সুলতানা কামালের বাকস্বাধীনতা : তসলিমা নাসরিন

../news_img/51323.jpg

তসলিমা নাসরিন : সুলতানা কামালের সঙ্গে কয়েক বছর আগে দেখা হয়েছিল লন্ডনে, মানবতন্ত্রের ওপর মুক্তচিন্তকদের এক সেমিনারে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি সেমিনারে বলতে এসেছিলেন। তার বক্তব্য শোনার জন্য আমি উদগ্রীব ছিলাম, কিন্তু খুব উত্তেজিত ছিলাম না।

জানতাম বাংলাদেশের সুশীল নেতানেত্রীরা প্রায়শ মিথ্যে বলেন। সুলতানা কামালকে ভেবেছিলাম তিনি যেহেতু নামী লোক, তিনিও ইসলামি মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ বাড়ার পেছনে এক আমেরিকা ছাড়া আর কারও দোষ দেখবেন না, অথবা মৌলবাদ থাকলেও সন্ত্রাসবাদ নামক বস্তু আদৌ যে বাংলাদেশে নেই— এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকবেন।

কিন্তু আমাকে চমকিত করে সুলতানা কামাল অপ্রিয় সব সত্য বলেছেন। মঞ্চ থেকে নেমে এলে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। খুব সামান্যই কথা হয়েছে আমাদের। জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমাকে কি কোনও সরকারই দেশে ফিরতে দেবে না? আমার আকুলতা তিনি ঠাণ্ডা চোখে দেখেছেন। কোনও আশা দেননি।

সুলতানা কামালের ওপর এখন ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে সেই মৌলবাদী হায়েনার দল, যারা পঁচিশ বছর আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমার ওপর। তারা তাঁর অবস্থা করতে চাইছে আমার মতো। দিব্যি বলছে, ‘সুলতানা কামাল বলেছেন, ভাস্কর্য থাকতে না দিলে মসজিদ থাকতে দেওয়া হবে না? সুলতানা কামাল রাজপথে নেমে দেখুন, হাড্ডি-গোস্ত রাখা হবে না। সুলতানা কামালকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করুন। না হয় তাকে তসলিমা নাসরিনের মতো দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিন। সুলতানা কামালের দেশ বাংলাদেশ নয়। ’

কারও শরীরের হাড্ডি-গোস্ত কিছু রাখা হবে না, প্রকাশ্যে এই হুমকি দেওয়ার পরও কোনও হুমকিদাতা-সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়নি। আমার বিরুদ্ধে যারাই ফতোয়া দিয়েছিল, আমার মাথার দাম যারা ঘোষণা করেছিল ১৯৯৩-৯৪ সালে, খালেদা জিয়াও কাউকে গ্রেফতার


করার আদেশ দেননি। বরং আমার বিরুদ্ধেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এভাবেই মৌলবাদীদের অগণতান্ত্রিক অযৌক্তিক সব দাবি পূরণ করেছিলেন।

মাথায় তুলেছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীকে। সরকার যদি কোনও অপশক্তিকে একবার মাথায় তোলেন, তবে মাথা থেকে ওদের নামানোটা বড় কঠিন হয়ে পড়ে, মাথাটাও কুরে কুরে খেয়ে নেয় ওরা। খালেদা এই অপশক্তিকে মাথায় তুলেছিলেন, এরশাদ তুলেছিলেন, হাসিনাও তুলেছেন। দেশজুড়ে সন্ত্রাস ছড়ানোয় রাজনীতিকদের ভূমিকা অপরিসীম।

শুনেছি সুলতানা কামালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন হাসিনা। এই কাজটি অবশ্যই তিনি ভালো করেছেন। খালেদা তো আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার বদলে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। সন্ত্রাসীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছি— এই ছিল আমার অপরাধ। বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য আঘাতপ্রাপ্ত ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দেওয়াটা নতুন কিছু নয়।

কোর্ট এলাকায় কোনও ধর্মীয় স্থাপনা থাকবে না, এটি হেফাজতিদের দাবি। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘আমিও মনে করি, কোর্ট এলাকায় কোনও ধর্মীয় স্থাপনা থাকা উচিত না। মূর্তি যেমন ধর্মীয় স্থাপনা, তেমনি মসজিদও। হেফাজতিদের কথা অনুযায়ী সেখানে মসজিদও তো থাকা উচিত না। ’ ব্যস, হেফাজতিরা চারদিকে প্রচার করা শুরু করলো সুলতানা কামাল বলেছেন কোর্টের সামনে যদি মূর্তি না থাকে, তবে কোথাও কোনও মসজিদ থাকবে না। দেশে কোনও মসজিদ থাকবে না, এ কথা বলেননি সুলতানা কামাল।

নিজের মত, সে যত ভিন্ন হোক অন্যের মতের চেয়ে, প্রকাশের অধিকার সবারই আছে। বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদীরা বিনাবাধায় হিন্দু-বৌদ্ধদের মন্দির ভেঙে দেয়, পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও হিন্দু বা বৌদ্ধর সাহস হয়নি মুসলমানের মসজিদে একটি ঢিল ছুড়েও প্রতিবাদ করতে। সুলতানা কামালের মত প্রকাশে কোনও মসজিদে টোকাটি পড়বে না। মসজিদের দেশ বাংলাদেশ। সব মসজিদই অক্ষত অবস্থায় থাকবে। বছর বছর, আমার ধারণা, আরও অগুনতি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।

নারীবিরোধী ও মানবতাবিরোধী ধর্মান্ধদের তথাকথিত ধর্মানুভূতিতে যেন আঘাত না লাগে, সে নিয়ে সবাই ব্যতিব্যস্ত। সরকারও। কিন্তু প্রগতিশীল মুক্তচিন্তকদের বাকস্বাধীনতার অধিকার নষ্ট হলেও কারও কিছু যায় আসে না। আমরা আমাদের ভিন্ন মত প্রকাশ করতে চাই বলেই চাই মত প্রকাশের অধিকার। অধিকাংশ মানুষ যে কথায় খুশি হয় তা বলতে গেলে মত প্রকাশের জন্য আলাদা করে অধিকার চাওয়ার দরকার হয় না।

যারা মানুষের মত প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করে, তারা কিন্তু সবার, শত্রু মিত্র সবারই মত প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করে। মতে বিশ্বাস না করলেও মত প্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করতে হয়। তুমি যদি ‘ক’র বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করো, কিন্তু ‘খ’র বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস না করো, তবে কিন্তু তুমি বাকস্বাধীনতা ব্যাপারটাতেই বিশ্বাস করো না।

মুশকিল হলো, মৌলবাদীরা নিজের ছাড়া আর কারও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। তারা নিজের ছাড়া আর কারও গণতান্ত্রিক অধিকারে বিশ্বাস করে না। মৌলবাদীদের যারা সমর্থন করে, তারা গণতন্ত্রে আর বাকস্বাধীনতায় সমর্থন করে না। সরকারের উচিত বন্ধু চিনে নেওয়া, শত্রুকে বন্ধু ভেবে ভুল না করা। কোনও গণতান্ত্রিক সরকার গণতন্ত্রে-বাকস্বাধীনতায়-নারীর অধিকারে-মানবাধিকারে বিশ্বাস না করা কোনও অশুভ শক্তিকে বন্ধু ভাবতে পারেন না। বন্ধুর ছদ্মবেশে ওই অশুভ শক্তিই একদিন গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাবে। -বিডি প্রতিদিন

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।