স্ত্রীর জন্যই জিম্বাবুয়ে প্রেসিডেন্টের এই হাল!

../news_img/57092mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক::জিম্বাবুয়ের নিয়ন্ত্রণ এখন দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে। এদিকে দেশটির ক্ষমতার এই পালাবদলকে স্বাগত জানিয়েছে দেশটির বিরোধী দল। তবে আফ্রিকান ইউনিয়ন বিষয়টি বোধয় ভালো চোখে দেখেনি। সেনাবাহিনী যদিও বলেছে কোনো অভ্যুত্থান হয়নি, কিন্তু এইউ বলেছে সেনারা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে।

এর অবশ্য কারণ হিসেবে প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবের প্রভাব, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাকেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ৯৩ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্টর এভাবে বিদায়ের জন্য তার দ্বিতীয় ও বর্তমান স্ত্রী গ্রেস মুগাবেকে দায়ি করা হচ্ছে।

মুগাবে এক সময় শিক্ষক ছিলেন। এর রাজনীতিতে এসে দীর্ঘ ৩৭ বছর হলেই জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট। ১৯২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রোডেসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত ও বয়স্ক প্রেসিডেন্ট তিনি।

৯৩ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্টের রয়েছে সাতটি ইউনিভার্সিটি ডিগ্রি। ১৯৬৪ সালে রোডিসিয়ার শ্বেতাঙ্গ শাসকদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের পর আলোচনায় আসেন মুগাবে। সে সময় ‘রাষ্ট্রোদ্রোহী বক্তব্য’ দেয়ার কারণে তার ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়।

১৯৭৪ সালে মুক্তির পরপরই রোডেসিয়ার রাজনীতিতে তার ভূকম্পীয় পরিবর্তন ঘটে। উপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে জনপ্রিয় আন্দোলন গড়ে উঠে। স্বাধীনতার জন্য তিনি যুদ্ধে অংশ নেন। এরপর ১৯৮০ সালে দেশ স্বাধীন হলে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তখন থেকেই দেশটির নাম হয় জিম্বাবুয়ে এবং ১৯৮৭ সালে মুগাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।

তারপর থেকেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এক সময়ের মার্কসবাদী মুগাবে। তবে এর মধ্যে কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাচন করেছেন তিনি। বিশেষ করে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মর্গান টিভানাঙ্গিরির কাছে হেরে যান। যা নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় অন্তত দুই শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে।

মুগাবে প্রথমে একটি বিয়ে করলেও সে স্ত্রী কিডনি রোগে মারা যায়। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রেস মুগাবেকে বিয়ে করেন।

সাধারণ সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয় হলেও মুগাবের সমালোচকদের দাবি, তিনি দিন দিন স্বৈরশাসকে পরিণত হয়েছেন। তাছাড়া তার শাসনামলে আফ্রিকার এক সময়ের ধনী দেশ জিম্বাবুয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।

গ্রেস মুগাবে জিম্বাবুয়ের প্রথম ফার্স্ট লেডি। ১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া গ্রেস স্বামীর চেয়ে ৪১ বছরের ছোট। দেশটির ক্ষমতাসীন জানু-পিএফ পার্টিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তার ব্যয়বহুল মার্কেট ও সমাজসেবামূলক কাজের অভ্যাস ছিল। পরে তিনি পার্টির নারী শাখার নেতৃত্ব দেন।

জিম্বাবুয়ের অসংখ্য লোক যখন অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন তখন গ্রেস মুগাবের অতিরঞ্জিত লাইফস্টাইল লোকজনের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দেয়। তাছাড়া সম্প্রতি দেশটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগবাকে পদচ্যুত করেন রবার্ট মুগাবে এবং সেই পদে তার স্ত্রীকে বসান। আর এ ঘটনাই মুগাবের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। দেশটিকে সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে ঠেলে দেয়।

সম্প্রতি জিম্বাবুয়ের একটি পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করেন গ্রেস। দ্য স্টাডার্ড নামের ওই পত্রিকায় উইকিলিকসের ফাঁস করা বার্তা ছাপানো হয়। যাতে বলা হয়, গ্রেস জিম্বাবুয়ের ডায়মন্ড খনি থেকে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া ২০১৪ সালে ভর্তি হওয়ার মাত্র দুই মাস পর গ্রেস মুগাবেকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয় দ্য ইউনিভার্সিটি অব জিম্বাবুয়ে। যা নিয়ে দেশটির শিক্ষক সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে, ১৯৪৬ সালে জন্ম নেয়া এমারসন নানগাগবা জানু-পিএফ পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। তিনিও দেশটির স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেন এবং ১৯৬৫ সালে আটক হন। ১০ বছর পর ছাড়া পাওয়ার পর জাম্বিয়ায় নির্বাসনে যান। সেখানে তিনি লেখাপড়া ও আইন প্রাকটিস করেন। পাশাপাশি দলের জন্যও কাজ করেন।

এরপর ১৯৭৭ সালে তিনি মুগাবের বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান। তখন দলের সামরিক ও বেসামরিক বিষয় দেখাশুনা করেন। স্বাধীনাতার পর তিনি প্রথম দেশটির মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ভাইস-প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ অবদান এবং ক্ষমতাসীন পার্টির প্রভাবশালী হওয়ায় এমারসনকেই মুগাবের উত্তরাধিকার মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু চলতি মাসে তাকে সরকার তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়। তিনি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছেন বলে অভিযোগ আনা হয়। এরপর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে যান।

কিন্তু দেশটির সেনাবাহিনী এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা প্রভাবশালীদের সমর্থন আছে এমারসনের প্রতি। এমারসন ইস্যুতে সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল সেনাবাহিনী। সেনাপ্রধান চিয়েঙ্গা বলেন, সরকার না পারলে সেনাবাহিনী এই ইস্যুর মীমাংসা করতে প্রস্তুত। কিন্তু তার বক্তেব্যে সাড়া দেয়নি সরকার।

উল্টো ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে তার বক্তব্যকে রাষ্ট্রোহিতার শামিল বলে মন্তব্য করা হয়। এরপর মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) দিবাগত রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জেবিসি ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। সেইসঙ্গে সরকারি ভবনে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়।

অবশ্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি কোনো অভ্যুত্থান নয়। বরং প্রেসিডেন্টের আশপাশে থাকা ‘অধরাধী’দের শায়েস্তা করতে এই অভিযান। পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হয়, মুগাবেকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। এর পরই গ্রেস দেশ থেকে পালিয়ে যায় বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর আসে। প্রেসিডেন্ট মুগাবের ওপর গ্রেসের ব্যাপক প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হয়।