হুমকির মুখে হবিগঞ্জের ‘সাদা সোনা’

../news_img/56174mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: সাদা সোনাখ্যাত হবিগঞ্জের রাবার শিল্প। কিন্তু এ সাদা সোনার খনি এখন ধ্বংসের পথে। এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে মারাত্মক সংশয়। প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহের কারণে অনেকটা মৃত প্রায় হবিগঞ্জের রাবার শিল্প। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে রাবারের মূল্য কমে যাওয়ায় অনেকটা ধস নেমেছে এ শিল্পে। এতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে বাগানগুলোকে। অন্যদিকে রাবার বাগান থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে রাবার পাচার, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দেয়া, আবাসন ও জনবল সংকটসহ নানাবিধ সমস্যা জর্জরিত সম্ভাবনাময় এ রাবার শিল্প। যারা এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার কথা তারাও অনেকটাই নির্বিকার। দেখার যেন কেউ নেই।

বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন সূত্র জানায়, হবিগঞ্জ জেলায় উৎপাদন উপযোগী রাবার বাগান রয়েছে ২টি। এর মধ্যে বাহুবল উপজেলার রুপাইছড়া রাবার বাগান শুরু হয় ১৯৮১ সালে। মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলা নিয়ে শাহজীবাজার রাবার বাগান শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। এ ছাড়া সাতগাঁও রাবার বাগানে হবিগঞ্জের অংশে রয়েছে ২০০ একর জায়গা। ১৯৭১ সালে এ বাগানটি প্রতিষ্ঠিত হলেও হবিগঞ্জের অংশে তেমন কোনো উৎপাদন হয়নি।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে রাবারের চাহিদা আছে ২৫ হাজার টনের অধিক। আর দেশে উৎপাদন হয় ১৯-২০ হাজার টন। রপ্তানি হচ্ছে ৯ হাজার ৫শ টন রাবার। উৎপাদিত রাবারের ৬০ শতাংশ দেশি উদ্যোক্তারা কিনছেন। শিল্পপণ্য হিসেবে ব্যবহৃত রাবারের জন্য বাজারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ। এতে টানা কয়েক বছর লাভের মুখ না দেখায় ব্যক্তি মালিকানাধীন রাবার বাগানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরজমিনে রুপাইছড়া বাগানে গিয়ে দেখা যায়, রাবার বাগানটিতে উৎপাদনের হার খুবই কম। শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছে নানা অসন্তোষ।

বাগান ঘুরে দেখা যায়, শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় আবাসনের ব্যবস্থা নেই। বাগানে এখন যেসব রাবার গাছ রয়েছে তার অধিকাংশের বয়স ফুরিয়ে গেছে। অন্যদিকে নতুন করে রাবার সৃজনেরও উদ্যোগ নেই সরকারের। বন বিভাগও রাবার বাগানের জন্য জমি দিতে আগ্রহী নয়।

বাগানের কয়েকজন শ্রমিক বলেন, ‘হামাদের পেটে ভাত নেই। নিয়মিত বেতন-ভাতা পাই না। কাম-কাজ করব কেমনে’।

ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ রাবার গাছই মেয়াদোত্তীর্ণ। অল্প কিছু গাছে চলছে রাবারের কষ সংগ্রহের প্রক্রিয়া। এ অবস্থায় হবিগঞ্জের ‘সাদা সোনা’র ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বেসরকারি রাবার বাগানের মালিকরা। রুপাইছড়া বাগান সূত্র জানায়, ১৯৬৩ একর বিশাল জায়গা নিয়ে বাগানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ’৮৫ সালের শেষের দিকে বাগানের উৎপাদন শুরু হয়। গত বছরে বাগানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪শ টন। এর মধ্যে উৎপাদন হয়েছে ৩শ’ ৭ টন। যা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। বাগানে নিয়মিত ও অনিয়মিতসহ প্রায় ৪৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন।

শাহজিবাজার রাবার বাগানটিতে ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে উৎপাদন শুরু হয়। ২ হাজার ১শ’ ৪ একর বিশাল আয়তনের এ বাগান। বাগানে ৬ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন প্রায় ৪৫০ জন। বাগানটিতে ২ লাখ ৫৫ হাজার রাবারগাছ আছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার গাছের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে ৭ থেকে ৮ বছর আগে। বর্তমানে বাগানটিতে ১ লাখ ৮ হাজার গাছ থেকে রাবার উৎপাদন হচ্ছে। গত বছরেই মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রাবার শ্রমিক জানান, রাবার বাগানগুলোতে লোকসানের অন্যতম কারণ চোরাইপথে রাবার পাচার। বাগানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লাখ লাখ টাকা মাসোহারা দিয়ে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ৪টি সরকারি বাগানসহ বিভিন্ন বাগান থেকে চোরাই পথে পাচার হচ্ছে কোটি টাকার কাঁচা রাবার। শ্রীমঙ্গল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল পর্যন্ত ১৪টি স্পটে নিয়মিত কাঁচা রাবার পাচার করছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। হবিগঞ্জেই বিগত ৬ মাসে পাচারকালে আটক হয়েছে পৌনে ১ কোটি টাকার কাঁচা রাবার। এখানকার রাবারের গুণগত মান শীর্ষে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বেশি।

রুপাইছড়া বাগান ব্যবস্থাপক মো. মুফিজুল হক খান বলেন, বাগানের শুরুতে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১ লাখ ৮২ হাজার গাছের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগেই। এখন এ বাগানে মাত্র ১৩ হাজার গাছ থেকে রাবার উৎপাদন হচ্ছে। ধীরে ধীরে বাকি গাছগুলোও উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে। নতুন গাছ সৃজন করা না হলে এ বাগানে উৎপাদন একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে।

রাবার পাচারের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের কিছু অনিয়মিত শ্রমিক রাবার পাচারের সাথে জড়িত থাকতে পারে। যারা পাচারের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

শাহজিবাজার রাবার বাগানের ব্যবস্থাপক শ্যামল কান্তি দেব জানান, বাগানের অধিকাংশ গাছ মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব গাছ থেকে উৎপাদন হচ্ছে নামমাত্র। এতে প্রতিবছর লোকসান দিতে হচ্ছে। সরকার নতুন গাছ দিয়ে বাগান সৃজন না করলে এর অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না। বাগানে কোনো অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছে না বলেও তিনি জানান।

রাবার শ্রমিক মন্টু মালাকার জানান, ১০-১২ বছর ধরে বাগানে অনিশ্চয়তা নিয়ে কাজ করছি। সব মাসে বেতন পাই না। কবে চাকরি নিয়মিত হবে তাও জানি না।