হাইড্রোজেন বোমা ফেললে কী হবে?

../news_img/55520mmri iu.jpg

মৃদুভাষন ডেস্ক :: হাইড্রোজেন বোমা ফেললে কী হবে? ধরুন, নিউ ইয়র্ক শহরে একটি হাইড্রোজেন বোমা ফেলা হলো, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? এক কথায়, একজন মানুষও বেঁচে থাকবে না, ধু ধু মরুভূমি হয়ে যাবে, অট্টালিকার শহর হবে মহাশ্মশান।

এখন ভাবুন, হাইড্রোজেন বোমার শক্তি কত! ধ্বংসের জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র পৃথিবীতে আর নেই। আনবিক বা পারমাণবিক বোমার চেয়ে ১ হাজার গুণ বেশি শক্তিধর হতে পারে হাইড্রোজেন বোমা।

রোববার উত্তর কোরিয়া দাবি করেছে, তারা হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে। নিরপেক্ষ সূত্র থেকে নিশ্চিত না হওয়া গেলেও উত্তর কোরিয়া যে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে, তাতে দেশটিতে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা। এ থেকে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করার মতো যথেষ্ট তথ্য আপাতত নেই। তাই যদি হয়, তাহলে হাইড্রোজেন বোমা আছে- এমন ষষ্ঠ দেশ উত্তর কোরিয়া। পৃথিবীতে আর যেসব দেশের হাইড্রোজেন বোমা আছে, সেগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও চীন। এই পাঁচ দেশ জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য ও দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

সে যা হোক, কথা হচ্ছিল হাইড্রোজেন বোমার শক্তির বিচার নিয়ে, সেদিকে আলোকপাত করা যাক। উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় ও সবশেষ রোববার পরীক্ষা করা হাইড্রোজেন বোমার শক্তি সম্পর্কে আগে বলা যাক। বিস্ফোরণপরবর্তী ভূমিকম্পের তীব্রতা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের নাগাসাকি শহরে ফেলা যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার চেয়ে উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমাটি পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী। নাগাসাকিতে ফেলা ‘ফ্যাটম্যান’ নামের বোমার আঘাতে তাৎক্ষণিকভাবে ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল, ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল পুরো শহর। এ থেকে উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

১৯৫২ সালে বিশ্বে প্রথম হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ৫০ কিলোমিটার ওপরে উঠে গিয়েছিল। আশপাশের ১০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে তার তেজস্ক্রিয়তা। সেটির বিধ্বংসী ক্ষমতা ছিল ১ কোটি টন ট্রাইনাইট্রো টলুইনের (টিএনটি) সমান। উল্লেখ্য, টিএটি হলো বিস্ফোরক দ্রব্য।

নাগাসাকিতে ফেলা ফ্যাটম্যান বোমার ক্ষমতা ছিল ২০ হাজার টন টিএনটির সমান। এই তুলনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ১ কোটি টন টিএনটির একটি হাইড্রোজেন বোমা প্রায় ৫০০টির মতো শহর মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। আর ২ কোটি টন টিএনটির সমান একটি হাইড্রোজেন বোমা যদি ভূপৃষ্ঠের ২ কিলোমিটার গভীরেও বিস্ফোরিত হয়, তাহলেও নেপালের মতো একটি দেশ ভূমিসাৎ হয়ে যাবে- এর জন্য সকালের সূর্য বিকেলে গড়ানোর প্রয়োজন হবে না।

কিন্তু এর চেয়েও শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমা রাশিয়ার কাছে আছে। তাদের কাছে ৫ কোটি টন টিএনটির ক্ষমতার সমান বোমা রয়েছে। বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটালে জাপানের নাগাসাকির মতো ২ হাজার ৫০০টি শহর বা সমান আয়তনের অঞ্চল চোখের পলকে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ধ্বংসের জন্য মানবজাতি এতটা অগ্রসর হয়ে আছে, যা অনেকের হয়তো অজানা।

১৯৬১ সালে আর্কটিক অঞ্চলে নোভায়া জেমলিয়া দ্বীপপুঞ্জে ৫ কোটি টনের একটি হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। বোমাটির নাম ছিল ‘জার বোমবা’ অর্থাৎ ‘বোমার রাজা’। বোমার রাজার বিস্ফোরণের চেয়ে বড় বিস্ফোরণ বিশ্বে আর কখনো হয়নি। ওই বোমার বিস্ফোরণে শত শত কিলোমিটার দূরের ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে জানালার কাচ ভেঙে পড়েছিল।

মানবজাতির জন্য ‘অভিশাপ’ এই হাইড্রোজেন বোমা তৈরি হয় কীভাবে? প্রক্রিয়াটি ভীষণ জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। তারপরও উত্তর কোরিয়ার মতো গরিব ও অনগ্রসর দেশ কেমন করে এই বোমা তৈরি করছে, তা রীতিমতো বিস্ময়ের। রোববার তারা যে হাইড্রোজেন বোমাটি পরীক্ষা করেছে, তা নাগাসাকিতে ফেলা বোমার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী। তারা আরো দাবি করছে, এই বোমা তাদের দূরপাল্লার বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম। খুবই উদ্বেগের বিষয়। সত্যি, তারা যদি কখনো এই বোমা দিয়ে কোথাও আঘাত হানে, তাহলে সে মুহূর্তে বলতে হবে, ‘গেম ইজ ওভার’।

হাইড্রোজেন বোমা তৈরি হয় মূলত পরমাণুর ফিউশন প্রক্রিয়া কাজে লাগিয়ে। ফিউশন হলো- দুটি পরমাণু একত্রিত হয়ে বেশি শক্তিতে বিভাজিত হওয়া। এই প্রক্রিয়ায় সূর্যে শক্তির উৎপন্ন হয়। আর পারমাণবিক বোমা বানানো হয় ফিশন প্রক্রিয়ায়। এই প্রক্রিয়ায় পরমাণুগুলো আরো বিভক্ত হয়ে যেতে থাকে। তবে হাইড্রোজেন বোমায় ফিউশন ও ফিশন উভয় প্রক্রিয়া কাজে লাগানো হয়। যে কারণে পারমাণবিক বোমার চেয়ে সহস্র গুণ বেশি শক্তিশালী হয় হাইড্রোজেন বোমা।

২০১৬ সালের জুলাই মাসে প্রথমবার হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার দাবি করেছিল উত্তর কোরিয়া। সেবার ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল দেশটিতে। তার ১ বছরের কিছু বেশি সময় পর তারা দ্বিতীয় হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার দাবি করল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবারো কঠোর জবাব দেওয়ার হুংকার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু কী সেই জবাব? যুদ্ধ! তাই যদি হয়, তাহলে পৃথিবীটা আর বাসযোগ্য থাকবে না!