বন্যার নতুন রূপ, সিলেটে দুর্গতি

../news_img/55458mmri iu.jpeg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: সিলেটে বন্যার নতুন রূপ এবারই প্রথম। এর আগে এভাবে দফায় দফায় বন্যার কবলে পড়েনি মানুষ। টানা ৬ মাস ধরে বন্যার কবলে পড়েছে সিলেট। ফের বেড়েছে মানুষের দুর্গতিও। অন্যদিকে প্রশাসন থেকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হলেও সেটি অপ্রতুল থাকায় মানুষের ভোগান্তি কমছে না। আসেনি প্রবাসীদের পর্যাপ্ত ত্রাণও। ফলে বন্যার্ত এলাকায় খাদ্য সংকট চলছে।

এদিকে নতুন করে আবার পানি বাড়ছে সিলেটে। পানিতে তলিয়ে গেল বোরো। আউশের চারা তো রোপণ করা যায়নি। কিছুটা পানি কমার পর আমনের চারা রোপণ করা হয়েছিল। সেই চারায় এসে আঘাত হেনেছে বন্যার পানি। ফলে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে আমনের চারা। রবি শস্যও রোপণ করা সম্ভব হয়নি। এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। টানা বৃষ্টি কমছে না। এই অবস্থায় প্রকৃতির প্রতিশোধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিলেট।

এবার দেশজুড়েই বন্যা হয়েছে। তবে সবার আগে বন্যা আঘাত হেনেছে সিলেট অঞ্চলে। গেল চৈত্র মাসের শেষদিকে উজানের পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলা। হাহাকার শুরু হয় হাওরে। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের শতাধিক হাওরের ফসল চোখের সামনেই পানিতে তলিয়ে যায়। হাহাকার শুরু হয় সিলেট অঞ্চলে। একেক করে হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় মুখের গ্রাস। এক মুঠো বোরো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি কৃষকরা।

সিলেট অঞ্চল হচ্ছে বোরো ধানের ভাণ্ডার। এই ভাণ্ডার এবার শূন্য। এ কারণে বৈশাখের শুরু থেকেই সিলেটে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। পাশাপাশি বেড়ে যায় দ্রব্যমূল্যের দাম। এদিকে বৈশাখ মাস থেকে সিলেটে শুরু হয় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত। পাশাপাশি উজানের ঢলও নামে। এই ঢলে তলিয়ে যায় সিলেট অঞ্চল। গেল ৬ মাস ধরে প্রতি মাসে বন্যার পানি কমছে, আবার নতুন করে পানি বাড়তে শুরু করে। বন্যার এই লুকোচুরি খেলায় আউশ ফসল রোপণ করা সম্ভব হয়নি। গত মাসে বন্যার পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছিল। সেই সুযোগে আশায় বুক বেঁধে কৃষকরা আমনের চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে বর্ষণ ও বৃষ্টিপাতে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। এই বন্যায় সিলেটের কয়েক হাজার হেক্টর আমন চারা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সিলেটের ওসমানীনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাটের কৃষি জমির বীজতলায় বন্যার পানি আঘাত করায় কৃষকের মধ্যে হাহাকার চলছে। সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানির তীর উপচে পানি ঢুকেছে। এতে নতুন করে বন্যা দেখা দেয়ায় রীতিমতো হাহাকার শুরু হয়েছে। ফের তলিয়ে গেছে গ্রামীণ এলাকার রাস্তাঘাট।

তিন কারণে সিলেটে বন্যা হচ্ছে। ইতিমধ্যে গবেষকদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এবার সিলেটের উজানে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে করে উজানের ঢল নামা অব্যাহত রয়েছে। আর সিলেটে নদ-নদীগুলোর নাব্য সংকট চলছে। নদী ড্রেজিং না করায় তলদেশ ভরাট হয়ে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। এতে করে পানি খুব দ্রুত আঘাত হানে লোকালয়ে। ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে প্রচুর। আর সিলেটে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হচ্ছে গলার কাঁটা। প্রতি বছরই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কাজ হয়, কিন্তু একটু ঢল নামলেই বাঁধ কাজ করে না। কোথাও কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে।

এবার টানা ৬ মাসের বন্যার পর দাবি উঠেছে সিলেটে দীর্ঘ স্থায়ী বন্যা রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ইতিমধ্যে সিলেটের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিষয়টি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নজরে এনেছেন। এ ব্যাপারে দীর্ঘ মেয়াদি চিন্তা-ভাবনা করার দাবিও তুলেছেন তারা। এবার সিলেটের প্রশাসন থেকে ৬ মাস ধরে ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন থেকে যে খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুব অপপ্রতুল। মাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হচ্ছে। প্রশাসন খুব সংখ্যক লোককে এই খাদ্য সহায়তা দিতে পারছে। এর বাইরেও বহু মানুষ বন্যার কারনে দুর্গতিতে পড়েছেন। সিলেটের মানুষ বিপদে পড়লে প্রবাসী সহায়তা আসে। কিন্তু এবার দেখা গেল এর ব্যতিক্রম। প্রবাসী সহায়তা এসে নামমাত্র। ঈদের আগে ঈদসামগ্রীর নামে বিভিন্ন উপজেলায় প্রবাসীদের একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সেটি ঈদ পর্যন্তই ছিল। এরপর নতুন করে খাদ্য সংকটে পড়েছে দেশ।

সৌজন্য: মানবজমিন