‘‍আমি তো নায়িকা নই, যে আমাকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করা হবে’

../news_img/51326.jpg


মৃদুভাষণ ডেস্ক::বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসী। রান্নাকে জনপ্রিয় করতে প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি টেলিভিশনে রান্নার অনুষ্ঠান করছেন। এ প‍র্যন্ত রান্নাবিষয়ক ১৪টি বইও লিখেছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর উপস্থাপনায় ইফতারের রান্নার তিনটি অনুষ্ঠান আটটি চ্যানেলে সম্প্রচারিত হচ্ছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি অনলাইন গণমাধ্যমের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন কেকা ফেরদৌসী।

প্রশ্ন : আপনি কবে থেকে রান্না শুরু করেছেন?

কেকা ফেরদৌসী : আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, তখন ঢাকার একটি রান্নার স্কুলে প্রথম ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলের নামটা এখন মনে নেই। সেখানেই রান্না শিখেছি। এ ছাড়া ছোটবেলায় আব্বা ও আম্মার সঙ্গে রান্না করেছি। আব্বা ও ভাই বোনদের জন্য নাশতা তৈরি করতাম। ভাইবোনরা আমার রান্না পছন্দ করত। এভাবে রান্না করতে উৎসাহ পেয়েছি। খুব ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল।

প্রশ্ন : আপনি কি রন্ধনশিল্পীই হতে চেয়েছিলেন?

কেকা ফেরদৌসী : আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিষয়ে পড়াশোনা করতাম। তখন আমার ইচ্ছে ছিল নগর পরিকল্পনাবিদ হব। পড়াশোনা চলার সময় প্রথম বর্ষে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর আমি অনার্স শেষ করেছি, কিন্তু মাস্টার্স শেষ করতে পারিনি। বিয়ের পর দুই বছর আমি ইংল্যান্ডে এবং তিন বছর যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম। সেই সময়টা অনেক ভালো ছিল। বাঙালি রান্না আমি তখন অনেককেই শিখিয়েছি। অন্যদিকে, আমি বিদেশি খাবারের রান্নাও তখন শিখতাম। আমার স্বামী আমাকে রান্না করার ব্যাপারে অনেক উৎসাহ দিতেন। প্রবাসী বন্ধুরা আমার রান্না খেয়ে অনেক প্রশংসা করতেন। ১৯৮০ সালের দিকে বার্গার তৈরি হতো কিন্তু স্পাইসি বার্গার ছিল না। আমি তখন স্পাইসি বার্গার বানিয়েছিলাম। আমার মনে আছে, আমার আমেরিকান বন্ধুরা স্পাইসি বার্গার খেয়ে অনেক পছন্দ করেছিলেন।

প্রশ্ন : নতুন রিসিপি তৈরি করার সময় কী কী জিনিস লক্ষ রাখেন?

কেকা ফেরদৌসী : আমি সব সময় চেষ্টা করি কম জিনিস দিয়ে মজার রান্না তৈরি করার। আজকাল ফিউশন রান্না অনেক বেশি। বিদেশি রান্না আমি করলেও দেশি রান্না করতে আমার বেশি ভালো লাগে।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় খাবার কী?

কেকা ফেরদৌসী : সব ধরনের খাবার আমি খাই। তবে সালাদ জাতীয় খাবার আমার বেশি পছন্দ।

প্রশ্ন : আপনার প্রথম টিভি শো করার অভিজ্ঞতা জানতে চাই…

কেকা ফেরদৌসী : ১৯৯৪ সালে বিটিভিতে প্রথম রান্নার শো আমি করি। প্রথম শোতে মাশরুমের একটা খাবার দর্শকদের তৈরি করে দেখিয়েছিলাম। তখন মাশরুম অত জনপ্রিয় ছিল না। আমার অনুষ্ঠান সবাই অনেক পছন্দ করেছিলেন। এ ছাড়া আমার কিচেনটাও অনেক সুন্দর ছিল। আর একটা ঘটনা মনে পড়ে, সেদিন শো করার সময় আমার হাত থেকে একটা সুন্দর ও দামি ডিশ ভেঙে গিয়েছিল। আমার তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল।

প্রশ্ন : রান্নার অনুষ্ঠান নিয়ে আপনি তো বিদেশেও অসংখ্যবার ভ্রমণ করেছেন। কতগুলো দেশে কুকিং ট্র্যাভেল শো করেছেন?

কেকা ফেরদৌসী : ২৫ কিংবা ৩০টা দেশে ভ্রমণ করেছি। এখন দেশে তো কুকিং শো অনেক হচ্ছে। তবে বিদেশে শো করতে গেলে অনেক টাকা ও সময়ের প্রয়োজন হয়। সব চ্যানেলের পক্ষে সেটা করা সম্ভব হয় না।

প্রশ্ন : বাইরে শো করতে গিয়ে আপনি কি কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?

কেকা ফেরদৌসী : কিছু জিনিস আমার ভালো লাগেনি। ধরুন, আমি কাউকে নিয়ে একটা কুকিং শো করছি। আমাকে তখন হয়তো একজন ফোন করে বলল, ‘উনি তো ওই দল করে আপনি তাঁকে নিলে আমরা আপনার শোতে আসব না।’ আমি তো রাজনৈতিক মানুষ না। তখন আমি তাদের বলি, ‘দেখেন ভাই, আপনি যদি আপনার স্ত্রী ও বন্ধুকে নিয়ে আমার শোতে না আসতে পারেন এটা আপনার ব্যাপার কিন্তু আপনার কথায় আমি কাউকে বাদ দিতে পারব না।’ এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমাকে পড়তে হয়েছে। আগে তো যোগাযোগ করতে অনেক অসুবিধা হতো। এখন তো ফোন কিংবা ইমেইলে অনেক দ্রুত সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। বিদেশে শো করার আগে দেশ থেকেই আমি অতিথি ভালোভাবে নির্বাচন করতে পারি। আর একটা ব্যাপার হলো, প্রবাসীরা বিদেশি রান্না করতে তেমন জানেন না। শো করার সময় আমি তাদের বিদেশি রান্না শিখিয়েছি। বাজারও আমাকে করতে হয়। ইতালিতে গিয়ে দেখেছি প্রবাসীরা পিৎজা রান্নাটাও করতে পারে না। অন্য খাবার তো অনেক পরের বিষয়। অনেকে আমাকে বলে, ‘আপা, এই দেশে থাকি কিন্তু আমরা এই দেশের রান্না জানি না। ডাল ভাত ছাড়া আমরা কিছুই রান্না করতে জানি না।’

প্রশ্ন : আপনার রান্নার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন তারকারা অতিথি হয়ে আসেন। তারকা শিল্পী নির্বাচনে কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেন?

কেকা ফেরদৌসী : আমার অনুষ্ঠানগুলো বেশির ভাগ সময় স্পন্সরের মাধ্যমে হয়। অনেক সময় মাসব্যাপী অনুষ্ঠানের জন্য স্পন্সরদের কাছে ৩০ কিংবা ৪০ জন শিল্পীর নামের তালিকা আমরা পাঠিয়ে দেই। কখনো তাঁরাও আমাদের শিল্পীদের নাম পাঠান। এখানে টাকা-পয়সার অনেক ব্যাপার থাকে। চলচ্চিত্রের শিল্পীরা অতিথি হলে তাঁদের আমাদের বেশি টাকা দিতে হয়। আর সব চ্যানেলেই বেশির ভাগ সময় স্পন্সরদের পছন্দ অনুযায়ী শিল্পী নির্বাচন করতে হয়। কখনো তাঁরা নতুন শিল্পী চান, কখনো মাঝবয়সী, কিংবা বয়সী আবার কখনো টিভি ও চলচ্চিত্রের বড় তারকা। এটা তাঁদের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে। তবে তারকাদের রান্না শেখানো অনেক কষ্ট। যে ফুল বা ফল চাষ করেন, যদি তাঁর ফুল মরে যায় কিংবা ফল না হয় তিনি কষ্ট পান। আমারও তেমনি। কেউ রান্না করা খাবার নষ্ট করলে সে কষ্টটাই হয়। অনেক সময় তারকারা রান্না করতে পারেন না। একই খাবার পুনরায় রান্না করে আবার অনুষ্ঠান রেকর্ড করতে হয়। বাংলাদেশে এখন একটা ফ্যাশন হয়েছে যে রান্নার অনুষ্ঠানে তারকারা এসে রান্না করবেন। এবার ৩০টি চ্যানেলে রান্নার অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। আপনি দেখবেন, সব অনুষ্ঠানেই সেলিব্রিটিরা আছেন। সত্যিকারে যাঁরা রান্না পারেন তাঁরা এখানে কেউ নেই। অন্যদিকে, শেফদের রান্না অনেক মজার হয়, দেখতেও সুন্দর হয়। কিন্তু তাঁরা যে উপকরণ দিয়ে রান্না করেন সেটা সাধারণ মানুষরা চেনেন না। আমি সব সময় চেষ্টা করি এমন কিছু দিয়ে রান্না করব যাতে সব মানুষই সহজে রান্না করতে পারেন।

প্রশ্ন : ‘মজাদার রান্না’ শিরোনামে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি বইও আপনি লিখেছেন। সে সম্পর্কে জানতে চাই।

কেকা ফেরদৌসী : ডায়াবেটিস রোগীদের বেশির ভাগ খাবার খেতে বারণ করা হয় – এই চিন্তা থেকে আমার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটা বই লিখব। আমি এই বইটি লেখার আগে একজন ডায়বেটিস চিকিৎসককে প্রথমে আমার রান্না করার প্রণালির স্ক্রিপ্ট দেখাই। তিনি দেখার পর বইটা বের করেছি। বাংলাদেশে ৬১টি ডায়াবেটিস সেন্টারে বইগুলো এখন পাওয়া যাচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি ‘স্বাস্থ্যসচেতন রান্না’ বইটি লেখার জন্য গুখমোঁ ওয়ার্ল্ড কুকবুক অ্যাওয়ার্ডস (Gourmand World Cookbook Awards) পেয়েছেন। কেমন ছিল অনুভূতি?

প্রশ্ন : ২০১১ সালে প্যারিসে এই পুরস্কারটা পেয়েছি। শুধু বইটি লেখার জন্য নয়, রান্নার উপস্থাপক হিসেবে আরো একটি পুরস্কার আমি সেখান থেকে পেয়েছিলাম। আবার একই বছরে ব্রিটেনের ক্যারি অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছি। বাংলাদেশ থেকে এটা এর আগে কেউ পায়নি। দেশেও আমি অনেক পুরস্কার পেয়েছি। যে কোনো পুরস্কার পেতে অনেক ভালো লাগে। তবে মানুষ যে আমাকে ভালোবাসে এটা বেশি ভালো লাগে।

প্রশ্ন : সামাজিক গণযোগাযোগ মাধ্যমে আপনাকে নিয়ে ট্রল করা হচ্ছে, এসব নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

কেকা ফেরদৌসী : প্রথম কথা হলো, আমি ফেসবুক ব্যবহার করি না। আমার স্বামী বলেন, ‘মানুষের সময় আছে, কাজ নেই, যার জন্য এসব করে।’ আমি টিভিতে ২৫ বছর ধরে রান্না করছি, আমার রান্নার জীবন আরো বড়, ৩৫ বছর হয়তো হবে। এখন কথা হলো, আমি যে অবস্থানে আছি , ফেসবুকে কেউ কিছু লিখে আমাকে সে অবস্থান থেকে নামাতে বা ওঠাতে পারবে না।

প্রশ্ন : ইউটিউবে আপনার নুডলস রান্না নিয়েও অনেক ট্রল ভিডিও হচ্ছে, আপনি কি দেখেছেন?

কেকা ফেরদৌসী : আমি কিছু দেখেছি। আমি যখন প্রাণের ঘি দিয়ে রান্না করি, তখন এটা নিয়ে ফেসবুকে আলোচনা হয় না। নুডলস নিয়ে এত মারামারি কেন? আমি যে নুডলস কোম্পানির অনুষ্ঠান করি, তারা আমাকে বলেছে, ‘আমরা এখন বিখ্যাত হয়ে গিয়েছি। আমরা এই অনুষ্ঠানটি করব।’

প্রশ্ন : সমালোচকরা কেন আপনাকে টার্গেট করেছে বলে মনে হয়?

কেকা ফেরদৌসী : এটা আমি বলতে পারব না। ফেসবুক তো কথা বলার স্বাধীন জায়গা, যে যা ইচ্ছে বলতে পারেন, আমার ফেসবুক নেই। ফেসবুকে মহিলারা সেজেগুজে ছবি দেয়, নিজের ব্যক্তিগত কথা বলে, এটা আমি পছন্দ করি না। আমি দর্শকদের বলব, ‘আমাদের বাঙালিদের এক নম্বর দোষ হলো, আমরা নিজেরা নিজেদের সম্মান করতে জানি না। বয়সে ছোট হোক কিংবা বড় হোক, মানুষকে সম্মান করে কথা বলতে হয়। আমি তো আর চলচ্চিত্রের নায়িকা নই যে আমাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা হবে। আমি পরশু দিন দুবাই থেকে ঢাকার এয়ারপোর্টে বিজনেস ক্লাস থেকে নেমেছি, সে সময় ইকোনমি ক্লাস থেকে বের হয়ে একটি ছেলে মোবাইল দিয়ে আমার ছবি তুলছিল। আমি তখন চুল ঠিক করছিলাম। এসব তো ভদ্রতা হতে পারে না? আমার হাজবেন্ড তখন বলেছিলেন, ‘আমাকে এটা বললে না কেন, ছেলেটাকে বকে দিতাম।’ ভাবুন তো, মানুষ এখন কোথায় গেছে। আমার বয়স ১৬ কিংবা ২০ বছর না যে আমাকে নিয়ে এসব করতে হবে? আমি রান্নার মানুষ, রান্নাই করি।

প্রশ্ন : রান্না নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

কেকা ফেরদৌসী : আমাদের একটা কুকিং অ্যাসোসিয়েশন আছে। সেখান থেকে একটা প্রোজেক্ট করছি। আমরা ৬০ জন সদস্য আছি। সারা দেশের অনেক গরিব মেয়েরা যাতে রান্না করে উপার্জন করতে পারে, সেই ব্যবস্থা আমরা অ্যাসোসিয়েশন থেকে করার চেষ্টা করছি। তিন বছর ধরে আমরা এ কাজের সঙ্গে জড়িত আছি। নিজেদের টাকা দিয়ে কাজটা চালিয়ে যাচ্ছি। সরকার আমাদের অ্যাসোসিয়েশন সম্পর্কে জানে। এটা নিয়ে ভবিষ্যতে আরো জোরালোভাবে কাজ করতে চাই।