কাতার সংকট : আলজাজিরার ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা

../news_img/52836 mri nu.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: কাতারের আলজাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষুদ্র এই দেশটিকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে জায়গা করে দিয়েছে। তেল এবং গ্যাস সম্পদে ভরপুর দেশটির অর্থনৈতিক শক্তিকে বৈশ্বিক প্রভাবে রূপান্তর করার একটি বড় নিদর্শন হচ্ছে এই গণমাধ্যম। এর দুই দশকব্যাপী প্রচেষ্টার ফলাফলের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন।

তবে কাতারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংকটের ফলে এই হাইপ্রোফাইল নেটওয়ার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দানা বাঁধছে। আলজাজিরার সংবাদ বিভিন্ন আরব দেশে বিতর্ক এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম মিসর। হোসনি মোবারকের পতন, আরব বসন্ত এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মোরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে সংস্থাটির সংবাদ মিসরের বর্তমান সরকার ভালোভাবে নেয়নি।
অবশ্য বর্তমান সংকটের উত্তাপ আগেই অনুভব করেছিল আলজাজিরা। মে মাসের শেষ নাগাদ তাদের ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয় সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিসর এবং বাহরাইন। এই সবগুলো দেশই গত ৫ জুন জঙ্গিবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

সৌদি আরব আলজাজিরার কার্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের লাইসেন্স বাতিল করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন করার অভিযোগ এনেছে। আলজাজিরা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের স্বাধীন এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম হিসেবে দাবি করে আসছে। কাতার এখন নিজেদের বিচ্ছিন্ন এবং অরক্ষিত হিসেবে দেখছে।

সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের সমর্থনের অভিযোগ তারা অস্বীকার করছে, কিন্তু উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অবসানে তাদের ওপর ছাড় দেয়ার চাপ বাড়বে। সংকটের ফলে তাদের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দৃশ্যত জনশূন্য হয়ে পড়েছে এবং দেশটির বাসিন্দারা খাদ্যপণ্যের মজুদ করছেন।

দোহা থেকে বিবিসি আরবি বিভাগের ফেরাস কিলানি বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, গণমাধ্যমের সংস্কার করার জন্য কাতারের ওপর শর্ত দেয়া হবে। আলজাজিরা হয়তো বন্ধ হবে না, তবে তার সম্পাদকীয় নীতিমালায় পরিবর্তন আসবে। তিনি বলেন, লন্ডনভিত্তিক কাতারি আল আল-আরাবি টিভি নেটওয়ার্ক হয়তো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অনেক বছর ধরে আলজাজিরা উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক দেশগুলো এবং মিসরের জন্য গলার কাঁটা হয়ে আছে- আমিরাতি ভাষ্যকার সৌদ আল কাশেমি তার কলামে লেখেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০০২ সালে আলজাজিরায় সৌদিদের ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি পরিকল্পনার কভারেজ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কাতার থেকে রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে নেয় সৌদি আরব। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রদূতকে ফেরত পাঠানো হয়।

২০১৪ সালে আবারও কূটনৈতিক বিবাদে সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং বাহরাইন তাদের রাষ্ট্রদূতদের ফিরিয়ে নেয়। সেসময় কাতার উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

এবার কাতারের প্রতিবেশীরা যেকোনো ধরনের মধ্যস্থতার আগে আলজাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দাবি তুলবে। এমনটাই যদি হয় তাহলে গণমাধ্যম জগতে কাতারের অবস্থান এবং আলজাজিরার বিশ্বজুড়ে তিন হাজারেরও বেশি কর্মীর ভাগ্যে বেশ খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের কাতার বিশেষজ্ঞ ডেভিড রবার্টসও একমত যে, উপসাগরীয় দেশ এবং মিসর আলজাজিরাকে কাতারের খরচের খাতায় চাইবে। তবে এটি একটি দেন-দরবারের বিষয় এবং এ মুহূর্তে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই যে, কাতার নতিস্বীকার করবে। যদিও আলজাজিরা আরাবিক এখন তুলনামূলক নরম সুরে কথা বলছে।

তবে তারা এখনও বিশেষ করে মিসরকে খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে। তবে চ্যানেলটি প্রায় একদশক আগেই সৌদি আরবের সমালোচনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার হুমকি জিসিসির : কাতারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কুয়েতের আমিরের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়ার হুমকি দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

বাহরাইন জানিয়েছে, তারা এ সংকটে কাতারের বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আলজাজিরা। এতে বলা হচ্ছে, কাতারকে একঘরে করা নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ক্রমশই বাড়ছে।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) সদস্যরা কাতারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়ার হুমকি দিয়েছে। এতে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাবে।