একটি শ্রুতিমধুর শব্দ ছাড়া আর কী পাওয়া গেল?

../news_img/57376 mmm.jpg

জয়া ফারহানা ::  কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো উচ্চ মূল্যবোধের পররাষ্ট্রনীতি সত্ত্বেও গত ৪৬ বছরে কূটনীতিতে বাংলাদেশের সাফল্য খুব বেশি বলার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ যে সত্যিই কূটনীতি মনস্তত্ত্বের ভালো পাঠক নয় তার প্রমাণ আবারও মিলল মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারকে। যাকে অ্যারেঞ্জমেন্ট নামে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে।

শব্দটি চমৎকার। তবে এ চমৎকার শব্দটি থেকে শ্রুতিব্যঞ্জনার দ্যোতনাটুকু ছাড়া পাওয়ার মতো আর কিছু নেই। তবে প্রাপ্তি না থাকলেও শিক্ষা নেয়ার ব্যাপার আছে।

এ অ্যারেঞ্জমেন্ট বহু কিছু ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ দিল আরেকবার। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বন্ধু কে, আন্তরিক বন্ধু কে, কোন দেশের বন্ধুত্ব কেবল কথামালায় আবদ্ধ, কোন দেশের বন্ধুত্বের পারসেন্টেজের চেয়ে শত্রুত্বের পারসেন্টেজ বেশি, ধন-সম্পদে বড় প্রতিবেশী ধনী ও ক্ষমতাবান হওয়ার সুবাদে কীভাবে ক্ষমতাহীন প্রতিবেশীর ওপর দাদাগিরি ফলায় তাও দৃশ্যমান হল। অন্তত কয়েকটি পাঠ তো আমরা নিয়েছি এ অ্যারেঞ্জমেন্ট থেকে।

এক. বন্ধু হয়ে ত্রাণ তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হওয়া যত সহজ, ঠিক ততটাই কঠিন মিয়ানমারের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়।

দুই. খুন, ধর্ষণ, জাতিগত নিধন, এমনকি গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব যদি আক্রমণকারী দেশে ধনী প্রতিবেশীর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ থাকে।

তিন. জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর, অ্যামনেস্টি, মহামান্য পোপ এবং সারা বিশ্বের সব মানবতাবাদী মানুষের সমন্বিত শুভ শক্তিও কখনও কখনও হার মানে সামরিক ইউনিফর্মধারী এবং ইউনিফর্মবিহীন সামরিক নেতার কাছে।

চার. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার-টাধিকার এসব একরকম রেটরিক। বড় তরফের স্বার্থে এর সবই জলাঞ্জলি দেয়া যায়।

পাঁচ. এতদিন জানা ছিল সামরিক সেনা শাসকরা দেশের স্বার্থের অনুকূলে যায় এমন কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এখন দেখা যাচ্ছে গণতান্ত্রিক সরকারের চেয়েও সামরিক সরকাররা নিজের দেশের স্বার্থে একশ’ ভাগের জায়গায় দু’শ ভাগ আদায় করে নিতে পারে।

ছয়. প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলেও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা জায়েজ প্রতিপন্ন করা যায়, যদি সে আগুন নেভাতে গিয়ে নিজের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।

সাত. একপাক্ষিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবেশীর সঙ্গে অতি সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার জন্য কখনও কখনও ভদ্র প্রতিবেশীকে আম-ছালা দুই-ই হারাতে হয়।

প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ তো কোনো জিম্মিদশায় ছিল না। তাহলে কী কারণে তাড়াহুড়ার এই অ্যারেঞ্জমেন্ট? কেউ বলতে পারেন জিম্মিদশার চেয়ে কমই বা কী।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের জীবিকার অপরিমেয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কক্সবাজারের প্রতি দশজনের সাতজনই এখন রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ক্ষোভ-বিক্ষোভের একেকটি প্রজনন ভূমিতে পরিণত হয়েছে, যেখান থেকে যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বিস্ফোরণ। তাছাড়া আশ্রয় শিবির কোনো আদর্শ ব্যবস্থাও নয়। কিন্তু সম্পাদিত অ্যারেঞ্জমেন্টে তো এর কোনোটিরই সুরাহা দেখা যাচ্ছে না।

এতদিন ধরে আমরা শুনে এসেছি অতীতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের যতরকম অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফেরত পাঠানো হয়েছিল এবং যে নিরাপত্তার অভাবে তারা আবার বাংলাদেশে ফেরত এসেছে সেই অব্যবস্থাপনার প্রত্যাবাসন নীতিতে বাংলাদেশ আর ফেরত যাবে না। ১৯৯২ সালে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক সাবস্ট্যান্ডার্ড ইত্যাদি।

বলা হয়েছিল, এবার এমন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হবে যেন আর কখনও তাদের ফিরে আসতে না হয়। এবারের অ্যারেঞ্জমেন্ট কি চুক্তির কোনো আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করল?

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং যেসব দেশ মিয়ানমারের চরম ও চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনকে ঘৃণা করে রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল এবং সত্যিই যারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে ন্যায্যতা দিতে চেয়েছিল, অ্যারেঞ্জমেন্টের মাধ্যমে তাদের আইওয়াশ করেছে মিয়ানমার সরকার।

আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও বাংলাদেশ আম-ছালা দুই-ই হারাল। বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক চুক্তি চেয়েছিল। হল দ্বিপাক্ষিক। তাও আবার এমন এক পক্ষের সঙ্গে, অতীতে যাদের চুক্তি মানার কোনো রেকর্ড নেই। ১৯৯২ থেকে ২০১২ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংক্রান্ত কোনো চুক্তিই মিয়ানমার মানেনি।

রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি হলে বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারবে না এবং প্রত্যাবাসন নিয়ে দু’দেশের সমঝোতার পর কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা নিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের কাছে সহযোগিতাও চাইতে পারবে না, মিয়ানমারের এই অন্যায় শর্ত কেন মানবে বাংলাদেশ?

২০১৭-এর আগে-পরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার সবাইকেই মিয়ানমার ফেরত নেবে এ ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে অ্যারেঞ্জমেন্টে লেখা হয়েছে মিয়ানমার এককভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাই করবে।

নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ‘মিয়ানমার নিয়মে’ ক’জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো যাবে? লেখা আছে কেবল ২০১৭-এর আগস্ট থেকে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে কেবল তাদের ফেরত নেয়া হবে। বাকিদের কী হবে? লেখা নেই। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও জীবিকার সীমাহীন ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

বিশ্বে সবচেয়ে নিপীড়িত জাতির ওপর যতরকম নিপীড়ন চালানো যায় তার সব চালিয়েছে আর চুক্তিতে লেখা হয়েছে রাখাইনের মুসলমান ও অন্যরা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে গেছে সন্ত্রাসীদের কারণে।

মিয়ানমার সরকার বা নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে নয়। এত অন্যায় কথা যে অ্যারেঞ্জমেন্টে লেখা থাকে সেই অ্যারেঞ্জমেন্টে কী করে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে, যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে ঠিক এমনই ধারার একটি নিপীড়ক রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে।

রোহিঙ্গা শব্দটির প্রতি মিয়ানমারের অযৌক্তিক ঘৃণার অকারণ জেদও এ অ্যারেঞ্জমেন্টে বহাল। কোথাও রোহিঙ্গা শব্দটির ব্যবহার হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে রাখাইনের মুসলমান। অথচ বাংলাদেশের দাবি ছিল রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহারের এবং এ শব্দ লিখতে অস্বীকৃতির মাধ্যমে মিয়ানমার আবারও জানিয়ে দিল রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি দিতে তারা নারাজ।

প্রধানমন্ত্রী-ঘোষিত চিরতরে মিয়ানমারের সহিংসতা ও জাতিগত নিধন নিঃশর্তে বন্ধ করার যে অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত পরামর্শ ছিল তাও তো অ্যারেঞ্জমেন্টের কোথাও লেখা নেই। বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি অ্যারেঞ্জমেন্ট স্বাক্ষরের পরও প্রতিদিন রোহিঙ্গারা আসছে।

নিশ্চয়ই তাদের ওপর কোনো না কোনো অন্যায়-অত্যাচার হচ্ছে বলেই আসছে। কথা ছিল জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি এবং ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে আসবে; কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাদের প্রবেশের ব্যবস্থাও করছে না।

এই যখন অবস্থা তখন খুন-ধর্ষণ-জাতিগত নিধন এবং গণহত্যার সঙ্গে যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী জড়িত, তাদের বিচারের ন্যায্য আশা দূর থেকে আরও দূরে সরে গেল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এতদিন রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে যেভাবে নজরে রাখছিল এবং সেই নজরে যতখানি উত্তাপ ছিল, দ্বিপক্ষীয় এই চুক্তির পর সেই উত্তাপ কিছুটা হলেও নিস্তেজ হয়ে আসবে।

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, আপাতত অত কিছু আমাদের দেখার দরকার নেই। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাচ্ছে কিনা সেটিই বড় কথা। প্রতিবেশীর প্রতি উদার না হলে কি চলে? প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কোন প্রতিবেশীর প্রতি উদার হলাম?

এ এমন প্রতিবেশী, চুক্তির বরখেলাপ করা যাদের মজ্জার মধ্যে মিশে আছে। এ এমন প্রতিবেশী যারা মানবতাবাদকে কবর দিয়ে সেই কবরের ওপর দাঁড়িয়ে বুঝতে পারেন না কেন তাদের নাগরিকরা ভিটেমাটি-বাড়িঘর-সহায়সম্পত্তি এবং নাগরিকত্বের কাগজপত্র ফেলে সবরকম ঝুঁকি মোকাবেলা করে প্রাণভয়ে জান হাতে নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে পালিয়ে আসে। এ এমন এক প্রতিবেশী যে তার দেশের একটি জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংসতার সর্বোচ্চ নজির দেখানোর পরও পোপের কাছে আত্মপক্ষের সাফাই গেয়ে বলতে পারে তার দেশে ধর্ম ও বর্ণের কোনো বৈষম্য নেই।

নির্মমভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর দায়ে আন্তর্জাতিকভাবে তুমুল সমালোচনা ও নিন্দার মুখে মিয়ানমার সরকার বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করতে। কিন্তু চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে কোনো লাইন অব ক্রেডিট নেই।

মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশীর কারণে বাংলাদেশ যখন ৪৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে, সেই মিয়ানমারকে এত ছাড় দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যুক্তি কী থাকতে পারে? কারণ কি চীন? মিয়ানমারকে সামান্য তিরস্কার দেখাতেও যেন অনাগ্রহী বাংলাদেশ। সে তিরস্কার যেন গালি হয়ে লাগে চীনের গায়ে।

সেখানেই কি বাংলাদেশের আপত্তি? এই কি বাংলাদেশের বঞ্চনার প্রতিবাদ? যে সমস্যা কোনোভাবেই বাংলাদেশের সৃষ্ট নয়, সে সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের এত ডিফেন্সিভ হওয়ার তাৎপর্য কী? একটি শ্রুতিমধুর শব্দ ছাড়া এই অ্যারেঞ্জমেন্ট থেকে আমরা পেলামই বা কী?

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক