‘দল থেকে একটি চিঠিও পাই না, কেউ দেখতেও আসে না’

../news_img/56097mmm.jpg

বাদল নূর : প্রবীণ রাজনীতিক শেখ আবদুল আজিজ তার দল আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, দলের জন্য জেল খেটেছি। কত অত্যাচার-নির্যাতন সয়েছি।

অথচ দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, এমনকি স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যেতে একটি চিঠিও আমাকে দেওয়া হয় না। আমি যেতে পারি আর না-ই পারি অন্তত একটি চিঠি দিলে সান্ত্বনা পেতাম যে দল আমায় মনে রেখেছে।

শেখ আজিজ গতকাল রাজধানীর গুলশানে তার বাড়িতে একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের দুঃখ-বেদনা-প্রত্যাশার কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, তাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। দেশের পক্ষে কথা বলায় তাকে চার বছর কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছে। কারাগারে তাকে রাখা হয়েছিল ফাঁসির আসামির সেলে।

খন্দকার মোশতাকের আমলে তার সন্তানদের এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তার সন্তানরা দলের কোনো সহায়তা পায়নি। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা এই সদস্য বলেন, তার সঙ্গে যারা রাজনীতি করেছিলেন তাদের সন্তানরা অনেকেই দলের মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়েছেন। অথবা দলের পদ পেয়েছেন। তার ছোট মেয়ে নাবিন শেখ মেঘলা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক।

তিনি বলেন, ‘মেঘলা নিজের যোগ্যতায় দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করতে পারে। আমি চাই সংসদের বাগেরহাট-৪ নারী আসনে আমার এই মেয়েকে মনোনয়ন দেওয়া হোক। শেখ হাসিনার কাছে এটাই আমার দাবি।’ ৮৮ বছর বয়সী গুরুতর অসুস্থ এই নেতা জানান, তার বাড়ির যে ফ্ল্যাটটি ভাড়া দেন দুই বছর ধরে তার ভাড়াটে মিলছে না।

ছেলে শেখ আশিক হাফিজ আমেরিকায় একটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। তার পাঠানো টাকা আর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে। এ টাকাতেই তার ওষুধ-পথ্য কেনা হয়। বড় মেয়ে সিমিন শেখ আমেরিকার ওয়াশিংটনে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষা অফিসার। ছোট মেয়ে ডা. নাবিন শেখ মেঘলা তাকে সর্বক্ষণ দেখাশোনা করছেন।

শেখ আজিজের স্ত্রী শওকত আরা মারা গেছেন প্রায় এক বছর হলো। আক্ষেপ করে শেখ আজিজ বলেন, দীর্ঘদিন যাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছি তাদের সঙ্গে এখন আর দেখা হয় না। এমনকি বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনরাও দেখতে আসে না। কেউ টেলিফোনও করে না। অনেক দিন আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তাকে দেখতে এসেছিলেন।

মাঝে-মধ্যে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগও তাকে দেখতে আসেন। এ ছাড়াও একবার ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান তাকে দেখতে এসেছিলেন। ২০১০ সালে শেখ আজিজ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে দেখতে এসে চিকিৎসা খরচের জন্য এক লাখ টাকা দেন।

শেখ আজিজের জন্ম ১৯২৯ সালে বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ থানার তেলিগাতী গ্রামে। তিনি লেখাপড়া করেন কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাস্টার্সের পর তিনি এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরের লিয়াজোঁ অফিসার শেখ আজিজ বলেন, সারা জীবন দেশের জন্য খেটেছি। নিজের কথা ভাবিনি। আমার মেয়ে ডা. মেঘলা শিশুদের হৃদরোগের ডাক্তার। অথচ তার পোস্টিং হয়েছে এডাল্ট কার্ডিওলজিতে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে মেয়েটাকে একটা রুমও দেওয়া হয়নি। পাঁচ বছর ধরে তার ওপর অবিচার চলছে।

একদা তেজস্বী এই রাজনীতিক এখন চোখে দেখেন না, কানে কম শোনেন, কোমরে ব্যথা, কোনো কিছু খেতে মন চায় না। বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটান। বাড়ির যে কামরায় তিনি থাকেন সেখানে অক্সিজেন-নিমুলাইজ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। বাসার কেয়ারটেকার বারেক ও আনোয়ারের কাঁধে ভর দিয়ে তাকে বাথরুমে যেতে হয়। ‘রাজনীতির সেকাল ও একাল’ নামে শেখ আবদুল আজিজ রচিত একটি বই ২০১২ সালের জুনে প্রকাশ হয়। ইশারায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন।

শেখ আবদুল আজিজ বলেন, ‘শেখ হাসিনার সাবধানে চলাফেরা করা দরকার। বঙ্গবন্ধুকে একটু সাবধানে চলাফেরা করার জন্য বললে তিনি আমার দিকে চেয়ে মুচকি হেসেছিলেন। পরে তো মর্মান্তিক ব্যাপার ঘটে গেল। শেখ হাসিনার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তিনি পিতা-মাতা, ভাইসহ ঘনিষ্ঠজনদের হারিয়েছেন। দেশের উন্নয়নের জন্য তিনি যেভাবে আত্মত্যাগ করবেন, কাজ করবেন, অন্য কেউ তা করবে না।’ বিডি প্রতিদিন