মিশরে নতুন মমি আবিষ্কারের অভিযান

../news_img/54992 mrin k.jpg

ইউ.এইচ. খান, মিশর থেকে  :: ইতিহাস ও প্রাচীন সভ্যতার আদি ভূমি হিসেবে পরিচিত মিশর। প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য মিশর একটি বড় রহস্য। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে এই মিশরেই। একজন বাংলাদেশী হিসেবে মিশরের কোন প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ খুবই বিরল।

 

আমার পেশার  সুবাদে  গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক মন্ত্রণালয় হতে একটি ইমেইল পাই। সেখানে লুক্সোর প্রদেশে নতুন একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে জানানো হয়। এখানে বলে রাখা দরকার আপনাদের পরিচিত ঐতিহাসিক কিংস ভ্যালি, কুইনস ভ্যালি, কর্নাট মন্দির, ইজিপশিয়ান দেবতাদের মন্দির সহ অনেক কিছুই কিন্তু এই লুক্সোরেই অবস্থিত। গুগোলে সার্চ  দিলেও বিস্তারিত জানতে পারবেন। অভিযান এলাকাতে বিশ জন বিদেশী সাংবাদিক ও গবেষকদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। আগ্রহী গনকে আবেদন করতে বলা হয়। মিশরের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করার সুবাদে মোটামুটি ভাল সুপারিশ সহ আবেদন জমা দেই। সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ আমাকে জানানো হয় আমি নির্বাচিত হয়েছি। প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে মিশরের সরকারী মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের সদস্য নির্বাচিত হওয়া আমার জন্য ছিল বিরাট পাওয়া। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম অভিযান শুরু করার জন্য। মনে মনে আশা করছিলাম যদি একটা মমি আবিষ্কার হয় তবে বেশ হয় । আশা পূরণ হয়েছিল।

 

সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে লুক্সোর যাওয়ার টিকেট ও হোটেলের বুকিং পেপার নিয়ে আসতে বলা হলো। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করার পর দেখলাম আমাকে আট তারিখ ভোর ৪ টায় লুক্সোরের বাস ধরতে হবে। সময়মত তৈরী হয়ে নিলাম। কায়রো শহরের  বিখ্যাত তাহারির স্কয়ারের পাশেই গোবাসের কাউন্টার। মিশরের প্রথম সারির বাস কোম্পানি এই গোবাস। খুবই অত্যাধুনিক সব ব্যবস্থা। বাসগুলো যে কোন এলিট বিমান সার্ভিসের মত। বিশাল বিশাল সব আসন। সাথে  ওয়াইফই, বাসের ভিতর টয়লেট , খাবারের ব্যবস্থা, প্রত্যেক সিটের সাথে আলাদা টিভি ও সাউন্ড সিস্টেম। একেবারে ঘড়ির কাটা মত ভোর ৪ টায় বাস ছেড়ে দিল। কায়রো শহর থেকে বের হওয়ার একটু পরই সকালের প্রথম আলো দেখা গেল । যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই  ড্রাইভার জানালো সব ঠিক থাকলে আট ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের লুক্সোর শহরে পৌছানোর কথা । পথে দুই বার যাত্রা বিরতি হবে। রাস্তার পাশে প্রাকৃতিক পরিবেশ , রুক্ষ মরুভুমি, পাহাড় , পাথুরে  টিলা ইত্যাদি যেন অপার্থিব এক পরিবেশের সৃষ্টি করছিল। কায়রো থেকে লুক্সোর শহরের দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটার । সকাল ৭ টায় আমাদের বাস বেনিসুইফ প্রদেশের একটি পাহাড়েরর চুড়ার উপর অবস্থিত হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট এ যাত্রা বিরতি করল। আশে পাশে যতদূর চোখ যায় ধুধু পাথুরে মরুভূমি। সোলার সিস্টেম ব্যাবহার করে এখানকার বিদ্যূতের যোগান হয়। পানি গাড়িতে ট্যাঙ্কের মাধ্যমে নিকটস্থ শহর থেকে আসে। এখানে মিলিটারির কড়া পাহারা চোখে পরলো। যদিও রাস্তাটার নামই “ শেরা গেইশ” মানে মিলিটারি রোড।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় চিন্তা করেছিলাম বাসে ঘুমিয়ে নিব। কিন্তু আশে পাশের দৃশ্য দেখে ঘুম একে বারে চোখ থেকে বিদায় নিয়েছে। এমন দৃশ্য কি আর মিস করা যায়। পুরো যাত্রা পথে একেক সভ্যতা , একেক ধরনের মানুষ, একেক ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখেছি। সোহাগ নামক প্রদেশে জুমার নামাজের জন্য যাত্রা বিরতি হলো। আশে পাশে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এই একটিই মানব স্থাপনা। একটি হোটেল, পেট্রল পাম্প, ও মসজিদ। ইতিমধ্যেই মরুভূমি আফ্রিকান আদিম চেহাড়া নিয়েছে। যতদূর চোখ যায় শুধু মরুভূমি আর আফ্রিকান মরুভূমির ঝোপ।  কিনা নামক প্রদেশ অতিক্রম করার জন্য যে বাইপাস রাস্তাটা আছে সেটা নীলনদের তীর বরাবর। কয়েক ঘন্ট রুক্ষ মরুভূমি দেখার পর হঠাৎ করেই চার পাশের দৃশ্য বদলে গেল । আশে পাশে সব সবুজ। যতদূর চোখ যায় শুধু কৃষি জমি। একেবারে বাংলাদেশের মত দৃশ্য। ধান, গম, ভুট্টা, আখ, কলাই, শব্জি, জব সহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের ক্ষেত। মিশরের কৃষকরা অনেক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহার করে। কৃষিক্ষাতে মিশরের সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমান ভর্তুকি দেয় এবং কৃষক সরাসরি তা ভোগ করে। নীল নদের অববাহিকার রাস্তায় যতক্ষন ছিলাম ততক্ষন শুধু মনে হচ্ছিল এ যেন বাংলাদেশের পরিবেশ। পার্থক্য শুধু রাস্তার। মিশরের প্রায় সব মহা সড়কই ১০লেনের বেশী। মহাসড়কের আশে পাশে কোন স্থাপনা নেই। দুই দিকের লেন সম্পূর্ন  আলাদা। কোন স্পিড ব্রেকারও নেই। বিকেল চারটায় লুক্সোর শহরে পৌছালাম।

 

বাস টার্মিনালে পৌছেই দেখি লুক্সোর গভর্নরের সৌজন্যে একটি সুদৃশ্য প্রাচীন ইজিপশিয়ান মডেলেল ঘোড়ার গাড়ি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম সাধারন দেখতে কোচোয়ান লোকটি খুব বিশুদ্ধ ভাবে ইংরেজি বলছে। পরে কথা বলে জানলাম পর্যটনের সাথে সম্পৃক্ত এমন সকল ধরনের পেশাজীবীদের সরকারীভাবে বিনামূল্যে কয়েকটি করে ভাষা শেখানো হয়। খুব কড়া ভাবে পুরো বিষয়টি মনিটরিং করা হয়। কোন হয়রানী বা প্রতারণার সম্ভাবনা নেই। নেই কোন ছিনতাই বা চুরির সম্ভাবনা। কোন হোটেলের কোন জানালায়  গ্রিল নেই।  আমার দুঃখ হলো আমাদের বাংলাদেশে এমন ব্যাবস্থা নেই দেখে। সারারাত ও সারাদিনের টানা জার্নি শেষে হোটেলে পৌছে চক্ষু শীতল হয়ে গেল । মিশর সরকার আমার জন্য মিশরের বিখ্যাত একটি পাচ তারকা হোটেলের ডিলাক্স রুম বুক করে রেখেছে। নীল নদের মাঝখানে পুরো একটি দ্বীপ নিয়ে একটি হোটেল । হোটেলের নাম ‍জলি ভিল লুক্সোর। এই হোটেলটি সত্যিই অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিপূর্ন। প্রায় চার কিলোমিটার যায়গা নিয়ে পুরো হোটেলের কম্পাউন্ড।  হোটেলের ভেতর যাতায়াতের জন্য রয়েছে ইলেকট্রিক ট্রয় কার। হোটেলের বিশার সুইমিং পুল আর পাশে নীল নদ ! অতুলনীয়।


পরদিন সকাল ৭ টায় কাঙ্খিত প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ইতিমধ্যেই একটি মমির কফিন পাওয়ার গুন্জন উঠেছে সকল সাংবাদিক ও গবেষকদের মধ্যে ।  জানলাম আজই খোলা হবে এবং আমাদের এই বিদেশী সাংবাদিক ও গবেষক দলটিকে ছবি তোলার অনুমতি দেয়া হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিষের ছবি তোলার ক্ষেত্রে মিশর খুবই রক্ষণশীল। ফলে এরকম সংবাদ যেন চাদ হাতে পাওয়া। লুক্সোর শহর থেকে নীল নদের পশ্চিম তীরের পাশ দিয়ে প্রায়  ৫০ কিলোমিটার  দূরের একটি জনশূন্য পাহাড়ী এলাকা আমাদের গন্তব্য স্থল। পাহাড় থেকে এক কিলোমিটার দূরে গাড়ি থেকে নেমে পদব্রজ অবলম্বন করতে হলো । তীব্র তাপ ও পাহাড়ী পাথরের রুক্ষতায় অল্পতেই বার বার সবাই হাপিয়ে উঠলাম। আকা বাকা পাহাড়ী প্রাচীন ট্রেইল অনুসরণ করে একটি গুহার মুখে আমরা থামলাম। আমাদের সাথে পুলিশের একটি চৌকশ দল ছিল। তারাই আমাদের গাইড করে নিয়ে যাচ্ছিল। আশে পাশে পুলিশ ও সেনা বাহিনীর কড়া অবস্থান দেখে বুঝলাম চলে এসেছি সেই স্বপ্নের যায়গায়। চেম্বারের গায়ের শিলা লিপি অনুযায়ী এটি একটি কবরস্থান। ৩৫০০ বছর আগেকার ফেরাউনের রাজ পরিবারের এক প্রধান স্বর্নকারের পারিবারিক কবরস্থান এটি। আরো নয়জন বিদেশী সাংবাদিকের সাথে আমাকে ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলো। আমার সাথে ছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, বিবিসি , সি.এন.এন সহ বিশ্বসেরা সব মিডিয়ার লোকজন।  আমরা প্রথম চেম্বারে সহজেই নামলাম। সবাই ছবি তুলতে লাগল। আমিও শুরু করলাম। চোখের সামনে ৩৫০০ বছর আগের সদ্য আবিস্কৃত গুহা চিত্র, আসবাব পত্র, দেয়ালের নকশা, তৈজসপত্র ইত্যাদি দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি কতবার তার হিসেব নেই। এতই নিখুত সে সব ডিজাইন যা দেখে বিশ্বাসই হয় না যে কম্পিউটার ছাড়া করা সম্ভব। মূল চেম্বারে নামাটা খুবই কঠিন । কেননা প্রাচীন মিশরীয় কারিগররা এই স্থাপনা তৈরি করার পর কফিন স্থাপন করে কোন ভাবে গুহামুখ সিল করে দিয়েছিল। এখনো মূল দরজা আবিস্কার হয়নি। সরাসরি ২০ মিটার পাথর খুড়ে একটি কুয়ার মত প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে। খুবই বিপদ সঙ্কুল আর অসম্ভব পরিশ্রমসাধ্য পথ ছিল ওটা। আমি প্রথম  নিচে নেমে দেখলাম সরকারী গবেষক দল একটু আগে মমির কফিনের চেম্বারটি খুলেছে। আমি প্রথম ক্যামেরার ফ্লাশ বাটন চাপলাম। স্বাক্ষী হলাম এক ইতিহাসের। এর আগের কয়েকদিনের আবিস্কৃত সব জিনিসপত্র পাহাড়েরর বাইরে  চূড়ার উপর মিলিটারে পাহাড়ায় রাখা ছিল।
টানা দুই দিন ওখানে থেকে যথাসম্ভব আবিস্কৃত সবকিছু দেখেছিলাম। আকার ও কম্পিউটার ডাটা দেখে গবেষকরা মনে করছেন এখানে পাহাড়ের মধ্যে পুরো একটি প্রাসাদ পাওয়া যেতে পারে। আগামী ২ বছর ধরে খনন কাজ চলবে ওখানে। গবেষক দলের প্রধান এবং লুক্সোরের গভর্নর উভয়কে একসাথে পেয়ে অনুরোধ করেছিলাম নতুন আরো কিছু আবিস্কার হলে আমাকে আবার যাতে ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশর সুযোগ দেয়া হয়। তারা দুজনেই কথা দিয়েছেন নতুন কোন কিছু আবিস্কার হওয়া মাত্র সরকারী ভাবে আমাকে আবার দাওয়াত দিবেন। আমিও আশায় আছি। কায়রো ফিরেছি এক মাস আগে। এর মধ্যেই খবর পেয়েছি পাহাড়ের ভেতর প্রাসাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে গবেষক দল নিশ্চিত। খুব দ্রুতই তারা বড় আকারের অভিযান শুরু করবে। অনেক গবেষক আশা করছেন এখানে এই শতাব্দির সবচেয়ে বড় কোন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিস্কার হতে পারে। যা প্রাচীন ইতিহাসের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিবে। আমিও চেষ্টা করব যতটুকু সম্ভব নিয়মিত বাংলায় লিখে প্রকাশ করার জন্য।