বালি ভ্রমণ ৩

../news_img/57174 mmm.jpg

তবারক হোসেইন :: আজ ৩১ আগস্ট। আমাদের তৃতীয় দিন বালিতে তবে বালি দেখার আসলে দ্বিতীয় দিন। যখন একসাথে কয়েকজন মিলে কোথাও যান তখন দলের কনিষ্ঠতম ব্যক্তি-টিক চাওয়াটাকে ও মূল্য দিতে হয়। বলছিলাম, আমাদের ছোট নাতনীর কথা। সে প্রথমদিক হোটেলের সাঁতার-জলাধার দেখে সন্ধ্যায় নেমে যেতে চেয়েছিল। তাকে অনেক কষ্টে নিবৃত করা গেল। গতকাল গাড়ীতে ওঠেই তার মনখারাপ, তার সাঁতার কাটা হয়নি। তাই আজ দু নাতনীর সম্মানে সকালে দুঘণ্টা আমরা তাদের সাঁতার কাটার জন্য বরাদ্দ রাখি। ‘যোদ্ধা’কে সেভাবে বলে রাখা হয়।

সকাল সকাল প্রাত:রাশ শেষ করেই দু নাতনী তাদের মা বাবাকে নিয়ে সাঁতার কাটতে সাঁতার-জলাধারে চলে গেলো। আমি একটু পরে তাদের সাথে যোগদিতে গিয়ে দেখি ঊর্মি নেই, সে শাওনের কাছে মেয়েদের রেখে সাগরে নেমেছে। আমি সাঁতার-জলাধারে নেমে কিছুক্ষণ এদের সঙ্গ দিলাম, তারপর আমি ও নেমে গেলাম সমুদ্রে। স্বশুড় বৌমা দুজনে ঢেউয়ের মাঝে কিছুক্ষণ থেকে আহার এলাম হোটেলে সাঁতার- জলাধারে। নাতনীদের সাথে কিছুক্ষণ কাটিয়ে গেলাম কক্ষে। বের হবার জন্য তৈরী হতে হবে। আজ শাওন ঠিক করে রেখেছে একটি ৩-ডি মিউজিয়াম ও একটি মন্দির যাওয়ার কর্মসূচি। সে অনুযায়ী আমরা রওয়ানা হলাম বেলা ১২ টায়। ৩-ডি মিউজিয়াম বেশ কাছেই। আমরা সহজেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। সেটা হোটেলের কাছেই। বাদুং এলাকায়। বেশ বড় মিউজিয়ামটি। পাশেই একটি রেস্টুরেন্ট আছে। এতে সুবিধা হলো। আমরা এখানেই সংক্ষিপ্ত মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নেবো, ঠি ক করে মিউজিয়ামে ঢুকলাম। এখানে বেশ কিছু সময় কাটানো গেলো মজা করে। অনেক ছবি তোলা হলো। মিউজিয়াম কর্মীরা আমাদের ছবি তুলতে সাহায্য করলো। ছবি গুলো তোলার পর এগুলো দেখে অপার আনন্দ পেলাম। এ ছবি গুলো দেখে সকলেই আনন্দ পাবেন আশা করা যায়। কারণ ৩ ডির এফেক্ট। মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে অর্ডার দেয়া হলো খাবারের। রেস্টুরেন্টের কর্মীরা বেশ তৎপরতার সাথে স্বল্প সময়ে খাবারে ব্যবস্থা করলো। আমরা ও খাবার খেয়ে রওনা করলাম। আমাদের এখনকার যাত্রা ‘উলুয়াতু’ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। তবে গাড়ীতে ওঠার পর সিদ্ধান্তে কিছু পরিবর্তন এলো, সেটা হলো রাস্তায় একটি অলংকার গ্যালারী পড়বে সেখানে সংক্ষিপ্ত যাত্রা বিরতি হবে।


বালি ভ্রমণ : তৃতীয় দিন-২য় পর্ব
চালক যোদ্ধা গাড়ী চালায় খুব মুন্সিয়ানার সাথে। তার গাড়ীটাও বেশ আরামদায়ক। আমরা অল্প কিছু সময়ের মধ্যে নিয়ে গেলো সেই জুয়েলারি গ্যালারীতে। এটির নাম ইউ সি সিলভার এন্ড গোল্ড জুয়েলারি। বাটু বুলান এলাকায় অবস্থিত দুধ সাদা রঙের একটি বিশাল দালানে অবস্থিত গ্যালারি। গাড়ীটি গ্যালারীর চোহদ্দায় প্রবেশ করলেই অবাক হতে হয় এর বিশালত্ব দেখে। গ্যালারিটির সামনে বিরাট মাঠের মতো পার্কিং প্লেস। সমস্ত দালানটার চারিদিকে অনেক কারুকার্য খচিত। আর রয়েছে অসংখ্য মূর্তি। দেখলে আর দৃষ্টি ফেরানো যায়না। এটাকেই বোধহয় বলা যায় দৃষ্টিনন্দন। আমাদের গাড়ীটি গ্যালারীর এলাকায় ঢুকার সাথে কালো ইউনিফর্ম পরা এক মহিলা এগিয়ে এলেন। সুন্দরী মহিলাকে কালো পরিচ্ছদে তাকে দেখে সমীহ জাগে। তিনি আমাদের সম্বর্ধনা জানিয়ে গ্যালারীর মধ্যে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাদের জানালেন এটি বেসরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত গ্যালারী। ভেতরের ছবি তোলা নিষিদ্ধ। সেদিন ছিলো খুবই রৌদ্রোজ্জল দিন। আমরা ভর দুপুরে গেছি, তাই কড়া রোদে সূর্যের বিপরীতে ছবি তোলা দূ:সাধ্য, তবু এর মাঝে কয়েকটি ছবি তোলা হয়। ভেতরে ঢুকে আমার চোখ তো কপালে ওঠার যোগাড়। পুরো নীচতলা রুপোর অলংকারে ভর্তি। ৫ টি লাইনে সাজানো টেবিলের ওপর কতো রকমের রুপোর অলংকার, তা দেখেই মুগ্ধ। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে স্বর্ণ আর হীরার অলংকারের অপূর্ব সমাহার দেখে চোখ জুড়ালো।অলংকারের এই সমাহার দেখে নাতনীদের তো বায়না, তাদের জন্য অলংকার কিনতে হবে। অবশেষে তাদের দুজনের জন্য ব্রেসলেট কিনে বের হলাম। এ গ্যালারি দেখা ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা।
এবার যাত্রা ‘উলুয়াতু’ মন্দিরে। গ্যালারীটির কিছু ছবি দেখা যায়।

বালি ভ্রমন: তৃতীয় দিন- শেষ পর্ব

আমরা রওয়ানা দিলাম ‘উলুয়াতু’ মন্দিরের উদ্দেশ্যে। কিছুদূর যাওয়ার পর ড্রাইভার আমাদের গাড়ী নিয়ে এলো একটি রাস্তায় যার নাম মান্দ্রাটোল রোড বা নুসাদুয়া-নুরারাই- বেনোয়া রোড, সমুদ্রের মাঝ দিয়ে নির্মিত ১২.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু- রাস্থা। বালির নিজস্ব প্রকৌশলী দ্বারা নির্মিত। এতে ব্যয় হয়েছে ২২২ কোটি মার্কিন ডলারের মতো, আর কাজ শুরুর দুবছরের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে গেছে। গোটা সেঁতু-রাস্থাটি কিন্তু একটি হাইওয়ের মতো। এটি ও ছিলো আমাদের জন্য বিস্ময়কর একটি তথ্য। যাক এ দীর্ঘ সেতু-রাস্থা পার হয়ে পৌঁছালাম উলুয়াতু মন্দিরে। এখানে এসে পার্কিং পেতে বেশ সময় লাগলো। গাড়ী যেখানে থামলো সেটি বেশ উঁচু টিলার ওপর। এখান থেকে নামতে হয় সিড়ি দিয়ে, তারপর আবার খাড়া সিড়ি দিয়ে উঠে যেতে হয় মন্দিরে। মন্দিরটি সমুদ্রের খাড়া তীরের ওপরই অবস্থিত। গোটা মন্দির প্রাঙ্গনটি বিশাল। প্রচুর গাছগাছালী আর অসংখ্য বাদরের বাস এ মন্দির প্রাঙ্গনে। উলুয়াতু মন্দিরটি অনেক প্রাচীন। বলা হয় এটা স্মরণাতীত কাল থেকে অবস্থিত তবে একাদশ শতাব্দীতে একজন গুরু এটিকে আরো উন্নত করেন যা বর্তমানে বিদ্যমান আছে। মন্দিরটি ভারত সাগরের এক প্রান্তে প্রায় ২০০ ফুট উচ্চতায় পাথর দ্বারা নির্মিত। বালিতে মন্দির গুলো যদিও একজন দেবতার নামে নির্মিত কিন্তু এখানে কোন বিশেষ দেবতা পুঁজিত হননা। বালির হিন্দু ধর্ম আমাদের উপমহাদেশের চাইতে একটু স্বতন্ত্র। মন্দিরে সব দেবতার পাথরের মুর্তি আছে। মন্দিরটির উচ্চতা দেখেই আমি না উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম, কারণ আমার জন্য খাড়া সিড়ি দিয়ে উঠা অনেক সময়ের ব্যাপার যা সবার জন্য বিরক্তিকর হবে। আর গিন্নি ও উঠতে পারতেন না। তাই শ্রেয়া (ছোট নাতনী) ও আমরা দুজন নিচে থেকে গেলাম। দেখলাম অসংখ্য পর্যটকের আনাগোনা। শুনেছিলাম এখানকার বাঁদর গুলো খুব দুষ্টু, তারা দর্শনার্থীদের চশমা ঘড়ি অলংকার কেড়ে নিয়ে যায়। আমাদের সাথে অবশ্য বানর গুলো তেমন কোন ব্যবহার করে নি। শাওন, ঊর্মি ও শামা উপরে ওঠে দেখে নেমে এলো। আমরা সাগরের খাড়া তীরে দাড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখলাম এবং ছবি তুললাম। মন্দির দেখা (শুধু দেখা বলা যায় দেখার মতো দেখা নয়) আমাদের যেতে হবে পাশেই একটা নাচের অনুষ্ঠান দেখার কথা। গাড়ীর চালক টিকিট করে রেখেছে। কিন্তু শাওনদের মন্দির দেখে ফিরতে দেরী হওয়ায়, নাচ দেখতে যেতে দেরী হলো। আমাদের জায়গা হলো নাচের কলাকুশলীদের আসা যাওয়ার পথের পাশে। একটি মাঠের মাঝে অত্যন্ত সাদামাঠা পরিবেশে এ নাচ হয়। স্থানীয়রা এ নাচকে ক্যচাক নৃত্য বলেন, আসলে রামায়নের কাহিনী এখানে অভিনীত হয়। ষ্টেডিয়ামের মতো চারিদিকে বসার আসন দেয়া। মাঝখানে শানবাধানো মাঠের ওপর এ নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। কোন বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই শুধুমাত্র মুখের শব্দ দিয়ে তাল সৃষ্টি করে নাচ পরিবেশন এবং নাচের তালে রামায়নের কাহিনী পরিবেশিত হলো, যা দেখে আমরা মুগ্ধ। নৃত্যানুষ্ঠান শেষে আমরা এবার ফিরবো, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। গাড়ীতে ওঠার পর বুঝলাম আমরা যাবো নতুন জায়গায় নৈশভোজ সারতে। চালকের সাথে কথা বলে শাওন এমনই ঠিক করে রেখেছে।

অত:পর আমরা যানযট ঠেলে পৌঁছালাম কাঙ্খিত স্থানে। এটি ও আরেকটি সমুদ্র সৈকত। জিমবারান বে। এখানে রয়েছে বিস্তৃত বালির সৈকত। আর সৈকত ঘিরে সারি সারি মাছের রেষ্টুরেন্ট। আমাদের নিয়ে আসা হলো একটি রেষ্টুরেন্টে। এখানে অ্যাকুরিয়ামে থাকা মাছ থেকে অর্ডার করলে সে অনুযায়ী রান্না করে সরবরাহ করা হয়। নেমে যখন রেষ্টুরেন্টের মাঝ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো সৈকতে। সমগ্র সৈকত জুড়ে মোমবাতিজ্বালা টেবিলের সারি। এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে খেতেহবে। শাওন গিয়ে বড়ো গলদা চিংড়ি আর অন্য মাছের অর্ডার দিয়ে এলো। এখানে বসার পরই শামা বললো দেখো, বিমান বন্দর দেখা যায়। চেয়ে দেখলাম রাতের আঁধারে বিমানের আলোতে দেখা যায় বিমান ওঠা নামার দৃশ্য। মনে হলো বিমানবন্দরটি বেশ ব্যস্থ। সমুদ্রের তীরে বালির সৈকতে সে রাতের দৃশ্য সত্যিই অতুলনীয়। রান্না শেষে বালির চালের ভাত আর তার সাথে রান্না করা মাছ পরিবেশন করা হলো। সামুদ্রিক মাছের রান্না খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে ডেরার দিকে রওয়ানা ।
আবার আগামী কাল নতুন কোন স্থানে যাবো।