শিশুর প্রথম মিথ্যা শেখা

../news_img/57255mmm.jpg

 শামীমা খানম::শিশুর প্রথম মিথ্যা শেখার শিক্ষক তার মা-বাবা। নিউমার্কেট কিংবা গাউসিয়া থেকে শাড়ি-গহনা অন্যান্য ড্রেস, শিশুর খেলনা ইত্যাদি কিনে সন্তানের সামনেই বলতে থাকেন আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন,জাপান থেকে মামা, চাচা, খালা, ফুপু অথবা দেবর-ননদ কেউ না কেউ কেবল পাঠাচ্ছেন আর পাঠাচ্ছেন।

কখনো কখনো সন্তানকে শিখিয়েও দেয়া হয়, আমরা যে সাত লাখ টাকায় গাড়িটা কিনেছি; সবাইকে বলতে হবে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা এর দাম। মধ্যবিত্তের অন্য ধরনের মিথ্যা: বাসায় বসে থেকেই সন্তানকে বলে পাঠায়, গিয়ে বলো বাসায় নেই। মিথ্যা বাণী শুনে পাওনাদার চলে যায়। গৃহকর্মী শিশু সন্তানকে মিথ্যা সংবাদ পাঠিয়ে বলে,”গিয়া কইবি মায়ের অসুখ, আজ কামে আসতে পারবো না।”

প্লে গ্রুপ থেকেই শুরু হয়ে যায় লেখা-পড়ার নামে চালবাজি, ধান্দাবাজি অর্থাৎ প্রশ্নপত্র ফাঁসের কৌশল। প্লে গ্রুপের ছোট্ট শিশুকে গৃহ শিক্ষক তো দেয়া হয়ই বরং শ্রেণী শিক্ষককেই গৃহ শিক্ষক নিযুক্ত করার চেষ্টা করেন বাবা-মা যেন তার সন্তান শিশু শ্রেণি থেকেই প্রথম হতে পারে। তাই শ্রেণি শিক্ষক গৃহশিক্ষক হিসেবে এসে আগেই পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তরগুলো শিখিয়ে নিতে পারেন। শিশুরা অনায়াসে বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ে মিথ্যাকে আশ্রয় করে বড় হতে থাকে।

একটি বাস্তব উদাহরণ: একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির বিশেষ ক্লাস চলে সন্ধ্যার (রাত ৯টায়) পরও। বাড়তি উপার্জনের জন্য শিক্ষকরা নিষ্ঠার সাথে পাঠদান করেন। সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে। পরীক্ষার আগের রাতে স্কুলের প্রধান শিক্ষক একটি প্রশ্নের শিট শিক্ষিকার হাতে দিয়ে বললেন “ম্যাডাম এইগুলি শিখায়া দেন, দেখবেন বাচ্চারা চোখ বন্ধ করে পরীক্ষা দিয়ে আসবে, একেবারে পানির মতো সহজ লাগবে ওদের কাছে।”

শিক্ষিকা প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে বিদায় নিলেন এই বলেন, “স্যার আজ থেকে ক্লাস নিতে পারব না।” প্রধান শিক্ষক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আর জোরাজুরি করলেন না। ক্লাস ফাইভের বাচ্চারা বুদ্ধিতে পাকা মন্দ না। ওরা বুঝেও না বুঝার ভান করে বললো,”স্যার, ম্যাডাম চলে যাচ্ছে কেন?”স্যার ম্যাডাম চলে যাওয়ার উত্তরটা দিলেন একটা মিথ্যা দিয়ে।

অন্যায় সবসময়ই ন্যায়ের কাছে নত হতে বাধ্য, যদি ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি কঠোর হন। পত্র-পত্রিকা খুলে, টেলিভিশন এবং অন্যান্য মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জানা যাচ্ছে যত রকমের অপরাধ দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচারের খবর। যেন এসব চলছে প্রতিযোগিতার মতো। সেই সাথে চলছে দেশের বুদ্ধিজীবীদের (talk show) আলোচনা-সমালোচনা, পরামর্শ অর্থাৎ অবিচার রোধের বিভিন্ন উপায়ান্তর। কিন্তু ফল যে কে সেই। সাধারণের মাঝে তীব্র নিন্দা আর ক্ষোভের নামে আলোচনার খোরাক।

ভাবতে অবাক লাগে না, ঘৃণা লাগে। কিন্তু ঘৃণাইবা কাকে করবো! সেই পুরনো কথা: “আমি কাকে কি বলবো, সবাই আমার ভাই, সবাই আমার বোন। ”

এই কি সেই দেশ যে দেশেরর সন্তানেরা মাতৃভাষার জন্য রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন? এই কি সেই ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত আর দুই লক্ষ সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা! হ্যাঁ, এই সেই দেশ, যে দেশে আজ কিশোর-কিশোরী নেশার ঘোরে মা-বাবাকে হত্যা করে। পিতা/মাতার হাতেও পুত্র /কন্যা লাশ হচ্ছে। লোকাল বাসে চলতে গিয়ে কর্মজীবী নারী নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে।

দেশে আজ তাই সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষিত মা তৈরি করা। শিক্ষিত শিক্ষক তৈরি করা। তবেই আগামী প্রজন্ম সমস্বরে বলতে পারবে, “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সমদহে।”