রোহিঙ্গারা আসছে গভীর রাতে

../news_img/54966 mrin k.jpg

কামরুল হাসান ও গিয়াস উদ্দিন : বিদ্যুৎহীন শাহপরীর দ্বীপে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চাঁদের যে সামান্য আলো ছিল, একটু আগে তা মেঘে ঢেকে গেছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত পৌনে আটটা। হঠাৎ জেটির পূর্ব পাশ থেকে মানুষের কান্নার আওয়াজ আর নৌকার ইঞ্জিনের শব্দ।

বিজিবির চার সদস্য এগিয়ে যেতেই নৌকা থেকে এক বয়স্ক লোক চিৎকার করে উঠলেন। আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘স্যার, আমাদের মারবেন না। জীবন বাঁচাতে এখানে পালিয়ে এসেছি। নৌকা দেখলেই মিয়ানমারের সেনারা গুলি করছে।’ বিজিবির এক সদস্য বললেন, ‘ভয় নেই, ধীরে ধীরে নেমে বেড়িবাঁধের ওপরে যান।’

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত এক যুবককে নৌকা থেকে ধরাধরি করে নামালেন সবাই। গত সোমবার রাতে প্রথম যে নৌকাটি এল, তাতে শিশুসহ নারী-পুরুষ ছিলেন ২১ জন। এরপর রাত ১১টা পর্যন্ত আসে আরও সাতটি নৌকা। নৌকায় আসা লোকজনকে নেওয়া হয় স্থানীয় একটি মাদ্রাসায়।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে দ্বীপের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সোমবার রাতে মোট ৪৭টি নৌকায় করে রোহিঙ্গারা এসেছে। সব মিলে লোকসংখ্যা ছিল ৪ হাজার ২৩১ জন। তারা বলছেন, এখন দিনের বেলায় নৌকা দেখলেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী গুলি করছে। সে কারণে রোহিঙ্গারা আসছে রাতের অন্ধকারে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন শুরুর পর সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার যে ঢল নেমেছিল, তা এখনো অব্যাহত আছে। তবে আগে একাধিক সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গারা এলেও এখন আসছে শাহপরীর দ্বীপ ও কাটাখালী দিয়ে।

রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সমন্বয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মোহাম্মদ মাহিদুর রহমান বলেন, গতকাল পর্যন্ত ৫ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা এসেছে। তবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, এই সংখ্যা ৬ লাখের কাছাকাছি।

বাংলাদেশের মানচিত্রে একেবারে নিচের দিকে (দক্ষিণে) যে ছোট বিন্দুটি, সেটাই হলো শাহপরীর দ্বীপ। দুই দিকে বঙ্গোপসাগর আর একদিকে নাফ নদী। নদী ও সাগরে মিশে যাওয়া ভরা খাল এই দ্বীপকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ৪০ হাজার বসতির এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে মানুষের জীবিকা হলো মাছ ধরা। চারদিকে অসংখ্য নৌকা।

রোহিঙ্গাদের আনার জন্য এসব নৌকা ভাড়া খাটত। কিন্তু সোমবার রাতে শাহপরীর দ্বীপে দেখা গেল উল্টো চিত্র। রোহিঙ্গারা আসছে মিয়ানমার থেকে ভাড়া করা নৌকায়। এপারে আসার জন্য জনপ্রতি দিতে হয়েছে তিন হাজার টাকা।

সীমান্ত পেরিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রথমে নেওয়া হলো শাহপরীর দ্বীপের দারুল উলুম মাদ্রাসায়। সেখানে বিভিন্ন কক্ষে নারী ও পুরুষদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি গরু জবাই করা হয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য।

এ সময় কিছু লোককে রোহিঙ্গাদের হাতে টাকা দিতে দেখা যায়। মাদ্রাসা থেকে রোহিঙ্গাদের জিপে করে আনা হয় উত্তরপাড়া এলাকায়। সেখান থেকে নৌকায় হারিয়াখালী গ্রামে। এরপর ট্রাকে করে আনা হবে টেকনাফ বা উখিয়ার কোনো ক্যাম্পে।

মাদ্রাসায় কথা হয় মংডু শহরের কলিজাভাঙা এলাকা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নবী হোসেন, আজিজুল রহমান ও আহমদ আলীর সঙ্গে। তারা বললেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে। গ্রামে কোনো রোহিঙ্গাকে থাকতে দিচ্ছে না। ভালো কাঠের ঘরগুলো দখল করে নিচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন দিনের বেলায় প্যারাবনে বা নৌকার মাঝিদের বাড়িতে অবস্থান করছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা লুকিয়ে থাকছে ধানখেতে। সন্ধ্যার পর নৌকায় করে লোকজন নাফ নদী পাড়ি দিচ্ছে।

গুলিবিদ্ধ যে যুবককে নৌকা থেকে নামতে দেখা গেল, তার নাম মোহাম্মদ তৈয়ব। এই যুবক বললেন, দুই দিন আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের মংডুর কাহারিপাড়ার বাসায় হামলা চালায়। তাদের গুলিতে তিনি আহত হন। বাড়ির লোকজন এরপর ধানখেতে লুকিয়ে ছিল।

মংডু শহরের হারিপাড়ার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, সেখানে মিয়ানমারের সেনারা মুসলমানদের ঘরবাড়ি দখল করছে। এসব থেকে রক্ষা পেতে অনেক ব্যবসায়ী বাংলাদেশে পালিয়ে আসছেন। এ দেশের সঙ্গে তাদের গরুর ব্যবসা আছে।

তিনি বলেন, বাড়িঘর রক্ষার জন্য তাদের গ্রামের লোকজন মিয়ানমারের সেনাসদস্যদের ১৩ কোটি কিয়াদ ঘুষ দিয়েছেন। কিছুদিন পর তারা বলছে, ‘তোয়া তোয়া’ (যাও যাও)।

গতকাল দুপুরে শাহপরীর দ্বীপ বাজার এলাকায় কথা হয় মিয়ানমারের মংডু শহরের চার কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দা রহমত উল্লাহর (৪৮) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত রোববার সকাল আটটার দিকে আমাদের গ্রামের কিছু লোককে ঘর থেকে ডেকে বের করে মিয়ানমারের সেনারা। দুপুরের দিকে তারা পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।’

এ সময় তাদের কয়েকজনকে মারধর করা হয়। আসার সময় তারা কয়েকটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখেন। তিনি বলেন, ওই সব গ্রামে মুসলমানশূন্য সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে।

টেকনাফের সাবরাং ইউপির চেয়ারম্যান নুর হোসেন বলেন, রোববার রাত সাতটা থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত শাহপরীর দ্বীপ এলাকা দিয়ে প্রায় ১৪ হাজারের মতো রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে।

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে শুনেছি, রাখাইনের বিভিন্ন গ্রামে মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা মুসলমানশূন্য এলাকা হিসেবে সাইনবোর্ড টাঙানোর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় উৎসব করছে।’

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মিয়ানমার সেনাবাহিনী মংডু জেলা শহর থেকে মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে বের করে দিচ্ছে। সরকারি কর্মচারী হলেও রক্ষা নেই। শাহপরীর দ্বীপের মাদ্রাসায় দামি বাক্স-পেটরা নিয়ে আসা নুরুল আলমের পরিবারকে দেখলেই বোঝা যায় বেশ সচ্ছল। সঙ্গে আসা রোহিঙ্গারা তাকে বেশ সমাদর করছেন।

নুরুল আলম মংডু আদালতের বিচারক লো জংয়ের ব্যক্তিগত কর্মচারী। বললেন, তিনি মংডু শহরের সিকদারপাড়ার বাসিন্দা। স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ ১৮ জনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। তিনি বললেন, গত ২৪ আগস্টের পর থেকে মুসলমান কর্মচারীদের কোথাও কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি নিজেও আদালতের নিজের দপ্তরে ঢুকতে পারেননি।

২ লাখ ১৮ হাজার কিয়েট (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৩ হাজার) বেতন পেতেন। সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারা গ্রামের বাজারেও যেতে পারছিলেন না। এখনো রাখাইন থেকে চলে যাওয়ার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী গ্রামে গ্রামে মাইকিং করছে। বলা হচ্ছে, শহর না ছাড়লে গুলি করা হবে। বাধ্য হয়ে পরিবার নিয়ে তিনি পালিয়ে এসেছেন। প্রথম আলো।