তেলাপোকা ও বারেক সাহেবের আত্ম উপলব্ধি

../news_img/57326 mmm.jpg

ডা. মামুন আল মাহতাব  ::  বিয়ে বাড়িতে নেসকাফের গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবেন বারেক সাহেব - সময় কি দ্রুতই না চলে যায়, আর তার সঙ্গে বদলে যায় মানুষের অভ্যেস। এক সময় কি ভাবা যেত যে মানুষ চা ছেড়ে কফি খাবে? বিয়ে বাড়িতে, রোঁস্তোরার মেন্যুতে কিংবা ফুটপাতে কোথায় নেই কফি? সবখানেই কফির আগ্রাসন। কফিময় দুনিয়ায় চা এখন লাপাত্তা।


মানুষ আজ মিনারেল ওয়াটার ছাড়া চলতেই পারে না। মনে করার চেষ্টা করেন বারেক সাহেব- এক সময় যখন মিনারেল ওয়াটার ছিল না তখন বিয়ে বাড়িতে পানি কিভাবে সার্ভ করা হতো। সম্ভবত জগে করে। আবছা-আবছা মনে পড়ছে যেন। বন্ধু হারুনদের ডেকোরেটারের ব্যবসা ছিল। বাসার সামনেই দোকান আর পেছনে বাসার উঠানজুড়ে থরে-থরে সাজানো ভাড়া দেয়ার নানান জিনিস।

সারি-সারি কাচের জগ ছিল তার অন্যতম। আর আজ, বিয়ে বাড়ি ছাড়িয়ে মিনারেল ওয়াটার ছড়িয়ে পড়েছে মাঠে-ঘাটে, বাসে-ট্রেনে, মেলায়-ময়দানে আর বৈশাখের তপ্ত রাজপথে। ব্যাপারটা এমন যে, আমরা যেন মায়ের পেট থেকেই মিনারেল ওয়াটার খেতে শিখে এসেছি!

চলবে কি আমাদের দিন এখন মোবাইল ছাড়া? আচ্ছা যখন মোবাইল ছিল না, মানুষ তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বন্ধুদের খুঁজতো কিভাবে? আর ডাক্তারাই বা ডাক্তারি করতেন কিভাবে? ক্লিনিকের কল থেকে শুরু করে চেম্বারের সিরিয়াল, প্রাক-মোবাইল যুগে এসব কিভাবে ম্যানেজ হতো তা খোদাই ভালো জানেন! আবার এই মোবাইলেরইতো কত বিবর্তন, ভাবেন বারেক সাহেব।

একসময় এটি ছিল শুধু কথা বলার আর শোনার যন্ত্র। অথচ আজ এর কতই না ব্যবহার - ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, গেমস, গান, ফেসবুক, ক্যামেরা আরো কত কি। এখন বোধহয় মানুষের বউ ছাড়া দিন চলে যায়, কিন্তু মোবাইল ছাড়া নয়।

ভাবতে ভাবতেই কেমন যেন গা’টা জ্বলে যায় বারেক সাহেবের। একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বাংলাদেশ এখন নাকি ‘উপচে পড়া থলে’। এহারে প্রবৃদ্ধি চলতে থাকলে ২০৩০-এর মধ্যে বিশ্বের প্রথম সারির ত্রিশটি দেশের একটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ, এমন মন্তব্য আই.এম.এফ.-এর।

তিনি যখন ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ, দল যখন তার ক্ষমতায়, তখন এদেশটি ছিল দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তাও আবার একবার না, পরপর বেশ কয়েকবার। আর এখনকার প্রধানমন্ত্রী নাকি সততার মূর্ত প্রতীক, পৃথিবীর তৃতীয় সবচাইতে সৎ সরকার প্রধানের তকমা এখন তার দখলে। তাও এই প্রধানমন্ত্রীর সরকার নাকি টুকটাক দুর্নীতি করে। নচেৎ ধুলায় লুটাত এঙ্গেলা মার্কেলের মানসম্মান। মাত্র তিন নম্বর বেশি পেয়ে একশতে নব্বই বাগিয়ে তার আর প্রথম হওয়া লাগত না।

সকালে পত্রকা খুলতেই প্রথম পাতার উপরটা জুড়ে আট কলামে প্রধানমন্ত্রীর এই অর্জনের বয়ান। সংসদে তার সাহসী উচ্চারণ, ‘মাথায় পচন ধরেনি। শরীরে দু’একটা ঘা আছে, এগুলোও আমরা সারিয়ে ফেলব’। আর ঐ একই পত্রিকার একই পাতার নিচের দিকে ছাপা হয়েছে আদালতে আরেক নেত্রীর ‘এতিমখানা আর এতিমদের দানের মাছ শাক দিয়ে ঢাকার বয়ান’। এটা কি কিছু একটা হলো।

মানুষ বদলায়, সাথে বদলায় তার অভ্যাস আর চাহিদা। চায়ের জায়গায় ঢুকে পরে কফি, ল্যান্ডফোনের জায়গায় মোবাইল আর টেস্টের জায়গায় টি-টুয়েন্টি। কিন্তু তাই বলে দুর্নীতিতে গোল্ড মেডেলের জায়গায় সততার ব্রোঞ্জ পদক! ভাবা যায়?

মাথাটা দপ-দপ করছে বারেক সাহেবের। বিয়ে বাড়ির হুল্লোর কেন যেন অসহ্য লাগছে। কপালে পাতলা ঘামের রেখা। কমিউনিটি সেন্টারের পুরো এসির মধ্যেও দরদর করে ঘামছেন তিনি। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ড্রাইভারকে ফোন ঘোরান তিনি। আচ্ছা যখন মোবাইল ছিল না, বিয়ে বাড়িতে গেলে ড্রাইভারকে খুঁজতেন কিভাবে? মনে পড়ছে না।

পৃথিবীটা বদলে গেছে। সময় থেমে আছে শুধু আছে একটা জায়গায় - নয়া পল্টনের ঐ বাড়িটায়। একদল নেতা সেখানে বসে কখনো তত্ত্বাবধায়ক আর কখনো বা সহায়ক সরকারের বুলি আউড়ে চলেছেন। এরা আসলে ‘তেলাপোকা’ - কখনোই বদলাবেন না। নিজেকেই প্রবোধ দেন বারেক সাহেব।

বি.দ্র. এই লেখার সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক।