এবার ভারত যাবে ১৭ লাখ বাংলাদেশি

../news_img/56021 mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক : ২০১৬ সালে ভারতের ভিসা নিয়েছে সাড়ে ১৪ লাখ বাংলাদেশি। একক দেশের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশ থেকেই সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ প্রতিবছর ভারত যাচ্ছে।

এ বছর ভারতে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ১৭ লাখে পৌঁছবে বলে মনে করছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজার বাংলাদেশি আবেদন করছে ভারতের ভিসার জন্য।

আবেদনকারীদের জন্য ঢাকার শ্যামলী এবং সিলেটে দুটি ক্যাশলেস ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র গতকাল বুধবার উদ্বোধন করলেন সফরকারী ভারতীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মোট ১২টি ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র থেকে ক্যাশলেস ভিসা আবেদন জমা দিতে পারবে ভিসাপ্রার্থীরা। অর্থাৎ ভিসা ফি বাবদ এত দিন যেভাবে নগদ অর্থ পরিশোধ করতে হতো, এখন থেকে আর তা করতে হবে না। আবেদনকারীরা যেকোনো ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ওই অর্থ পরিশোধ করতে পারবে।

গতকাল সোনারগাঁও হোটেলে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনিশিয়েটিভ অব দ্য গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে দুই দেশের অর্থমন্ত্রী ক্যাশলেস ভিসা আবেদন কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। শ্যামলী ভিসাকেন্দ্রে প্রথম আবেদন করেন কামরুন নাহার, সিলেটে মিসবাহ বেগম।

অনুষ্ঠানে অরুণ জেটলি বলেন, ভারত দিন দিন নগদ অর্থের ব্যবহার কমাচ্ছে।
কয়েক বছর ধরে ভারত উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। তিন বছর ধরে ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। তবে ক্যাশলেস ভারত গড়তে ধাপে ধাপে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ভারতের অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে ভারতের ৫৮ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং পরিষেবার আওতাভুক্ত ছিল। বাকি ৪২ শতাংশের সঙ্গে ব্যাংকের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাদের বেশির ভাগই প্রত্যন্ত পল্লী এলাকা ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা। ২০১৪ সালে সরকার পুরো ভারতে ব্যাংকের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে থাকে। এ কাজে সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোও ভূমিকা রাখে। ব্যাংকের প্রতিনিধিরা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য অনুরোধ করে উৎসাহী করতে থাকেন। ভারতজুড়ে নাগরিকদের ব্যাংকে হিসাব খুলতে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়।

অরুণ জেটলি বলেন, ‘এরপর ৩০ কোটি নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হয়। ভারতে সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি পরিবার রয়েছে। এই ৩০ কোটি অ্যাকাউন্টের ৭৮ শতাংশই ছিল জিরো ব্যালান্স, অর্থাৎ ৭৮ শতাংশ অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা ছিল না। এখন ২০ শতাংশ অ্যাকাউন্টে টাকা নেই। এর অর্থ হলো, অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার হচ্ছে। অ্যাকাউন্ট খুলতে জনগণকে প্রণোদনা দিয়েছে ভারত সরকার। কম খরচের বীমা সুবিধা ও পেনশন-ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এখন ভারতের জনগণের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ’ তিনি বলেন, ‘এখন প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর রয়েছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সরকারের ভর্তুকি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হচ্ছে। ভারতে ১০০ কোটি মোবাইল ফোন রয়েছে। ফলে আমরা এখন খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারি, কার কোথায় ভর্তুকি পাওয়ার কথা। আগে এ সুযোগ ছিল না। পেট্রলসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ভর্তুকি যাদের দরকার নেই, তারাও ভোগ করত। ’

ক্যাশলেস ভারত গড়ার পরবর্তী ধাপ হিসেবে অরুণ জেটলি বলেন, ‘বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির ৮৬ শতাংশ নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল, জিডিপির ৫০ শতাংশ নির্ভর করে নগদ অর্থের ওপর। কিন্তু নগদ অর্থ দুর্নীতি বাড়ায়, ছায়া অর্থনীতি সৃষ্টি করে, রাজস্ব কমায় ও সন্ত্রাসীদের অর্থায়নে সহায়ক হয়। তাই ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে ভারত মনোযোগ দিয়েছে। পুরনো নোট বাতিলের কারণে যার কাছে যা অর্থ ছিল, ব্যাংকে জমা দিয়েছে। এখন আমরা দেখব, যেসব অ্যাকাউন্টে অনেক বেশি অর্থ জমা আছে, তাদের আয় কত, বেনামি সম্পদ থাকলে খুঁজে বের করব। ’

এই উদ্যোগের ফলে ইতিমধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে অরুণ জেটলি বলেন, ভারতে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ছে। আয়কর থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন কমে গেছে। ভারত গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (জিএসটি) চালু করেছে। এ ক্ষেত্রে নতুন ডিজিটাল পদ্ধতি কার্যকর করা হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পরিবর্তন আসছে, রাজস্ব আয়ও বাড়ছে। এতে ভারতের অর্থনীতি আরো সম্প্রসারিত হবে, স্বচ্ছ জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে, প্রবৃদ্ধি আরো বাড়বে। দুর্নীতি ইতিমধ্যে অনেকটা কমে গেছে। মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের অর্থনীতি অনেক এগোবে।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, শুরুতে বাংলাদেশ বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরে একসময় বৈদেশিক সহায়তা নির্ভরতা থেকে বের হয়ে এসেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছে।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, অরুণ জেটলি অর্থমন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন। এর মধ্যে রয়েছে কালো টাকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ইউনিয়ন বাজেট সম্পৃক্তকরণ ও প্রকল্প ব্যয় কমানো। দুই দেশের দুই অর্থমন্ত্রী পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত মাইলফলক ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

অনুষ্ঠানে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বি শ্রীরাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজার ভিসা আবেদন জমা পড়ছে। বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে যায়, তাদের জন্য ফরেন ট্রাভেল কার্ড চালু করেছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। এটি ভারতে ব্যবহার করা যাবে। রুপি ছাড়াও এ কার্ডের মাধ্যমে ডলারেও বিল পরিশোধ করা সম্ভব হবে। যারা বাংলাদেশ থেকে ভারত যায়, তারা এ কার্ড ব্যবহার করলে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমবে।

ভারতের এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড রাসকিনাহ বলেন, বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণ যাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, সে জন্য এক্সিম ব্যাংক ঢাকায় একটি কো-অর্ডিনেশন অফিস খুলছে। দুই অর্থমন্ত্রী এই অফিস উদ্বোধন করেন।

সমাপনী বক্তব্যে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, ‘যদিও বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে, চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি দ্রুত বাড়ছে। ভারতের অর্থনীতির চীনের চেয়েও উন্মুক্ত, ভারত আমাদের সব পণ্যে শুল্ক ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে। তাহলে ভারতে রপ্তানি বাড়ছে না কেন? দুঃখজনক হলো, ভারতের নেতৃত্ব বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী হলেও কাস্টমস ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে না। ’