প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পাবে দুপুরের খাবার

../news_img/56122mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক::প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিশুদের বিদ্যালয়ে শতভাগ ভর্তি ও উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আগে থেকে চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচির জন্য একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। এ কর্মসূচিকে ঘিরে এটিই হচ্ছে প্রথম নীতিমালা। অতীতে ক্ষুদ্র পরিসরে চললেও সরকার এখন এ কর্মসূচির কলেবর আরও বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। এতে করে দেশের প্রতিটি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার পাবে।
২০১১ সাল থেকে দেশের ৯৩টি জেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ৩০ লাখ শিশু এ কর্মসূচির সুফলভোগী। বর্তমানে জনপ্রতি বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত পুষ্টিকর ৭৫ গ্রাম বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। কিছু কিছু বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে রান্না করা খাবার শিশুদের সরবরাহ করা হচ্ছে। সুষ্ঠু জাতি গঠনে সমৃদ্ধ শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে সর্বজনীন কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে চায় সরকার। আর তা করতে পারলে দেশের প্রতিটি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার পাবে। ২০২১ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী এ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দুর্গম চর, হাওর, উপকূলীয় অঞ্চল, পার্বত্য এলাকা, চা-বাগানসহ পিছিয়ে পড়া অঞ্চল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত হবে।
নতুন নীতিমালা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্তরা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, নীতিমালা তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মতামত নেয়া দরকার ছিল। নীতিমালায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেয়া হয়েছে। অংশীজনের মতামতও নেয়া হয়েছে। সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী এবং সমাজের বিত্তবানদের সহায়তায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তারা। যা স্কুল ফিডিং নীতিমালা-২০১৭ নামে অভিহিত হবে।
চূড়ান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি হচ্ছে শিশু জনগোষ্ঠী; যারা প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে লেখাপড়া করছে। খাদ্য সহায়তার ফলে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পুষ্টিহীনতা থেকে মুক্তি পাবে। শিশুদের বিদ্যালয়ে অবস্থান ও ক্ষুধা নিবারণে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বিশেষ অবদান রাখছে। চলমান কর্মসূচির ফলে ড্রপআউটও কমে আসছে। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে সব ধরনের বৈষম্য নিরসন, খাদ্য নিরাপত্তা বলয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। ২০২১ সালের মধ্যে সরকার দেশের সব প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে; যা শিশুদের শিক্ষার অধিকার, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বিশাল এ কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের সব প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় এ কর্মসূচির আওতায় আনা এবং তা সফলভাবে চালু রাখতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় বিত্তশালীদের সহায়তা নেয়া হবে। সমাজের দানশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চাইলেই তাদের দান-অনুদানে স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য খাবার অর্থ সরবরাহ করতে পারবেন।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে একটি সেল গঠন করা হবে। প্রয়োজনে একটি কর্তৃপক্ষও গঠন করা যেতে পারে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি থাকবে। সরকার সমাজের যে কোনো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি পদে নিয়োগ দিতে পারবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট মেয়াদে উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি নিয়োগ দেবে। এ কমিটির কাজ হচ্ছে কর্মসূচি বাস্তবায়নে সব ধরনের পরামর্শ দেয়া। বিদ্যালয়ভিত্তিক এ খাদ্য কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে সরকার বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কারিগরি সহায়তায় একটি গবেষণা কেন্দ্র চালু করবে। তারা কর্মসূচির বিভিন্ন দিক ও বিভাগ নিয়ে গবেষণা করবেন। ওই কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা হবে। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান স্কুল ফিডিং কর্মসূচি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করবে। অর্থায়ন, সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, কর্মসূচির গুণগত মান রক্ষা, কর্মসূচিতে প্রয়োগ করা যায় এমন পদ্ধতি উদ্ভাবন করবে। গবেষণা কেন্দ্রটি বিশ্বব্যাপী এ সংক্রান্ত ভালো অনুশীলন, উত্তম প্রয়োগগুলোর রিসার্চ সেন্টার হিসেবে কাজ করবে। স্কুল ফিডিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব প্রতিষ্ঠানকে তথ্য সরবরাহ করে সহায়তা করবে। গবেষণার ফলের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করবে।
শিশুদের কী ধরনের খাবার দেয়া হবে তাও নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে ভাত, খিচুরি, ডিম, ডাল, সবজি ইত্যাদি খাবার তালিকায় থাকবে। এসব খাবার গ্রামের স্থানীয় কমিউনিটি ও শহরে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করবে। স্কুল চলাকালে প্রতিটি শিশুকে উপযুক্ত পরিমাণে পুষ্টিকর বিস্কুট সরবরাহ করা হবে। সেক্ষেত্রে সময়ে সময়ে স্বাদের পরিবর্তনের মাধ্যমে বৈচিত্র্য থাকতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিবেশন করা হবে। সেক্ষেত্রে পাউরুটি, শুকনো ফল ও দুধ স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা হবে। মৌসুমি ফল বিশেষ করে কলা, পেয়ারা, আম, আমড়া স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করে শিশুদের সরবরাহ করা হবে। খাদ্য তালিকা প্রস্তুতের সময় ভৌগোলিক বাস্তবতাকে আমলে নেয়া হবে। সেক্ষেত্রে চরাঞ্চল, হাওর, বাঁওড় ও পাহাড়ি এলাকার বিষয়টি মাথায় রাখা হবে। মৌসুম যেমন বর্ষাকাল, শীতকাল, গ্রীষ্মকাল বিবেচনায় নেয়া হবে। এলাকার সঙ্গে পরিবেশ-পরিস্থিতি আমলে নিয়ে খাবারের ধরন, স্বাদ ও রুচি বিবেচনায় নিয়ে খাদ্য প্রস্তুত করা হবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সময়ে সময়ে এ নীতিমালা পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন করবে। অর্থ, কৃষি, পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার, খাদ্য, শিল্প, বাণিজ্য, মহিলা ও শিশু, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো জাতীয় স্কুলভিত্তিক খাদ্য সহায়তা নীতিমালা-২০১৭ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের কর্মকর্তারা এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন। উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন ব্যবসায়ী, পেশাজীবী সংগঠনসহ অন্যান্য অংশীজন কর্মসূচি গ্রহণ থেকে নিয়ে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সব স্তরে সম্পৃক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার হবে। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা জীবন এবং পুষ্টি বিষয়ে সম্যক ধারণা পাবে। তারা খাদ্যে পুষ্টিমান ও খাবার গ্রহণের বিষয়ে সচেতন হবে। বিভিন্ন রোগের টিকা, ভিটামিন-এ ট্যাবলেট, কৃমিনাশক ওষুধ, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতন হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ পানি পানের বিষয়ে তারা সচেতন হবে। খাদ্য তালিকায় শাকসবজি রাখা এবং তা উৎপাদনে সচেতন হবে।