতেন, যাকে বলা হয় ‘নাজ’ ও ‘নাখরা’। আবার এককভাবে স্বরচিত কাব্যপাঠ বা ‘মুশায়েরা’ তাঁর সময় থেকেই উপমহাদেশের সাহিতাঙ্গনে বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তীকালে এই মুশায়েরা উত্তর ভারতের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব-অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যা এখন পর্যন্ত প্রচলিত রয়েছে। নূরজাহানের নিজস্ব-ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল। সম্রাজ্ঞী হওয়ার পূর্বে তাঁর আপন হস্তাক্ষর মির্জা কামরানের দিওয়ান-এর প্রথম পাতায় পাওয়া যায়। 

নূরজাহান আসলেই কত ক্ষমতাবান এবং মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন, তার প্রমাণ তিনি জীবনকালে এবং মৃত্যুর পরেও রেখে গেছেন। আওরঙ্গজেব তাঁর ক্ষমতাকে প্রাসাদভিত্তিক প্রতিরোধ ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য নূরজাহানকে নজর বন্দি করে রাখেন। মৃত্যুর পর দিল্লিতে অবস্থিত তাঁর মাযার পূত-পবিত্র স্থান হিসাবে আপামর জনসাধারণের সমাবেশের স্থানে পরিণত হলে সিপাহি বিদ্রোহের পর পরই ভীত ইংরেজ প্রশাসন মাযারকে দিল্লি থেকে সরিয়ে লাহোরে স্থানান্তরিত করে, যা এখনও সেখানে তাঁর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত শালিমার বাগে অবস্থিত রয়েছে।

বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর ভাগ্যের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে নূরজাহানের ঐশ্বর্যময় জীবন। প্রথম যৌবনে বধূবেশে নূরজাহানের বাঙলায় আগমন ও অবস্থান। সতের বছরকাল তিনি এই বাঙলাতেই বিবাহিত জীবন-যাপন করেন। বাঙলাপ্রীতির স্বাক্ষরও দেখা যায় নূরজাহানের জীবন-ইতিহাসে। নূরজাহান লাহোরের নলখা বাঙালি মহল ভবন স্থাপন করেন বাংলার কুটির আর মোগল স্থাপত্যের মেলবন্ধনে। নূরজাহানের পৃষ্ঠপোষকতায় পরবর্তীকালে ঢাকার মসলিনের একটি নাম ও ডিজাইন উন্নত করা হয়, যাকে বলা হতো ‘আবে রাওয়াঁ’ বা ‘জলের ইন্দ্রজাল’।

কুশলী নূরজাহান নানা ধরনের পোষাক আর ফ্যাশনেরও উদ্ভাবক। তাঁর সময় ভোজের সময় দস্তরখানের ব্যবহার, চোলি বা আধুনিক ব্লাউজের প্রচলন, পোশাকে বোতাম, বাদলা, কিঙ্গারি, ওড়না, অন্তর্বাস, নৈশবেশ, কুর্তা, শিলওয়ার, কামিজ এবং জরির লেসের উদ্ভব ও প্রচলন করেন তিনি, যা ভারতবর্ষে ছিল অভূতপূর্ব। সৌন্দর্য চর্চায় নূরজাহানের সবচেয়ে খ্যাতিমান আবিষ্কার গোলাপের আতর, যার পোশাকী নাম ‘আতরে জাহাঙ্গীরী’। তাঁর বিশিষ্ট গোসলখানাটিও একটি আগ্রহ আর গবেষণার বিষয়। বিলাসবহুল গোসলখানার টবে গোলাপ মিশ্রিত পানিতে তরলাকার ভাসমান পদার্থের মধ্যে গোলাপের নির্যাস ছড়িয়ে রাখা হতো। নূরজাহানের স্নানের গোলাপ পানিতে আতর, চন্দন, রূপটান ও অন্যান্য প্রসাধনী সামগ্রী মিশ্রিত থাকতো।

সুকন্যা নামের এক গবেষক নূরজাহান শিরোনামের এক জীবনী গ্রন্থে লিখেছেন: “নূরজাহান নিজে সুরভিত হতেন গোলাপ নির্যাসের স্নানে, যার দৈনিক খরচ পড়ত তৎকালীন তিন হাজার টাকা।”

নূরজাহানের প্রথম স্বামী বাংলার রাঢ়-বর্ধমান অঞ্চলের জায়গিরদার শের আফগান দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিবাদের জেরে নিহত হন। বিধবা নূরজাহান বিজয়ী দিল্লির সৈন্যদল কর্তৃক আটক হয়ে একমাত্র কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে আগ্রার দুর্গে চার বৎসর বন্দিত্ব আর বৈধব্যময় জীবন কাটান। এখানে এসে ভাগ্য আবার তাঁর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আকস্মাৎ সম্রাট জাহাঙ্গীর এক মিনাবাজারে নূরজাহানের রূপ-লাবণ্য দর্শনে মুগ্ধ হয়ে কেবল বিবাহ নয়, তাঁর প্রধান রাজমহিষীর মর্যাদা প্রদান করেন। অবস্থা এতটাই তাঁর অনুকূলে চলে আসে যে, ইন্দ্রানী মুখার্জী মুঘল হারেম: কয়েকটি নিদের্শনামা গ্রন্থে জানাচ্ছেন যে, “জাহাঙ্গীর নাকি বলতেন, আমি মদ ও মাংসের কথা জানি, সাম্রাজ্যের খবর রাখেন নূরজাহান।”
শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয়, নূরজাহান মোগল হেরেমে এসে পারিবারিক কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করেন। নূরজাহানের আগমনের পর জাহাঙ্গীরের বহুনারীবিশিষ্ট হেরেমে একস্বামী-একস্ত্রীর দাম্পত্যের সূচনা ঘটে। তিনিই প্রথম মোগল সম্রাজ্ঞী, ঝরকায় সম্রাট যখন প্রজাদের দর্শন দিতেন, তখন পাশে থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। তিনি প্রজাদের মনে রাজা-রাণীর যৌথতায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক সৃষ্টি করেন। রাজ্যশাসন ছাড়াও যুদ্ধ এবং শিকার যাত্রায় নূরজাহান সম্রাটের সহগামী হতেন। উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, তিনি নিজে বন্দুক চালিয়ে অনেক বাঘ শিকার করেছেন। তাঁর অভেদ্য নিশানা দেখে মুগ্ধ সম্রাট জাহাঙ্গীর এক লক্ষ মুদ্রার সমমানের হীরার চূড় এবং এক হাজার নগদ আশরাফি উপহার দেন।

সম্রাজ্ঞীর উপযুক্ত শিকারের পোশাক ব্রিচেস ও হান্টিং কোট তৈরির জন্যেও সম্রাট জাহাঙ্গীর ইংরেজ কোম্পানিকে নিদের্শ দেন। স্যার টমাস রোঁ প্রদত্ত ল্যান্ডো গাড়ি জাহাঙ্গীর তাঁর বিবাহ বার্ষিকীতে সর্বপ্রথম নূরজাহানকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবহার করেন। সেই বিবেচনায় উপমহাদেশে প্রথম আধুনিক মোটর গাড়ি ব্যবহারের কৃতিত্ব সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের। কাচ্চি বিরিয়ানির প্রবর্তনকারীও নূরজাহান। তিনি তাদের বিবাহ বার্ষিকীতে অভ্যাগত অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য মৃগনাভি সুরভিত জাফরানি কাচ্চি বিরিয়ানি পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন।
প্রতিভাধর নূরজাহানের তত্ত্বাবধানে নির্মিত দু‘টি স্থাপত্যকীর্তিই সমাধিসৌধকেন্দ্রিক। প্রথমটি আগ্রায় পিতা ইতিমুদ্দৌলার সমাধিসৌধ। অপূর্ব মোজাইকের কারুকাজ করা স্থাপত্যশিল্পটি সম্পূর্ণ মর্মর দিয়ে নির্মিত পিটাড়ৌরার চিত্রে শোভিত রত্নালঙ্কারের মতোই মনোমুগ্ধকর। পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু এই সমাধিসৌধকে ‘স্থাপত্যের রত্ন’ বলে প্রশংসা করেছেন। পার্সি ব্রাউন এই সুনির্মাণটির সুখ্যাতি করে বলেছেন ‘নান্দনিক আদর্শের পরাকাষ্ঠা’। নূরজাহান নির্মিত দ্বিতীয় স্থাপত্যকর্মটি হলো লাহোরের শাদারায় অবস্থিত পতি-সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমাধিসৌধ।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর কিছুটা ভাগ্যবিড়ম্বিতা নূরজাহান আপন ভাগ্য মেনে নিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। এমন কি মোগল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি-আগ্রাও ত্যাগ করেন। শান্তিময় নির্বিরোধী জীবন-যাপনের জন্য তিনি সঙ্গী বেছে নেন আপন বিধাব কন্যাকে আর বসবাসস্থল হিসাবে নির্ধারণ করেন স্বীয় স্বামীর স্মৃতিময় লাহোর শহর। সম্রাট শাজাহান তাঁর অন্যতম সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী নূরজাহানের নির্বিবাদী জীবন-যাপনে স্বস্তি বোধ করেন এবং তাঁকে বাৎসরিক দুই লক্ষ টাকা ভাতা বরাদ্দ করেন্য। তাঁর সময় অতিবাহিত হতে থাকে স্বামীর সমাধিসৌধ নির্মাণের কাজে, সাহিত্য-কাব্য চর্চায় এবং দীন-দুখীদের মধ্যে দান-খয়রাত করে।

শেষ বয়েসে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে বিপদজ্জনক মনে করে আগ্রা দুর্গে বন্দি করেন। নিজের ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যুর পর স্বামীর সমাধিস্থল লাহোর শহরে শেষ নিদ্রায় সমাহিত করা হয়। ভাগ্যের প্রবল উত্থান আর পতনে টালমাতাল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ক্ষমতা, যোগ্যতা, কুশলতা আর সৌন্দর্যপ্রিয়তায় উজ্জ্বল নিদর্শনের মতোই নিজের অতি সাধারণ সমাধিতে খোদিত করে রেখেছেন স্বরচিত বিখ্যাত কয়েকটি কথা: “বর মাযারে-ই মা গরীবান নই চিরাগি নাই গুলে/ নে পর-ই পরওয়ানা সুজদ নই সদা-ই বুলবুলে।”

সুদীর্ঘ মোগল ইতিহাসে নূরজাহানের পরেই বহুমাত্রিক যোগ্যতা আর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের জন্য জাহানারার নাম চলে আসে। শাজাহান-মমতাজ দুহিতা,  জাহাঙ্গীর-নূরজাহান দৌহিত্রী জাহানারা মোগল সংস্কৃতির সুকুমার গুণে উজ্জ্বল ঘটনাবহুল জীবনের অধিকারী। তাঁর অবস্থান প্রথাগত নারীর শেষ প্রান্তে এবং আধুনিক নারীর প্রথম পাদে। ঐতিহাসিক কালিকারঞ্জন কানুনগো শাহজাদা দারাশিকো গ্রন্থে লিখেছেন: “পুণ্যশীলা জাহানারা বেগম মহিমাময়ী নারী, সম্রাট পরিবারের পারিজাত প্রসূন। তাঁকে কখনও কুদসিয়া বেগমও বলা হতো।”

প্রসঙ্গত, মোগল হেরেমে নারীদের পদ-মর্যাদা ও ক্ষমতাগত অবস্থানের বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে। মোগল সম্রাটগণ শাহী মহলের কর্তৃত্ব দিয়ে ‘পাদশা বেগম’ (বাদশাহর ফারসি উচ্চারণ পাদশা) পদ-মর্যাদা দান ছাড়া কোন কোন মহিলাকে সীমিতভাবে ‘নির্দেশিকা ক্ষমতা’ দান করতেন। তাঁদের মধ্যে রাজমাতা, রাজমহিষী, রাজকন্যা ইত্যাদি পদবী ছিল। রাজমাতার নিদের্শিকাকে বলা হতো ‘হুকুমনামা’, অনুরূপ অধিকার রাজমহিষীও ভোগ করতেন। রাজকন্যা বা বাদশাজাদীর নির্দেশিকাকে বলা হতো ‘নিশান’। এগুলো প্রশাসনিক নির্দেশিকার সমতুল্য। এই ক্ষমতা বা অধিকার শরিয়ত বিধানে নেই। সম্পূর্ণ মোগল রাজশক্তির সৃষ্ট অধিকার বা ক্ষমতা মোগল নারীর বিশেষ উচ্চ মর্যাদার তথ্য জ্ঞাপন করে। এইভাবে নূরজাহানের কিছু হুকুমনামা এবং জাহানারার দশটি নিশানের সংবাদ পাওয়া যায়।

বিখ্যাত মাতা মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর পিতা সম্রাট শাজাহান অন্য পুররমণীগণের বদলে জাহানারাকেই কেবল শ্রেষ্ঠ মর্যাদা ‘পাদশা বেগম’ প্রদান করেন, যা নূরজাহান বা মমতাজের মত সম্রাজ্ঞীর বিশেষণ ছিল এবং জাহানারাই একমাত্র মোগল রমণী যিনি সম্রাজ্ঞী না-হয়েও কেবলমাত্র শাহজাদী থেকেও ‘পাদশা বেগম’ পদ লাভ করেন। সম্রাট শাজাহান কন্যাকে সর্বোচ্চ নারীর পদাধিকারী করার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনভাবে রাজ প্রসাদের বাইরে আপন মহল তৈরি করে বসবাস করার অধিকার দিয়েছিলেন এবং ব্যবস্থা করেছিলেন স্বাধীনভাবে পর্যাপ্ত আয়-উপার্জনেরও।

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালীন ধনী সম্রাট সুরুচিশীল শাজাহানের জ্যেষ্ঠা কন্যা রূপে-গুণে-শিক্ষায় অদ্বিতীয়া এই জাহানারা। তাঁর শিক্ষার জন্য সতিউননিসা নামের উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষয়েত্রী নিয়োগ করেন পিতা। মাতার মৃত্যুর পর রাজমহিষীর প্রাপ্য ‘পাদশা বেগম’ মর্যাদা পেয়ে তিনি হলেন শাহী মহলের সর্বময়ী কর্ত্রী। আওরঙ্গজেব সম্রাট হবার পরও তাঁকে সেই উচ্চ পদ-মর্যাদা থেকে বিচ্যুত করেন নি। ত্রিশ বৎসর ধরে তিনি দিল্লি-আগ্রার শাহী সীল মোহর সংরক্ষণের অধিকারিনী থাকেন, যদিও তিনি ভ্রাতার জিজিয়া কর আরোপের বিরোধী ছিলেন। সুরাটের বাণিজ্য শুল্ককরের জায়গির তাঁকে দেওয়া হয়, যার বার্ষিক আয় ছিল তৎকালীন ছয় লক্ষ টাকা। বিভিন্ন উৎস থেকে এক পর্যায়ে জাহানারার বার্ষিক আয় দাঁড়ায় সে আমলের সতের লক্ষ টাকা। আপন কর্তৃত্বাধীনে শিল্প-কল-কারখানা পরিচালনা করতেন তিনি এবং তাঁর নিজের জাহাজ ছিল। তাছাড়া তিনি পণ্য চালানের জন্য ওলন্দাজ ও ইংরেজ জাহাজ ভাড়া করতেন। এই সকল তথ্য জানিয়েছে ইরফান হাবিব মধ্যযুগের ভারত গ্রন্থে।

নূরজাহানের মতোই জাহানারারও নিজস্ব পাঠাগার ছিল। একইভাবে তিনিও প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন দান-সদকায়। বিশেষত দরিদ্র-পীড়িতদের আর বিয়ে-শাদীর প্রয়োজনে তিনি মুক্ত হস্তে দান করতেন। তিনিও সুন্দর সুন্দর ভবন নির্মাণ করেন। তাঁর নির্মিত অপূর্ব সুন্দর দিল্লির সরাইখানার স্থাপত্যশৈলী ও সৌন্দর্য দেখে বিখ্যাত পর্যটক বার্নিয়ার প্যারিসেও অনুরূপ সুন্দর ভবনের প্রতিষ্ঠা কামনা করেন। পিতার বিশ্বখ্যাত তাজমহল নির্মাণের নেপথ্যে ছিল জাহানারার প্রণোদনা। শাজাহান বলতেন, তিনি মমতাজের কল্যাণময়ী প্রতিরূপ কন্যা জাহানারার মধ্যে দেখতে পান।

নূরজাহানের মতোই জাহানারাও মোগল প্রশাসনের অন্যতম মন্ত্রণাদাত্রী এবং ছিলেন সম্রাটের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন পরামর্শক। ১৬৫৮ সালে শাজাহান পীড়িত হলে মোগল ক্ষমতা লাভের ভ্রাতৃবিরোধ তুঙ্গে উঠে এবং সেই প্রায়-গৃহযুদ্ধাবস্থায় জাহানারার বিশেষ ভূমিকা উল্লেখ করার বিষয়। জাহানারা ভাগ্যাহত-উদারমতি দারাশিকোর পক্ষপাতী ছিলেন যদিও তিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে রক্তপাতের ঘোরতর বিরোধী। সেকালের প্রথানুযায়ী দারার সঙ্গে তাঁর মাতা-পুত্রের সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং দারাশিকোর বিবাহে যে ত্রিশ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়, তার সিংহ ভাগ, অর্থাৎ চোদ্দ লক্ষ টাকা জাহানারা আপন তহবিল থেকে প্রদান করেন। দারার প্রতি আকর্ষণ তাঁর মতে দারার হৃদয়ের বিশালতা ও আত্মার মহত্ত্বের জন্য। আওরঙ্গজেব সম্পর্কে তিনি বলতেন, তাঁর কাছে দুনিয়া নীতিবাক্যে আবর্তিত।

ক্ষমতার যুদ্ধে অবশেষে যদিও দারা পরাজিত, পলাতক, ধৃত, বন্দী ও পরিশেষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং পিতা শাজাহান আগ্রা দুর্গে বিজয়ী পুত্র আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দী হন, তথাপি জাহানারা পক্ষ-ত্যাগ করেন নি। দুর্লভ পিতৃস্নেহের ঐতিহাসিক ও মানবিক দৃষ্টান্ত রেখে জাহানারা স্বেচ্ছায় পিতার সঙ্গে কারাবাস করেন। তিনি সুদীর্ঘ নয় বৎসর পিতার মৃত্যু পর্যন্ত বন্দী জীবন-যাপন করেন