কার অধীনে কীভাবে ভোট?

../news_img/57111mmm.jpg

মাহমুদ আজহার ও গোলাম রাব্বানী  : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার অধীনে কীভাবে হবে তা-ই এখন আলোচনা হচ্ছে সারা দেশে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করে ভোটের প্রস্তুতিতে সরকার।

অন্যদিকে বিএনপি বলছে, দলীয় সরকার তথা শেখ হাসিনার অধীনে ভোটে যাবে না তারা। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি রাখছে বর্তমান সীমানাতেই ভোট করার। পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে কোনোভাবেই ইভিএমে যাবে না তারা।

আর সেনা মোতায়েন নিয়ে খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন নির্বাচন কমিশনার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রাখছেন। সার্বিক অবস্থা মিলিয়ে ভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় কাটেনি ভোটারদের মধ্যে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। ভোটারদের কাছে তাদের স্বচ্ছ ধারণা দিতে হবে।

তারা কীভাবে ভোট করবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে তা নিয়ে এখনই কথা না বলে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে সাধারণ ভোটাররা তাদের ভোট প্রয়োগ করতে পারেন নির্বিঘ্নে, তাদের আস্থা ফিরে আসে নির্বাচন কমিশনের ওপর, যাতে ভরসা করতে পারে সব রাজনৈতিক দল। সব দল নিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়াই ইসির বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন নির্বাচন কমিশনার ভিন্ন কথা বলছেন। সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে ইসি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।’

আর নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা হবে। কোন প্রক্রিয়ায় সেনা মোতায়েন করা হবে, এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ গতকাল বলেন, ‘নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে এখনো তাদের (ইসি) কথা বলার সময় হয়নি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মাঠ কর্মকর্তাদের রিপোর্ট এবং অন্যান্য রিপোর্ট পর্যালোচনা করে সে অনুযায়ী ইসিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে যা যা করা দরকার তা-ই তাদের করতে হবে। এর আগে সব সময় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করেছে ইসি।’

সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অবস্থান স্বচ্ছ হতে হবে ভোটারদের কাছে। তারা কীভাবে ভোট করবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, তা নিয়ে এখনই কথা না বলে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে সাধারণ ভোটাররা তাদের ভোট প্রয়োগ করতে পারেন নির্বিঘ্নে।’

নির্বাচন কমিশনের সংলাপে গিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১১ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চালুর পক্ষে মত দিয়েছে দলটি। সেনা মোতায়েন ও সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিরোধিতা করে তারা। ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর ওপর আস্থা রাখতে চায় দলটি।

তবে প্রচলিত আইনে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি ইসির সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তার প্রস্তাব হলো, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং ইসি নির্ধারিত ভোটের পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ন্যস্ত থাকবে।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা নিয়ে জটিলতার আশঙ্কাও করছে ক্ষমতাসীন দলটি। তাই বর্তমান সীমানায় ভোটের পক্ষে তারা। তবে সীমানায় ছোটখাটো পরিবর্তনের বিষয়টি ইসির ওপর ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে নামানোর বিরোধিতা করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

তিনি বলেন,  ‘সেনাবাহিনীকে কেন বিচারিক ক্ষমতা দিতে হবে? তারা ভোটের সময় সিভিলদের সহায়তা করবে। ২০০১ সালের নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েন করা হয়েছিল। এতে বিএনপি লাভবান হয়েছিল।’

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না—বিএনপি চেয়ারপারসনের এমন বক্তব্যকে অপ্রত্যাশিত বলেও মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের এই বর্ষীয়ান নেতা। মৌলিক বিষয়ে বিপরীত অবস্থানে বিএনপি।

দলটি জানিয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে ভোটে যাবে না বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে জনমত তৈরি করার চেষ্টা করছে দলটি। সহায়ক বা তত্ত্বাবধায়ক যে নামেই ডাকা হোক—ভোট হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এ নিয়ে সরকারবিরোধী অন্য দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বিএনপি।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যারা বর্জন করেছিল, তাদের সঙ্গে এ ইস্যুতে ঐকমত্য হয়ে যুগপৎ আন্দোলনে যেতেও রাজি বিএনপি। যদিও বিএনপির শরিক দলগুলো নিয়ে আপত্তি ওই সব দলের। সম্প্রতি রাজধানীর সোহওরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া স্পষ্টই বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। শেখ হাসিনার অধীনে তো যাবেই না।

একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী নামানোর কথাও তিনি বলেছেন। ইভিএমে ভোটে না যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। বুধবার রাতেও ২০-দলীয় জোট নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেগম জিয়া একই বক্তব্য দেন। এতে জোট নেতারাও একমত হন। এ সময় জোট নেতাদের তিনি নির্বাচনের পাশাপাশি আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ারও নির্দেশনা দেন।

কোনো কারণে বিএনপি জোটের নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মানা না হলে তাত্ক্ষণিক রাজপথে থেকেই আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের আভাসও দেন বিএনপিপ্রধান। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সরকার সংলাপের আয়োজন করলে বিএনপি তাতে সাড়া দেবে।

সেখানে সরকার কিছুটা ছাড় দিলে বিএনপিও ছাড় দেবে। কিন্তু সংলাপ-সমঝোতা ছাড়া কোনোভাবেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না দলটি। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, দলীয় সরকারের অধীনে ভোট নয়। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি।’

হচ্ছে না ইভিএম : পর্যাপ্ত সময় না থাকায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করবে না নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রস্তুত নয়।

বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। সিইসি বলেন, ‘আমরা কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের জন্য ইভিএম নিয়ে প্রস্তুত নই। এটা আমরা স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালাব। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম প্রয়োগ করার জন্য আমরা একেবারেই প্রস্তুত নই। ’

বর্তমান সীমানায় ভোট : একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে দুই দলের বিপরীতমুখী সুপারিশ পেলেও আওয়ামী লীগের প্রস্তাবে সায় দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। আর বিএনপির প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দশম সংসদের আসনে একাদশ সংসদ নির্বাচন করতে একটি নীতিমালা প্রস্তুত করছে ইসি সচিবালয়।

ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত নতুন আইন অনুমোদন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গেলে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান অনিশ্চয়তায় পড়ার আশঙ্কা আছে। তাই জটিলতার বিষয়গুলো তুলে ধরে দশম সংসদীয় আসনের জেলাভিত্তিক আসন বহাল রেখে একটি নীতিমালা মেনেই কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে ২০০৮ সালের আগের সীমানায় ভোট করার বিষয়ে বিএনপির দাবি নাকচ হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন আদমশুমারি প্রতিবেদন ছাড়া সংসদীয় আসনে সীমানা নির্ধারণে আইনগত জটিলতা নিয়ে আওয়ামী লীগের শঙ্কার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। -বিডি প্রতিদিন