‘সিলেট আর সিলেট থাকবে না’

../news_img/55913mri nu.jpeg

মৃদুভাষণ ডেস্ক:::: স্বদেশের বিপন্ন পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় প্রবাসীদের মনোযোগ ও অংশগ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রবাসীরা দেশের স্ব স্ব অঞ্চলে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক মহৎ কাজ করছেন। যদিও বিপন্ন পরিবেশ বা প্রকৃতি সংরক্ষণে প্রবাসীদের এখনো সম্পৃক্ত করা যায়নি।

২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন কার্যালয়ে ‘সিলেট বিভাগের পরিবেশ বিষণ্নতা, পরিবেশবাদীদের চলমান আন্দোলন ও প্রবাসীদের করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন) ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাঙালিদের সর্ববৃহৎ সামাজিক সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা যৌথভাবে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।

জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার সভাপতি বদরুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের (বেন) নিউইয়র্ক শাখার সহ-সমন্বয়ক সৈয়দ ফজলুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বাংলাদেশ থেকে আসা পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আবদুল করিম কিম সিলেট বিভাগের প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষণ্নতা, পরিবেশবাদীদের চলমান আন্দোলন সম্পর্কে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন।

সভায় মূল বক্তব্য রাখেন বাপার সহসভাপতি ও বেন-এর গ্লোবাল সহ-সমন্বয়ক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম আলোচনা সভার মূল বক্তব্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) গঠনের প্রেক্ষিত তুলে ধরে বলেন, ২০০০ সালে বাপা গঠনের মাধ্যমে দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার লড়াই শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে নাগরিকদের সম্পৃক্ততায় বাপা বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষায় শক্তিশালী ভ্যানগার্ডে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাপার শাখা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ২০০৬ সাল থেকে সিলেটে পরিবেশ আন্দোলনের সূচনা হয়।

অধ্যাপক নজরুল বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল সিলেট বিভাগে পরিবেশ বিনষ্টের চলমান প্রক্রিয়া দুর্ভাগ্যজনক। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিবেশকর্মীরা ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সর্দার হয়েও আশাব্যঞ্জক কাজ করে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলকভাবে এ কাজ অব্যাহত রাখা কঠিন। এ অবস্থায় সিলেটের পরিবেশগত বিপর্যয় প্রতিরোধে প্রবাসীদের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রে থাকা প্রবাসী বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছেন। তাঁদের বিভিন্ন উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন অনুপ্রেরণা পাচ্ছে। অনুরূপ অনুপ্রেরণা সিলেটের জন্যও প্রয়োজন। সিলেট বিভাগের প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী ব্যক্তিত্ব ও কমিউনিটি নেতাদের সিলেট বিভাগের সার্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশগত বিপর্যয় রোধে সম্পৃক্ত করতে পারে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের মতো প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সুরমা নদী ওয়াটারকিপার আবদুল করিম কিম সিলেট বিভাগের প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষণ্নতা ও পরিবেশবাদীদের চলমান আন্দোলন তুলে ধরে বলেন, সিলেটের প্রধান নদী সুরমার উৎসমুখ প্রায় এক দশক ধরে ভরাট হয়ে আছে। খোয়াই, মনুসহ সিলেটের অধিকাংশ নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে আছে। সিলেট বিভাগের প্রায় ৫০ ভাগ পাহাড় টিলা গত তিন দশকে কেটে সমতল করা হয়েছে। অসংখ্য জলাশয় ও পুকুর-দিঘি ভরাট হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সিলেটের প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করে ভূগর্ভস্থ পাথর উত্তোলনে বোমা মেশিন নামের স্থানীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রভাবশালী পাথরখেকো চক্রের লুটপাটে সিলেটে বিভাগের পিয়াইন, সারি, ধলাই, লোভা, যাদুকাটা, চলতি, রাংপানি ইত্যাদি নদী ও নদী তীরবর্তী এলাকা গত দেড় দশকে বিপর্যস্ত হয়েছে। অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলনের প্রভাবে ডাউকি নদী হারিয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সমাদৃত জাফলং, শ্রীপুর, বিছনাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, উৎমাছড়া, লোভাছড়া প্রতিনিয়ত রূপ হারিয়ে কদাকার হয়ে যাচ্ছে। লাউয়াছড়া, সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা ও রাজকান্দি বনাঞ্চল বৃক্ষশূন্য। রাতারগুল জলারবন অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক ও অপরিকল্পিত প্রকল্পবাজীতে বিপন্ন।

সদ্য শেষ হওয়া জালালাবাদ বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, সিলেট বিভাগে বর্তমান সময়ের প্রধান সমস্যা প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষণ্নতা। কিন্তু এখনো তা অনেকের বোধগম্যতার বাইরে। বিশেষ করে প্রবাসীদের সিলেটের পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা নেই। তাই উদ্বেগও নেই। যে কারণে বিলাসবহুল বাড়ি ও মসজিদ মাদ্রাসা তৈরিতে প্রবাসীদের আগ্রহ দেখা গেলেও সিলেটের নদ-নদী, পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল রক্ষায় এখনো তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। তিনি সদ্য সমাপ্ত জালালাবাদ বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সিলেটের ভাষা-ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির প্রতি সিলেটীদের যে ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে, সে ধারাবাহিকতায় সিলেটের বিপন্ন পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব রাখেন।

নিউইয়র্ক বাংলাদেশ সোসাইটি সাবেক সাধারণ সম্পাদক রানা ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিষণ্নতা নিয়ে প্রবাসীদের নির্লিপ্ততা রয়েছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। প্রবাসীদের এই নির্লিপ্ততার কারণ হতে পারে, এ সম্পর্কে যথাযথ ধারণার অভাব। এভাবে নদী দখল ও দূষণ হতে হতে সব নদী শেষ হয়ে গেলে, পাহাড় কাটা চলতে চলতে সব পাহাড় শেষ হয়ে গেলে, বন বিনাশ হতে হতে সব বন ফুঁড়িয়ে গেলে, হাওর ভরাট হতে হতে সব হাওর ভরে গেলে কেমন হবে? ভয়াবহ দুর্যোগ হবে। সিলেট আর সিলেট থাকবে না। তাই এই নির্লিপ্ততার অবসান প্রয়োজন।

জালালাবাদ বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের সদস্যসচিব ও জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার সাধারণ সম্পাদক জেড চৌধুরী জুয়েল বলেন, প্রবাসী সামাজিক সংগঠনগুলো দেশের শিক্ষা, চিকিৎসা, দারিদ্র্য বিমোচনসহ নানা ক্ষেত্রেই সহযোগিতা করে যাচ্ছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার কাজেও প্রবাসীরা ভবিষ্যতে সম্পৃক্ত হবে।

জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার সভাপতি বদরুল ইসলাম খান বলেন, ‘তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আয়োজিত এই সভা সিলেটের পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিলেটের নদ-নদী, হাওর-বাঁওর, বনাঞ্চল ও পাহাড়-টিলা ধ্বংসের চিত্র দেখে মর্মাহত হয়েছি। সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ বাঁচাতে অবিলম্বে কাজ শুরু করা প্রয়োজন। সিলেটকে বাঁচাতে হলে পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। পরিবেশবাদীদের পক্ষে একা এ কাজ করা সম্ভব নয়। পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন একযোগে কাজ করবে।’

আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন বেন-এর ড. ফাতেমা আহমেদ, সামশাদ হুসাম, লেখিকা শাহানা বেগম, জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য মোহাম্মদ একলিমুজ্জামান, সহসভাপতি মোশাররফ হোসেন ও শাহ আলাউদ্দদিন, আপ্যায়ন সম্পাদক মানিক আহমদ, ক্রীড়া সম্পাদক বোরহান আহমদ, কার্যকরী পরিষদ সদস্য সাব্বির হোসেইন, সৈয়দ লোকমান মিয়া, প্রাক্তন মহিলা সম্পাদিকা মুক্তা ধর, নাট্য সংগঠক সিতেশ ধর, সিলেটের সাংস্কৃতিক সংগঠক ফরিদা নাসরিন প্রমুখ।