বিলবোর্ড, সেলফিতে নয় জনতার হৃদয়ে লিখো নাম

../news_img/50791 mri n.JPG

আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন:: বনানী ধর্ষণ ঘটনায় একজন বিতর্কিত ইভেন্ট ম্যানেজার ও বিশেষ ‘সরবরাহকারী’র সঙ্গে অনেকের ছবি স্যোসাল মিডিয়ার প্রচারিত হচ্ছে। যাদের সঙ্গে এই সুযোগসন্ধানী লম্পটের ছবি প্রকাশিত হয়েছে, তারা সবাই তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, বিষয়টি তেমন নয়। হয়ত অনেকের সঙ্গে পরিচয়ও নেই। কিন্তু এই ছেলেটিকে যারাই সহজসরল মনে করে ছবি তোলার সুযোগ দিয়েছিলেন, আজ তারা প্রত্যেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন। হয়ত তাদের সামনে ভয়ে বা ‘শ্রদ্ধা’য় বিষয়টি নিয়ে কেউ কথা বলছেন না। কিন্তু রাজনৈতিক, সামাজিক বা মিডিয়ার যে সব তারকা ব্যক্তির সঙ্গে এই ছেলের ছবি প্রকাশিত হয়েছে, তারা সবাই বিব্রত ও লজ্জিত।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক দিক অনেক। আমার মতো আটপৌরে রাজনৈতিককর্মীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক দিকগুলোর সব কিছু জানা সম্ভব নয়, বর্ণনা দেওয়াও সম্ভব নয়। তবে এর কিছু ব্যধি আছে। সেই ব্যধি সম্পর্কে প্রায় সবাই জানি। আমরা বাঙালিরা কোনও কিছুর নেগেটিভ দিক আগে দেখি ও জানি। আমিও বাঙালি হিসেবে এর ব্যতিক্রম নই। এ কারণেই হয়ত নেতিবাচক দিকের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে।
সম্প্রতি রাস্তাঘাটে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন নেতা-নেত্রীর বিপুল বিলবোর্ড চোখে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেলফির ঝড় বইয়ে যাচ্ছে। আর ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী, বঙ্গবন্ধু, জননেত্রী শেখ হাসিনার নাম ব্যবহার করে যে অসংখ্য ব্যাঙের ছাতা গড়ে উঠেছে, তাদের বিলবোর্ড আর ফেসবুকের ছবির কোনও হিসাব করা সম্ভব নয়। বার বার দলীয় সিদ্ধান্তের পরও এই ব্যাঙের ছাতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, আমাদের মতো অনেক ছবি প্রিয়, শিরোনাম প্রিয়, খবর প্রিয় নেতারা হরহামেশা এসব ভুইফোঁড় সংগঠনের গোলটেবিল, মানববন্ধনে হাজির হয়ে বয়ান দেই। ফলে দলীয় ফোরামে দমনের সিদ্ধান্ত নিলেও আমরা অনেকেই তাদের হাতেগোনা মানুষের উপস্থিতিতে পালিত কর্মসূচিতে অতিথি হয়ে এসব সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা দেই।

আমি আগে দেখিনি, ১৫ আগস্টের পোস্টারে জাতির পিতা ও তার নিহত স্বজন ছাড়া কারও ছবি। এমনকি ১৫ আগস্টের ছবিতে দলীয় প্রধান, বঙ্গবন্ধু-কন্যার ছবিও ব্যবহার করা হতো না। অন্য কর্মসূচি বা দিবসের কথা বাদই দিলাম। ইদানিং ১৫ আগস্টের পোস্টার, বিলবোর্ডে দেখা যায়, জাতির পিতার ছোট ছবি, তার নিচে নেত্রীর ছোট ছবি, এরপর আমাদের মতো কারও ঢাউশ সাইজের ছবি। নিচে সৌজন্যে ছবিটি যার, তিনি সামাজিকভাবে কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি নন। এই বিলবোর্ডে দলের লাভ ক্ষতি কী হয়, তা বোঝার মতো বিবেচনা সবারই আছে বলে আমি মনে করি।

যদি বড় বড় বিলবোর্ড, টেলিভিশন বা খবরের কাগজে ছবি প্রকাশ করে জনতার নেতা হওয়া যেত, তাহলে বিপুলসংখ্যক প্রকাশিত ছবির অনেক নেতা হারিয়ে যেতেন না। ২০০৮ সালে ঢাকার উপকণ্ঠে একজন তরুণ বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি বিলবোর্ড কারও ছিল না। ফুলের মালা গলায় দিয়ে বিশাল বিশাল নায়কোচিত হাস্যোজ্জ্বল ছবিতে তার বিলবোর্ড সমগ্র এলাকা ছেয়ে ছিল। ঢাকার উপকণ্ঠে হওয়ার কারণে সমগ্র দেশের অনেক মানুষ তার নায়কোচিত ছবি দেখতেন। সমস্যা ছিল, বিলবোর্ডের নিচে সৌজন্যের নাম ও ছবিগুলো। তারা অনেকেই ওই এলাকার সবচেয়ে বিতর্কিত লোক। পরিণাম দাঁড়ায়, ৫ বছর আগে দেশের ২য় সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী সেই সংসদ সদস্যকে ৫ বছর পর দল আর মনোনয়ন দিতে পারেনি। তার অবস্থা এতটাই নাজুক হয়েছিল যে, তাকে ভোটযুদ্ধে নামানোর অবস্থা ছিল না।

জনগণ উন্নয়নমাতা শেখ হাসিনার মহাউন্নয়ন কর্মযজ্ঞ, দেশের এগিয়ে চলা ও জনকল্যাণ দেখছেন। প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক উন্নয়নমাতার উন্নয়ন ও কল্যাণে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করে চলেছেন। প্রতিনিয়ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের বিশ্বাস বেড়ে চলেছে। কিন্তু আমাদের মতো কিছু মানুষের প্রচারপ্রিয়তা, কখনও উদাসীনতার কারণে ফেসবুকের সেলফি, ঢাউস বিলবোর্ডে বিতর্কিত ব্যক্তিসমেত ছবির প্রচার এবং কখনও কখনও বল্গাহীন বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের অর্জনগুলো ম্লান করে দিচ্ছে। জনগণ আমাদের ওপর বিরক্ত হচ্ছেন। বিতর্কিতদের সঙ্গে নেতাদের ছবি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিভিন্নভাবে প্রচার প্রোপাগান্ডা করে অনেক অনেক ভালো নেতার চরিত্রেও কালিমালেপনের চেষ্টা করছে। এই সহজ-সরল বিষয়গুলো নেতারা যত দ্রুত অনুধাবণ করতে পারবেন, তত বেশি মঙ্গল হবে। প্রজাতন্ত্র ও দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান, বক্তৃতারত অবস্থার পেছনে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের এবং যত্রতত্র ছবি তোলার ক্ষেত্রে অধিকতর সজাগ ও যত্নবান হওয়া উচিত। নেতার অজান্তে এমন কিছু ব্যক্তি বক্তব্য দেওয়ার সময় আশে-পাশে দাঁড়ায়, যাদের ছবিতে পরবর্তী সময়ে লাল-গোল চিহ্ন যুক্ত হয়। তারা নেতা ও দলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।

প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণ রাজনৈতিক নেতাদের ভোট দিয়ে রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেন। প্রভূত্ব করার দায়িত্ব দেন না। জনপ্রতিনিধি প্রভূ বা প্রশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে তিনি যত বেশি ভোটেই নির্বাচিত হোন না কেন, জনপ্রিয়তায় ধস নামতে সময় লাগে না। একজন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর তার ক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি তার দায়িত্ব ও কর্তব্যও বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি তার নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতিটি চোখ সর্বক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ  করে। নির্বাচকমণ্ডলী কখনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বাড়াবাড়ি সহ্য করেন না। বরং জনপ্রতিনিধি যত বেশি  আগের মতো থাকবেন, ততবেশি জনতার মনের গহীনে প্রবেশ করেন। অনেক অনেক দৃশ্যমান উন্নয়ন করার পরও অনেক মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, চেয়ারম্যান পুনরায় নির্বাচিত হতে পারেন না। এমন উদাহরণ প্রচুর রয়েছে। আবার নিজ এলাকার তেমন কোনও উন্নয়ন না করার পরও যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন কিছু কিছু নেতা বার বার নির্বাচিত হোন। তাই বলে আমি উন্নয়ন করার বিপক্ষে বলছি না। বার বার নির্বাচিত হওয়া অনেক জনপ্রতিনিধির মাঝে জৌলুস নেই, তারকা খ্যাতি নেই, বিলবোর্ডের বাহার নেই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাহারি পোশাক পরা ছবির উপস্থিতি নেই।

কিন্তু তারা নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার জন্য বিপুল ব্যয়ও করতে হয় না। একজন জনপ্রতিনিধি বা জনপ্রতিনিধি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণকারী নেতার মূল টার্গেট হওয়া উচিত তার নির্বাচকমণ্ডলীর মনের গহীনে প্রবেশ করা। প্রাপ্তক্ষমতাকে দম্ভ হিসেবে ব্যবহার না করে রাজনীতির সফল শিক্ষক, উন্নয়মাতা শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ক্ষমতাকে জনকল্যাণে নিয়োজিত করা। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও আস্থা-বিশ্বাস অর্জনই নেতৃত্বকে টেকসই করতে পারে, বার বার নির্বাচিত হওয়ার পথ রচনা করতে পারে। বাহারি সেলফি, ঢাউস বিলবোর্ড নয়।

বিলবোর্ডে লিখো নাম, সে নাম মুছে যাবে। সেলফিতে লিখো নাম সে নাম হারিয়ে যাবে। জনতার মনের গহীনে লিখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে।

লেখক: সংসদ সদস্য