বিমান থেকে ছিটকে পড়ার পর যেভাবে বেচে গেলো এক কিশোরী!

../news_img/56562mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক:: সড়ক দুর্ঘটনার মতো না হলেও বিমান দুর্ঘটনা প্রায় নিয়মিতই ঘটেছে। একটি বিমান দুর্ঘটনার শিকার হলে আরোহীদের সবাই নিহত হয়। এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যেও অলৌকিকভাবে কেউ কেউ প্রাণে বেঁচে যায়। ভাগ্যবান তারা সবাই বলবেন এ কথা। কিন্তু আসলেই কি তাই? বিদেশী সাময়িকী অবলম্বনে লিখেছেন ঐশী পূর্ণতা

২০০৯ সালের ৩০ জুন। ফ্রান্সের স্কুলছাত্রী বাহিয়া বাকারি (১২) ও তার মা আজিজা আবুদুউ (৩৩) যাচ্ছিল আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে অবস্থিত কামারোস দ্বীপপুঞ্জে। উদ্দেশ্য : গ্রীষ্মের ক’টা দিন আত্মীয়স্বজনের সাথে কাটানো। তারা যাচ্ছিল এ৩১০ এয়ারবাসে করে। ভালোই চলছিল বিমানটি।

কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে যেই মাত্র আলতো করে মাটি স্পর্শ করল, অমনি ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন এক ঝড়ো বাতাস বিমানটিকে দিলো ধাক্কা। তাতেই ১৪২ যাত্রী ও ১১ জন ক্রু নিয়ে বিমানটি পড়ে গেল ভারত মহাসাগরে।

কিন্তু কিভাবে যেন কিশোরী বাহিয়া বিমানের বাইরে ছিটকে পড়ে। তার গায়ে কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই। সাথে নেই কোনো খাদ্য। নেই এমনকি এক ফোঁটা খাওয়ার পানিও। মেয়েটি হাতের কাছে পেয়েছিল বিমানের এক টুকরো ধ্বংসাবশেষ। তা-ই ধরে সে ভেসে রইল অকূল দরিয়ার মাঝে।

এভাবে ৯ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর একটি উদ্ধারকারী নৌকার চোখে পড়ে বেঁচে যায় সে। তাকে ভর্তি করা হয় ফ্রান্সের একটি হাসপাতালে।

বাহিয়া নামে এই কিশোরীই ছিল ওই বিমান দুর্ঘটনার একমাত্র জীবিত মানুষ। কী বলা যায় তার প্রাণে বেঁচে যাওয়াকে অলৌকিক, কাকতালীয় নাকি সৌভাগ্য? কাই ডিকেন্স (৩৬) বলেন, যেটাই হোক, এ রকম ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষদের মন অবিশ্বাস্য রকম চাপে ভারাক্রান্ত থাকে।

তা যে থাকে, সেটা ডিকেন্সের চেয়ে কে-ই বা ভালো বলতে পারবেন? কারণ তরুণবেলায় এক গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন ডিকেন্স নিজেও। সেই দিন তিনি নিজে বেঁচে গেলেও হারিয়েছিলেন বন্ধু ক’জনকে। সেই অভিজ্ঞতা ও বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আরো ক’জন মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিকেন্স ২০১৩ সালে নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র সৌল সারভাইভর। এতে বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া বিরল ভাগ্যবান তিনজন তাদের পূর্বাপর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। নিচে তা-ই তুলে ধরা হলো।

জর্জ ল্যামসন জুনিয়র
১৯৮৫ সালের ২১ জানুয়ারি গ্যালাক্সি এয়ারলাইনের ফ্লাইট ২০৩ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেনো থেকে মিডিয়াপোলিস যাচ্ছিল। বিমানটিতে যাত্রী ছিল ৬৪ জন, ক্রু ছয়জন। জর্জ ল্যামসন ছাড়া বাকি সবাই সেদিন প্রাণ হারান। বেঁচে থাকেন শুধু জর্জ। তার জবানীতে সেদিনের অভিজ্ঞতা :

সেদিন আমার সাথে ছিলেন আমার বাবাও। আমরা দু’জন বিমানের সিটে বসলাম। বসেই আমি চেষ্টা করলাম সিটে হেলান দিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিতে। একটু পরই দু’জন লোক এসে আমাদের বলল, ‘এই যে, তোমরা তো আমাদের সিটে বসে গেছ।’ লোক-দুটোর কথা আসলে ঠিক ছিল না। কিন্তু বাবা আপত্তি করলেন না। ‘ও আচ্ছা’ বলেই তিনি আমাকে নিয়ে আরেক সিটে গিয়ে বসলেন। আমাদের নতুন আসন একেবারে সামনের সারিতে।

বিমান উড়াল দিলো। মনে হলো, সব ঠিক আছে। হঠাৎ আমরা একটি বড় ঝাঁকুনি খেলাম এবং এরপরই বিমানটি ডান দিকে কাত হয়ে যেতে থাকল। এটাকেও তেমন বিপজ্জনক কিছু বলে ভাবিনি আমরা। কিন্তু আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম, আমরা বেশ দ্রুত নিচের দিকে নেমে যাচ্ছি।

এ সময় লাউডস্পিকারে পাইলটের গলা ভেসে এলো। তিনিও জানালেন একই কথা যে, আমরা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছি। তার কথা শেষ হওয়ার পাঁচ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই আমাদের বিমান সজোরে ভূমিতে আঘাত হানল মাটি স্পর্শ করেই আবার লাফিয়ে উঠল। এভাবে একবার, দু’বার, তিনবার। তৃতীয়বার বিমানটি গিয়ে প্রচণ্ড বেগে আঘাত করল কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রমোদযানকে। বিমানের গতি ছিল তখন ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার। রেনো শহরের উপকণ্ঠে একটি রাস্তায় গিয়ে থামে বিমানটি। কিন্তু তখন সেটি কয়েক টুকরো হয়ে গেছে।

বিমানটি থামতেই কিংবা তারও আগে এর ধ্বংসাবশেষে আগুন ধরে যায়। আগুন থেকে বেরিয়ে আসার আগমুহূর্তে আমি একবার চার দিকে তাকালাম কেউ বেঁচে আছে কি না দেখার জন্য। এ সময়কার একটা দৃশ্য আমি কখনো ভুলব না। যে লোকটি আমার সিটে বসেছিল তাকে দেখলাম মাটিতে শুয়ে আছে। তার পাশেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চোখ দু’টি খোলা। আমি তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেলাম। কিন্তু কাছে গিয়ে বুঝলাম, লোকটি আর বেঁচে নেই। আমি যদি সিট না বদলাতাম, তাহলে এই পরিণতি (মৃত্যু) আমারই হতো।

অ্যাম্বুলেন্স এসে আমি এবং তখনো বেঁচে থাকা আরো একজনকে তুলে নিলো। তার সারা শরীর পুড়ে গিয়েছিল। চামড়া হয়ে গিয়েছিল কয়লার মতো কালো। আমি তাকে বলেছিলাম, ‘আমি কাউকে জীবিত দেখতে পাব, ভাবতেও পারিনি। অথচ দেখো, আমরা বেঁচে আছি এবং কথা বলছি।’ তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘কেউ নেই’। হাসপাতালে আমাদের চিকিৎসা চলল। আমার মনে পড়ে, আগুনে পোড়ার যন্ত্রণায় তিনি প্রচণ্ড চিৎকার করতেন। কয়েক দিন পর তার মৃত্যু হয়।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে শুরু হয় আরেক যন্ত্রণা। সেদিন কী ঘটেছিল, কিভাবে আমি বেঁচে গেলাম এবং অন্য সবাই মারা গেল, তার বর্ণনা দিতে দিতে আমার জান কাবার। দেখতে এসে প্রথমেই তারা এমনভাবে তাকায় যেন বেঁচে যাওয়া মানুষটি ‘একটা কিছু’। তারপর হয়তো বলবে, ‘আরে, তুমি তো অবাক কাণ্ড দেখালে। এরকম দুর্ঘটনার মধ্যেও বেঁচে রইলে!’ কিংবা এরকমই আরেকটি কথা। এ যে কী যন্ত্রণা, ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।

একটু সুস্থ হয়ে আমি ফিরে গেলাম স্কুলে। স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হলাম। স্বপ্ন দেখতাম, এখান থেকে একটা ডিগ্রি নিয়ে বিমানবাহিনীতে যোগ দেবো, পাইলট হবো। অল্প কিছু দিন যেতে না যেতেই স্বপ্নভঙ্গ হলো। কারণ আমার বাবা বেঁচে নেই। আমার মা ও বোন অতিকষ্টে সংসারটাকে টেনে নিয়ে চলছেন। প্রথম সেমিস্টার শেষে কলেজ যখন ছুটি হলো, তখন টুকটাক কিছু করে কিছু উপার্জন করলাম। কিন্তু ও দিয়ে আর কী হয়! একপর্যায়ে আমি কলেজ ছেড়ে দিলাম। পরে ফিরে গেলাম আমাদের শহর রেনোতে। সেখানে এখন আমি একটি ক্যাসিনোতে কাজ করি।

২০১০ সালে আমি মিনেসোটা যাই আমাদের ফ্লাইটে নিহত তিন যাত্রীর পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করতে। তাদের সাথে সাক্ষাতের কথা ভাবতেই আমার শরীর শিউরে উঠছিল। ওই পরিবারে এখন বেঁচে আছে একটি মেয়ে সারাহ। বিমান দুর্ঘটনায় সে তার মা, বাবা ও দাদা-দাদীকে হারিয়েছে। তখন তার বয়স ছিল ছয় বছর।

আমি ঘরে ঢুকেই তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করি। আমাদের মধ্যে টুকটাক দু-একটি কথা হয়। এরপর আমরা কিচেন টেবিলে বসলে সারাহ একটি ছবি এনে আমার হাতে দেয়; তার মা ও বাবার ছবি। মুহূর্তেই আমার চার পাশটা যেন বদলে যায়। আমার মনে হতে থাকে, ওই বাড়ির কেউ মরেনি। ওরা সবাই বাড়িতেই আছে। ওরা সারাহর ঠিক পাশটিতে দাঁড়িয়ে আছে এবং মৃদু হাসছে।

আমি তাকে দেখতে যাওয়ায় সারাহ খুব খুশি হয়েছিল, আমিও খুশি তাকে দেখে। আমি একটি ছবিতে ছয় বছর বয়সী সারাহকে দেখছিলাম, আর আমার সামনে ৩০ বছর বয়সী সারাহ। আমার মনে হতে থাকল, আমি বুঝি এ পরিবারেরই একজন। আমার চোখে পানি চলে এলো। স্বস্তি ও ভালোবাসার এ এক নিখাদ ও আশ্চর্যজনক অনুভূতি।

অ্যানেটে হার্ফকেনস
১৯৯২ সালের ১৪ নভেম্বর ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি থেকে একই দেশের কামরান যাচ্ছিল ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৪৭৪। বিমানের ২৪ জন যাত্রী ও ছয়জন ক্রু দুর্ঘটনায় নিহত হন। বেঁচে যান শুধু অ্যানেটে হার্ফকেনস। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তিনি :

আমাদের যাত্রাটি ছিল ৫৫ মিনিটের। ৪৮ মিনিট পর্যন্ত সব ঠিকঠাক, ৪৯ মিনিটের মাথায় এসে হঠাৎ দেখি, আমরা কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছি। আমার পাশে ছিল আমার প্রেমিক; পাসজে। আমি তাকে বলি, ‘ডোন্ট ওরি! আমরা এয়ার পকেটে পড়েছি।’ একটু পর আবারো একই অবস্থা। এবার যাত্রীরা সমস্বরে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। আমি পাসজের হাত ধরলাম এটুকুই মনে আছে।

পরে আমি জানতে পারি, আমাদের বিমানটি ঘণ্টায় ৪৮০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিবেগ নিয়ে এক পাহাড়ের চূড়ায় আঘাত হানে। এতে বিমানের একটি পাখা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বাকি পাখাসমেত বিমানটি পরের পর্বতের পাশে বিধ্বস্ত হয়।

আমার যখন জ্ঞান ফেরে তখনো আমি বিমানের ভেতরে, একটি লাশের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। তাকিয়ে দেখি, পাসজের সিটটি পেছন দিকে হেলানো, সে তাতে শুয়ে। মৃত, কিন্তু ঠোঁটে ফুটে আছে তার মিষ্টি হাসিটি। যেখানে ককপিট ছিল সেখানে বিরাট একটি ফুটো। তা দিয়ে আমি দেখতে পেলাম চার পাশে সবুজ জঙ্গল। আমার সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত। আমার জঙ্ঘা থেকে বেরিয়ে আছে ১০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা একটি নীলাভ হাড়। আমি যেই নড়াচড়া করতে গেলাম, অমনি পশ্চাৎদেশে অনুভব করলাম ভয়াবহ যন্ত্রণা।

অতিকষ্টে এক সময় আমি বিমান থেকে বেরুতে পারলাম। আমার চার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে লাশের পর লাশ। যারা তখনো বেঁচে আছে তাদের কাতরধ্বনি শোনা যাচ্ছে। একজন অতিশয় দয়ালু মানুষ আমাকে আশ্বাস দিলেন শিগগিরই উদ্ধারকারীদের কেউ চলে আসবে বলে।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন ভিআইপি। আমার খোঁজেই ওরা আসবে।’ কিন্তু কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও কেউ এলো না, বরং দয়ালু মানুষটির শ্বাস-প্রশ্বাসই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এলো। একপর্যায়ে তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল এবং তিনি চলে গেলেন। এরপর চার পাশে আর একটি প্রাণের সাড়াও শোনা গেল না। এমন ভয়াল নৈঃসঙ্গ আমি আর কখনো দেখিনি।

এভাবে একে একে আটটি দিন আমি বনের মাটিতে শুয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। আমার দু’হাত ঢেকে ফেলেছে জোঁকের দল। দুই পা ফুলে ডোল। পায়ের আঙুলগুলো কালো হয়ে গেছে। খাওয়ার মতো এক ফোঁটা পানিও নেই। তবে মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হয়।

তখন আমার পরনের টি-শার্টটি ভিজে গেলে সেটি চিপে যেটুকু পানি মেলে, সেটাই পেটে যায়। এ দিকে আমার পাশের লাশটি পচতে শুরু করেছে, দুর্গন্ধে টেকা দায়। কনুইয়ে ভর দিয়ে অনেক কষ্টে সেখান থেকে খানিকটা দূরে গেলাম।

অষ্টম দিনের মাথায় দুর্ঘটনাস্থলে এলো একদল ভিয়েতনামি। তারা আমাকে ক্যানভাসের একটি খাটিয়ায় তুলে নিলো, তারপর নিচের দিকে নামতে শুরু করল। সে এক কষ্টকর যাত্রা। পথ এত দীর্ঘ যে, আমাদের আরো এক রাত জঙ্গলে ক্যাম্প করে কাটাতে হলো।

অবশেষে আমরা একটি গ্রামে পৌঁছলাম, সেখান থেকে গাড়িতে করে হো চি মিন সিটির এক হাসপাতালে। তারও পর দিন বিমানে করে আমাকে নেয়া হলো সিঙ্গাপুরের এক হাসপাতালে। এরপর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো আমার নিজ দেশ হল্যান্ডে। সেখানে ডাক্তাররা আমার বিভিন্ন ক্ষতস্থানে স্কিন গ্রাফটিং করলেন। আমার চোয়ালে চারটি পিন ঢুকে সীমাহীন যন্ত্রণা দিচ্ছিল, সেগুলো দেখলেন।

আড়াই মাস পর আমি অবশেষে আমার চাকরিতে ফিরে গেলাম। ফিরলাম আমার বাসস্থান মাদ্রিদে। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলেই ভীষণ একাকিত্ব আমাকে পেয়ে বসে। আমি দেখি, আমার প্রিয়তম পাসজে, আমার সুহৃদ, আমার চোখের মণি পাসজে নেই! রাজ্যের তিক্ততা এসে ঢুকে যায় আমার মগজে; দিনের পর দিন। আমার কেবলই রাগ হতে থাকে জীবনের প্রতি রাগ, মৃত্যুর প্রতি রাগ এবং সব অপূর্ণ প্রত্যাশার প্রতি রাগ।

২০০৬ সালে আমি ভিয়েতনাম যাই। যাই সেই গ্রামটিতে, দুর্ঘটনার পর যেখানে আমাকে আনা হয়েছিল। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আমাকে যারা ঘটনাস্থল থেকে ওই গ্রাম পর্যন্ত বয়ে এনেছিলেন, তাদের অনেকের সাথে আমার দেখা হয়। পরদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগে আমরা বিছানা ছাড়ি এবং হাঁটতে শুরু করি। ছয়টি ছোট-বড় নদী পার হয়ে আমরা পর্বত আরোহণ শুরু করলাম। পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় পর আমরা পৌঁছলাম সেই জায়গাটিতে, যেখানে আমাদের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল।

সেখানে পৌঁছেই আমি ঘাসলতাপাতার ওপর বসে পড়লাম। মনে মনে খুঁজলাম আমার প্রাণপ্রতিম পাসজেকে। হায়, পাসজে কোথাও নেই। আমি আরো একটু হেঁটে একটি পাথরের ওপর গিয়ে বসলাম। ব্যাকপ্যাক থেকে বের করলাম কাঠের তৈরি একটি ছোট ডলফিন ও একটি সাদা সিল মাছ। পাথরটির ওপর সেগুলো রেখে দিলাম আর মনে মনে বললাম, ‘বিদায়, পাসজে!’

 
জিম পোলেহিনক
জিম পোলেহিনক ছিলেন কমএয়ার বিমান সংস্থার কো-পাইলট। ২০০৬ সালের ২৭ আগস্ট ৫০ জন যাত্রী নিয়ে তাদের বিমানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি অঙ্গরাজ্যের লেক্সিংটন থেকে আটলান্টা যাচ্ছিল। উড্ডয়নের পরপরই পাইলটের ভুলে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। সব আরোহী নিহত হন, বেঁচে যান শুধু জিম পোলেহিনক। তার জবানীতে সেই স্মৃতি :

পাইলট যখন টার্মিনাল থেকে রানওয়েতে নিয়ে যাচ্ছিলেন বিমানটিকে, আমি তখন ইকুইপমেন্ট সেটিংসের প্রি-ফ্লাইট চেকলিস্ট দেখায় ব্যস্ত ছিলাম। ফলে জানালা দিয়ে রানওয়ে নাম্বারটি দেখার কথা মনে আসেনি। অথচ এ কাজটি আমি প্রায় সবসময়ই করে থাকি।

অথবা হতে পারে যে, আমি তাকিয়েছিলাম কিন্তু লক্ষ্য করিনি যে, আমরা যে রানওয়েতে যাওয়ার কথা ট্যাক্সিওয়ের দু’পাশের মার্কারগুলো তার সাথে মিলছে না। এই লক্ষ্য না করাটা এ কারণে হতে পারে যে, বিমানবন্দরের অনেকগুলো লাইটই ছিল নষ্ট।

আমরা ওড়ার অনুমতির অপেক্ষায় ছিলাম। একপর্যায়ে ক্যাপ্টেন বললেন, ‘এবার যেতে পারি।’ বিমান চলতে শুরু করল। তিনি একটি বাঁক নিয়ে ফের সোজা চালাতে শুরু করলেন। আমাকে বললেন, ‘ইওর ব্রেক, ইওর কন্ট্রোল’। আমি বললাম, ‘মাই ব্রেক, মাই কন্ট্রোল’।

এর পর কী ঘটেছিল, মনে পড়ে না (আপনি চাইলে ককপিট ভয়েস রেকর্ডারে আমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবেন, ‘ওখানে অন্ধকার, আলো নেই)। এর একটু পরই আমাদের বিমানটি একটি বেড়িবাঁধে আঘাত করে, তারপর লাফিয়ে ওঠে, তারপর বিমানবন্দরের বেড়া ও কয়েকটি গাছের সাথে ধাক্কা খায় এবং কয়েক টুকরো হয়ে যায়।

দ্রুত উদ্ধারকারী দল আসে। তারা ধ্বংসস্তূপের ভেতর আমার কাশির শব্দ শুনে সেখান থেকে আমাকে বের করে আনে এবং অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেদের গাড়িতে করেই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

হাসপাতালে আমি চার দিন অচেতন অবস্থায় (কোমা) থাকি। আমার শরীরটা হয়ে গিয়েছিল যেন একটি ভাঙাচোরা পুতুল। হাত-পা ভেঙে যাওয়া ছাড়াও ডান ফুসফুসটি অচল হয়ে গিয়েছিল আর হয়েছিল ব্রেন ইনজুরি।

চার দিনের মাথায় ডাক্তাররা আমাকে কোমা থেকে বের করে আনতে সক্ষম হন। তারা অপেক্ষা করতে থাকেন আমার হুঁশ ফেরার জন্য। এ সময় আমার স্ত্রীও সেখানে ছিল। আমি ভাবতে থাকি, আচ্ছা, আমি তাহলে হাসপাতালে! কিন্তু কী হয়েছিল? পরে আমার স্ত্রী আমাকে বিমান দুর্ঘটনার কথা জানায়। আমি জানতে চাই, ‘অন্য সবাই ভালো আছে তো?’ সে বলে, ‘না, শুধু তুমিই বেঁচে আছ।’ শুনে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি।

প্রথম সপ্তাহে ডাক্তাররা আমার বাম পা-টি বাঁচানোর চেষ্টা করেন। অবশেষে এক দিন একজন ডাক্তার এসে আমাকে বলেন, ‘দেখো, আমাদের সামনে দু’টি কাজ। এর একটিকে বেছে নিতে হবে। আমরা এই পা-টি রেখে দিতে পারি। কিন্তু পরে এর সংক্রমণজনিত কারণে তুমি মারাও যেতে পারো। বিকল্প হচ্ছে, এই পা কেটে বাদ দেয়া।’

তা-ই হলো। ডাক্তাররা আমার বাম পা-টি কেটে বাদ দিলেন। এর পর আমি দ্রুত সেরে উঠতে থাকলাম।
এই ঘটনার পরের ক’টি বছর আমি মানসিকভাবে খুব ভঙ্গুর অবস্থায় ছিলাম। সব দোষ পাইলট ও আমার ওপর চাপানো হচ্ছে জানলে আমার খুব রাগ হতো।

 নিহত আরোহীদের স্বজনদের কথা ভেবেও খুব কষ্ট পেতাম আমি। আমি নিজেকে বলতাম, বেঁচে আছি বলে আমার কি খুব খুশি হওয়া উচিত?

এই কঠিন দিনগুলোতে আমার পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছিল আইডা; আমার স্ত্রী। আমি তার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ। সে আমাকে ভরসা দিয়েছে, যত্ন নিয়েছে। এমন স্ত্রী পেয়ে আমি সত্যিই ভাগ্যবান।

এখন আমি একজন পঙ্গু মানুষ। আমি স্কি খেলতে ভালোবাসতাম। এখনো আমি হুইল চেয়ারে চড়ে স্কি দেখতে যাই। কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে নিচের দিকে তাকাই আর মনে মনে বলি, ‘প্রভু, তোমায় ধন্যবাদ। তুমি আমায় বাঁচিয়েছ। আমার কোনো অভিযোগ নেই।’