আত্মহত্যা করতে দেননি যে মেয়েটাকে, সেই বাঁচাল ৮ বছর পর

../news_img/51250.jpg


মৃদুভাষণ ডেস্ক::তুমি যদি কারও উপকার করো, এক দিন তা তোমার কাছে ফিরে আসবেই। ছোট বেলায় রূপকথার গল্পে, ইশপের কাহিনিতে আমরা এসব শিখেছি। বাস্তবে কি সত্যিই এমনটা হয়?

৫৫ বছরের রিকশাওয়ালা বাবলু শেখের জীবনের গল্প তো আসলে তাই। বাংলাদেশের ফটোগ্রাফার জিএমবি আকাশ তার ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেছেন অসাধারণ সেই গল্প।

সম্পর্কের টানাপড়েনের কাছে হার মেনে রেললাইনে প্রাণ দিতে গিয়েছিল মেয়েটি। সেই সময় তাকে দেখে ফেলেন বাবলু। নিজের প্রাণের মায়া না করেই ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত ধরে টেনে এনে বাঁচান মেয়েটিকে। তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর।

এক সময় হতাশা গ্রাস করা যে মেয়ে রেললাইনে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছিল, তিনি এখন ডাক্তার। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বাবলু যখন মরণাপন্ন, সেই মেয়েই বাঁচিয়ে তুললেন বাবলুকে।

হাসপাতালে বাবলুর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘তার একটি মেয়ে আছে, এক ডাক্তার মেয়ে। একদিন যদি তার প্রাণ না বাঁচাতেন, তাহলে আজ সে ডাক্তার হতে পারতো না।’

এই ঘটনা নিজের ফোটোগ্রাফি ব্লগে তুলে ধরেছেন আকাশ। যেখানে বাবলুর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে: ‘আমি আর আমার স্ত্রী সব সময় মেয়ে চাইতাম। কিন্তু আমাদের তিন ছেলে। ৩০ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছি। বেশির ভাগ সময়ই যাত্রীরা খুব খারাপ ব্যবহার করেন। এক দিন সকালে এক ভদ্রলোক তার মেয়েকে আমার রিকশায় তুলে দিয়ে কলেজে নিয়ে যেতে বলেন। বলেছিলেন সাবধানে নিয়ে যেতে।’

‘কিছুক্ষণ পরেই মেয়েটা কাঁদতে শুরু করে। আমি পিছন ফিরে তাকালে আমাকে এক ধমক দেয়। কিছুক্ষণ পর আমাকে থামতে বলে কাকে যেন ফোন করার চেষ্টা করে। মেয়েটির কান্না দেখে বুঝতে পারি কোনো ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল বাড়ি থেকে। কিন্তু ছেলেটা আসেনি। হঠাৎ রিকশা থেকে ঝাঁপ দিয়ে পাগলের মতো রেল লাইনের দিকে ছুটতে শুরু করে। আমি চলে আসছিলাম। হঠাৎই মেয়েটির বাবার মুখটা মনে পড়ে গেল। রিকশা ছেড়ে ওর পিছনে ছুটলাম।’

‘তাকে আটকে দিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ চিৎকার করার পর অঝোরে কাঁদতে থাকে। আমি থামাইনি। তাকে কাঁদতে দিয়েছিলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা কেটে যায় এভাবেই। তারপর ও নিজেই আমাকে বলে রিকশা নিয়ে আসতে। আর একটা কথাও আমরা বলিনি।’

‘ততক্ষণে বৃষ্টি নেমে গেছে। বৃষ্টির মধ্যেই ওকে বাড়ি পৌঁছে দিলাম। নামার সময় ছোট্ট অনুরোধ, কাকু, আর কোনোদিন আমার বাড়িতে এসো না। কাউকে বলো না তুমি আমাকে চেনো। ঘাড় নেড়ে বাড়ি চলে এসেছিলাম। সেই দিন কোনো কথা বলিনি, কিছু খেতেও পারিনি। মনে হয়েছিল আল্লাহ মেয়ে না দিয়ে ভালই করেছেন।’

‘তারপর কেটে গেছে আট বছর। হঠাৎই সেই দুর্ঘটনা। অজ্ঞান হয়ে যাই। সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান ফিরতেই দেখতে পাই সাদা পোশাক, চোখে চশমা এক তরুণী। আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে জানতে চাইছেন, কেমন আছি। কেন আমি এতো দিন দেখা করতে আসিনি। প্রথমে চিনতেই পারিনি।’

‘যখন বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল, শুনতে পেলাম, স্যার, উনি আমার বাবা। বয়স্ক ডাক্তার ইংরেজিতে কিছু বললেন। আমার জখম হাতটা নিজের হাতে নিয়ে উত্তর এল, যদি এই বাবার সাহায্য না পেতাম, তা হলে আমি ডাক্তার হতে পারতাম না।’

‘সরু বিছানায় শুয়ে চোখদুটো জোর করে বন্ধ করে রেখেছিলাম। এই অভাগা রিকশাওয়ালার একটা মেয়ে আছে। এক ডাক্তার মেয়ে।’