এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে বন্ধু হলেন যেভাবে

../news_img/54322 mri nu.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: অহ নওরোজ : বন্ধু সবারই থাকে। কিন্তু বন্ধু খুঁজে পাওয়ার গল্প সবার এক নয়। ব্যক্তিভেদে বন্ধু খুঁজে পাওয়ার নেপথ্যে বিভিন্ন গল্প থাকে। এ কারণেই হয়তো বন্ধু দিবস এতো বেশি আকর্ষণীয়। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী যারা বিশেষ পরিচিত তাদের বন্ধু খুঁজে পাওয়ার ঘটনা নিয়ে সবার আগ্রহ একটু বেশিই থাকে। আর সেটি যদি হয় প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের বন্ধু হওয়ার ঘটনা তাহলে তো কথাই নেই। এই দুই কিংবদন্তির বন্ধুত্ব হওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে প্রথম এভারেস্ট জয়ের কাহিনি। যে কারণে একটু গুছিয়ে বলা প্রয়োজন।

নেপালের উত্তর-পূর্ব অংশে খুম্বু অঞ্চলের সোলো খুম্বুতে ১৯১৪ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে নামগেল ওয়াংডি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ঘাংঘ লা মিংমা ও মা ডোকমো কিংজুম। তেরো ভাই-বোনের মধ্যে নামগেল ছিলেন এগারোতম। এই নামগেলই পরবর্তীতে তেনজিং নোরগে নামে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত হন।

ছোটবেলা থেকে অভিযানের প্রতি তীব্র আগ্রহ ছিল তেনজিংয়ের। কৈশোরে রোমাঞ্চকর অভিযানের নেশায় তেনজিং দু-দুবার পালিয়ে যান বাড়ি থেকে। প্রথম বার কাঠমান্ডু। দ্বিতীয় বার দার্জিলিং। উনিশ বছর বয়সে তিনি পাকাপাকিভাবে দার্জিলিংয়ে তু সুং শেরপা বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। আর এখানে বাস করার মধ্যেই তার মধ্যে এভারেস্ট পর্বত দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা দানা বাঁধতে শুরু করে।

সেই ইচ্ছা থেকেই শুরু করলেন মালবাহকের কাজ। ১৯৩৫ সালে প্রখ্যাত ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিপটন তার এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন। মালবাহক আর শেরপা বাছাই পর্বে হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে তার নজরে পড়ে তেনজিংকে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তিনি তাকে মালবাহক হিসেবে বেছে নেন।

পরে এরিক বলেছিলেন, ‘কয়লার মধ্যে হিরের দ্যুতি ঢাকা পড়ে না।’

এরপর ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু হয়ে গেল লাগাতার অভিযান। বছরের পর বছর ধরে। শুরুতে তেনজিং ছিলেন নিছকই মালবাহক মাত্র। বছর কয়েক ধরে নানা দলের সঙ্গে চলতে থাকে তাঁর পাহাড় অভিযান আর গিরিশৃঙ্গ জয়।

বারবার চেষ্টা করেও বহু দিন পর্যন্ত এভারেস্ট ছিল তাঁর অধরা। দুর্ভাগ্যও যেন তাড়া করে ফিরছিল তাদের। এরপর বেশ কয়েকবছর অপেক্ষার পর ১৯৫৩ সাল এলো। তেনজিংয়ের জীবনে এলো চরম পরীক্ষার মুহূর্ত। তখন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কর্নেল এইচ সি জন হান্টের নেতৃত্বে এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। তেনজিং যোগ দিলেন তাদের সাথে। এবার পরিপূর্ণ একজন শেরপা হিসেবে।

তেনজিংয়ের জীবনে এটি ছিল সতেরোতম এভারেস্ট অভিযান। চারশো সদস্যের এই অভিযানে ছিলেন ৩৮২ জন মালবাহক ও ২০ জন শেরপা। এই দলের সদস্য ছিলেন স্যার এডমন্ড হিলারি।

অভিযান চলাকালীন একটা দুর্ঘটনায় হিলারি হঠাৎ বরফ খাদে পড়ে যান। কিন্তু উপস্থিত বুদ্ধি ও তাৎক্ষণিক দ্রুত প্রচেষ্টায় মৃত্যুর গহ্বর থেকে হিলারিকে ফিরিয়ে আনেন তেনজিং। সে দিন থেকে তেনজিংয়ের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ হিলারি। আর এই ঘটনার মধ্য দিয়েই তাদের মধ্যে প্রথম বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে হিলারি-তেনজিং একই দড়িতে ক্লাইম্বিং পার্টনার হিসেবে নতুন উদ্যমে অভিযান শুরু করেন।



এরপর ২৬শে মে দলের প্রধান হান্ট টম বুর্দিল ও চার্লস ইভানকে শৃঙ্গে আরোহণের জন্য প্রথমে নির্দেশ দেন। সাউথ কল-এর ২৫৯০০ ফুট উপর তৈরি হয় সামিট ক্যাম্প। এত দিন আবহাওয়া মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু সামিট ক্যাম্প তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া গেল বিগড়ে। শুরু হলো প্রচণ্ড তুষার ঝড়। আর সেদিনই ইভানের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থায় গোলোযোগ দেখা দিলে তারা শৃঙ্গ থেকে মাত্র তিনশো ফুট নিচ থেকে ফিরে এলেন।

দলনেতা জন হান্ট বুদ্ধিমান। এরই মধ্যে হান্টের চোখে তেনজিং ও হিলারির বন্ধুত্ব দৃশ্যমান হয়। যে কারণে কালক্ষেপণ না করে তেনজিং-হিলারিকে পাঠিয়ে দিলেন। সামিট ক্যাম্প ওরা দখল করে নিলেন। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্য দু’তিন দিন ক্যাম্পে বন্দি রইলেন। তেনজিংয়ের মনে তখন আবার ভয়, তারা পারবেন তো। কিন্তু সে সময় পাশে ছিলেন হিলারি, সবসময় তাকে সাহস যুগিয়ে চলেছেন। ২৮শে মে তারা আং ন্যিমা, আলফ্রেড গ্রেগরি ও জর্জ লোর সহায়তায় ৮,৫০০ মিটার উচ্চতায় শিবির স্থাপন করলে ন্যিমা, গ্রেগরি ও লো নিচে ফিরে যান। পরের দিন অর্থাৎ ২৯শে মে সকালে তাবুর ভেতরে প্রস্তুত হয়ে বাইরে বেরিয়েই হিলারির মাথায় বাজ পড়ল। তিনি আবিষ্কার করলেন, তার চামড়ার বুট জোড়া বরফে জমে গিয়েছে। ভুলবশত আগের দিন বিকেলে বাইরে শুকোতে দিয়ে জুতো জোড়া ভিতরে আনতে ভুলে গিয়েছিলেন।

তা হলে কি আজ এগোনো হবে না! কিন্তু তখনো বন্ধু তেনজিং তার পাশে। দুজনের প্রায় দু’তিন ঘণ্টার চেষ্টায় অবশেষে ভিজে জুতোয় পা গলানো গেল। এরপর ত্রিশ পাউন্ড ওজনের সরঞ্জাম নিয়ে তারা শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা শুরু করেন। শৃঙ্গের ঠিক নিচে চল্লিশ ফুট খাড়া একটি পাথরের দেয়ালের একটি খাঁজ ধরে এডমন্ড হিলারি ও তাকে অনুসরণ করে তেনজিং আরোহণ করে সকাল ১১:৩০ মিনিটে মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করেন। পর্বতশৃঙ্গে তারা পনেরো মিনিট ছিলেন। এই সময় হিলারি তেনজিংয়ের আলোকচিত্র তোলেন। এই আলোকচিত্রে তেনজিংকে তার বরফ-কুঠার তুলে ধরে থাকতে দেখা যায়। তার বরফ-কুঠারে জাতিসংঘ, ইংল্যান্ড, নেপাল ও ভারতের পতাকা লাগানো ছিল।

‘বায়োগ্রাফি অফ তেনজিং’ বইয়ে তেনজিংয়ের বর্ণনা অনুসারে তাদের শৃঙ্গজয়ের প্রমাণস্বরূপ শৃঙ্গ থেকে তারা নিচের পর্বতগাত্রের আলোকচিত্রও তোলেন। শৃঙ্গজয়ের ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে তাদের দুইজনকে ঘিরে নেপাল ও ভারতের জনমানসে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। হিলারি ও হান্ট নাইট উপাধিতে ভূষিত হন এবং তেনজিংকে জর্জ পদক প্রদান করা হয়। একটি ঘটনার মাধ্যমে বন্ধু হয়ে যাওয়া দুজন একইসাথে পরিণত হন কিংবদন্তিতে।

হিলারির সম্পূর্ণ নাম এডমন্ড পার্সিভাল হিলারি। তিনি ১৯১৯ সালের ২০ জুলাই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সময় থেকেই পর্বতারোহণে উৎসাহী ছিলেন হিলারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি রয়্যাল নিউজিল্যান্ড এয়ার ফোর্সে যোগদান করেন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ব্রিটিশদের মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের পূর্বে তিনি ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে চো ওইয়ু শৃঙ্গে আরোহণের প্রচেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কমনওয়েলথ ট্রান্স-আটলান্টিক অভিযানের অংশ হিসেবে তিনি ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ মেরু পৌঁছান। পরবর্তীকালে তিনি উত্তর মেরু অভিযান করলে বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে পৃথিবীর দুই মেরু ও সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পদার্পণের দুর্লভ কৃতিত্ব অর্জন করেন।

এভারেস্ট আরোহণের পর হিলারি নেপালের শেরপাদের উন্নতিকল্পে তার জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন। তিনি হিমালয়ান ট্রাস্ট নামক একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে তাদের জন্য বিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন। তেনজিং নোরগে ১৯৮৬ সালে মৃত্যুবরণ করলেও তার বন্ধু হিলারি বেশ অনেকবছর বেঁচে ছিলেন। হিলারি ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারি অকল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু ততদিনে তাদের বন্ধুত্বের গল্প ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।

তথ্য সহায়তা:
টাইগার অফ দ্য স্নো: দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ তেনজিং অফ এভারেস্ট উইথ জেমস রামসে উলম্যান
উইকিপিডিয়া
আনন্দবাজার