প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সিলেটের আখলাকুর ‘নাইটহুড’ উপাধি পেলেন

../news_img/56814 mmm.jpeg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সাফল্যের খবর প্রায়ই শোনা যায়। তাদের বিজয় গর্বিত করে আমাদের। এবার এই সাফল্যের মিছিলে যোগ হলো আরেকটি নাম। তিনি ব্যারিস্টার আখলাকুর রহমান চৌধুরী। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের রাণীর দেওয়া অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি ‘নাইটহুড’ পেয়েছেন তিনি।

হাই কোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগের অংশ হিসেবে এ উপাধি লাভ করেন। ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদ ‘বাকিংহাম প্যালেসে’ রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ আখলাকুর রহমানকে ‘নাইট’ উপাধি প্রদান করেন। এ দিন দেশটির হাই কোর্ট বিভাগে নিয়োগ পাওয়া মোট ১১ জন বিচারককে এ উপাধি দেওয়া হয়। এর আগে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশির মধ্যে আখলাকুর রহমান চৌধুরী প্রথম কোনো ব্যক্তি, যিনি এ উপাধি পেলেন।

পেশায় আইনজীবী এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের হাই কোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। সেই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদশি বংশোদ্ভূত সে দেশের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেলেন। রাণী এলিজাবেথ হাই কোর্টের বিচারপতি হিসেবে আখলাক চৌধুরীর নিয়োগ অনুমোদন করেছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্বপ্নারা খাতুন এর আগে যুক্তরাজ্যের ক্রাউন কোর্ট ও ফ্যামিলি কোর্ট বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেলেও ব্যারিস্টার আখলাকুর রহমানই যুক্তরাজ্যের হাই কোর্টের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিচারক।
 

কিউসি মর্যাদা লাভ: ব্যারিস্টার আখলাকুর চৌধুরী হাই কোর্টের ডেপুটি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি যুক্তরাজ্যের কুইন্স কাউন্সিলর বা কিউসি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন। এর আগে বাংলাদেশের ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি যুক্তরাজ্যে এ স্বীকৃতি পান। ২০১৫ সালে ব্যারিস্টার আখলাক চৌধুরী ব্রিটেনের আইন পেশার সম্মানজনক ‘কিউসি’ নির্বাচিত হন। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ারও এ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা: আখলাকুর রহমান ১৯৬৭ সালের ২৩ এপ্রিল যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তার বেড়ে ওঠা স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। তার জন্মের আগেই ১৯৬৭ সালে তার বাবা প্রয়াত আজিজুর রহমান চৌধুরী যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তার আদি নিবাস ছিল সিলেটের জকিগঞ্জে। আজিজুর রহমান ছিলেন স্কটল্যান্ডের এভারডিনের অন্যতম প্রধান রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। আখলাকুর রহমানের মা সুলতানা চৌধুরী ছিলেন গৃহিণী। প্রয়াত আজিজুর রহমান চৌধুরী ও সুলতানা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করেন।

পদার্থবিজ্ঞান থেকে আইনজীবী: ছোটবেলা থেকেই মেধাবী আখলাকুর রহমান বিশপ্সব্রিগস হাইস্কুল থেকে ভালো রেজাল্ট করে গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮৮ সালে সেখান থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে মন বসেনি আখলাকুর রহমানের। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নেন। এরপর ১৯৯২ সালে ব্যারিস্টারি পাস করে আখলাকুর রহমান লন্ডনে চলে আসেন। পুরোদমে আইন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি দীর্ঘদিন ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস, মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স, এইচএমআরসিসহ যুক্তরাজ্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগে আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ তথ্য কমিশনারের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তথ্য অধিকার এবং তথ্য সংরক্ষণ আইনের অনেক মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

আইন পেশায় উন্নতি: আইন পেশায় যোগদানের পর থেকেই ব্যারিস্টার আখলাকুর রহমান দ্রুত পেশাগত উন্নতি প্রমাণ করেন। তিনি একপর্যায়ে শীর্ষ পাঁচ হাজার ব্রিটিশ আইনজীবীর তালিকায় চলে আসেন। লর্ড আরভিন অব লেয়ার্গ ও লর্ড জাস্টিস ইলিয়াসের সঙ্গে আপিল আদালতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবীর। অ্যাটর্নি জেনারেলের ‘এ’ প্যানেলভুক্ত আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার আখলাকুর রহমান দীর্ঘদিন ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস, মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স, এইচএমআরসি ও সরকারের অন্যান্য বিভাগে আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।

মানুষ তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এমন নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়াও তথ্য কমিশনারের উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি অবদান রাখেন। তিনি তথ্য সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে তিনি টিমোথি জেমস কনসাল্টিং লিমিটেডের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০১৪ সালে রাজ্য সচিবের বিরুদ্ধে করা এক আপিল বিভাগীয় মামলায় প্রতিনিধিত্ব করেন। সাম্প্রতিক কিছু কাজসমূহের মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালের অ্যালান ভার্সেস ওয়ান্ডসর্থ এলবিসি অন্যতম। এ ছাড়াও ন্যায্য বিচারের অধিকার বিষয়ক, আইআরআরএল-এর বোনাস বিষয়ক, পরিবেশগত তথ্য এবং জনস্বার্থ বিষয়ক প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় কাজ করেন।

ইমপ্লয়মেন্ট হ্যান্ডবুক: আইন পেশাজীবীদের জন্য টলিস ইমপ্লয়মেন্ট হ্যান্ডবুক খুবই প্রয়োজনীয় একটি বই। এই বইটিতে ‘এ’ থেকে ‘জেড’ ক্রমিক অনুসারে আইন বিষয়ক নানা তথ্যাদি সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে বইটির ৩১তম সংস্করণ বাজারে রয়েছে। ১৯৯৬ সালে এই বইয়ে সহ-লেখক হিসেবে কাজ করেছেন আখলাকুর রহমান। গভীর জ্ঞান, নেতৃত্বদানে দক্ষতা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে সর্বজন প্রশংসিত আখলাকুর রহমান। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। আর সবাইকে তিনি এই উপদেশই দিয়ে থাকেন। তিনি মনে করেন, একজন ভালো মানের আইনজীবী হতে হলে নিজের কাজ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে, সেই অনুযায়ী উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। আখলাকুর রহমান অন্য সবার কাছে অনুপ্রেরণীয় আদর্শ হতে পারেন, বিশেষ করে যারা আইন পেশার সঙ্গে জড়িত। আশা করা যায় ভবিষ্যতে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তার অর্জিত সাফল্যগাথা বাংলাদেশের মর্যাদা বিশ্বের দরবারে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে। আখলাকুর রহমান বর্তমানে স্ত্রী সাফিনা এবং তিন সন্তান নিয়ে লন্ডনের নর্থউডে বসবাস করছেন।