১১৬ একর জমির হদিস নেই

../news_img/57677 mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক ::  প্রতারক প্রতিষ্ঠান যুবকের ১১৬ একর (১১৬১৭ শতাংশ) জমির হদিস নেই। গ্রাহকের আমানতের টাকায় কেনা হয়েছিল এই জমি। যুবক বিষয়ে সরকার গঠিত প্রথম কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে জারি করা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেনা জমি গোপনে বিক্রি করে দিয়েছে সংস্থাটির কর্তৃপক্ষ। জমি বিক্রির চাঞ্চল্যকর আরেক দফা প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়েছে সর্বশেষ গঠিত মো. রফিকুল ইসলাম কমিশনের কাছে যুবক কর্তৃপক্ষের দেয়া হিসাব থেকে। দুই কমিশনের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট যুগান্তরের হাতে রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) সাড়ে তিন লাখ গ্রাহকের আমানতের অর্থে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬৭৪ একর জমি কেনা হয়। এ জমির হিসাব ওঠে আসে যুবকসংক্রান্ত সরকার গঠিত ড. ফরাসউদ্দিন কমিশনের (প্রথম কমিশন) তদন্তে। কিন্তু মো. রফিকুল ইসলাম কমিশনের (দ্বিতীয় কমিশন) তদন্তে যুবকের স্থাবর ও অস্থাবর মিলে মোট ৫১৮ একর জমির সন্ধান পাওয়া যায়। ১৫৬ একর জমির হিসাব দ্বিতীয় কমিশনকে দেয়া হয়নি। এই ১৫৬ একর জমির মধ্যে ১১৬ একর জমির ব্যাপারে যুবক কর্তৃপক্ষ একটি ব্যখ্যা দিয়েছে কমিশনকে। সেখানে বলা হয়েছে, এই জমি বর্তমানে আর অবশিষ্ট নেই। বাকি ৪০ একর জমিতে সমস্যা আছে।
 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ‘যুবকে ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সোসাইটির’ সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদ হোসেন মুকুল যুগান্তরকে বলেন, ‘যুবক কর্তৃপক্ষ নিজেই ৯১ খণ্ড জমি, ১৮টি বাড়ি ও ১৮টি প্রকল্পের হিসাব দিয়েছে ড. ফরাস উদ্দিন কমিশনের কাছে। কিন্তু পরে মো. রফিকুল ইসলাম কমিশনের কাছে যুবক কর্তৃপক্ষের দাখিল করা হিসাবে ১১৬ একর জমি অস্তিত্ব দেখানো হয়নি। এর অর্থ দ্বিতীয় কমিশন গঠনের আগেই এসব সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।’
 
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশব্যাপী যে ৫১৮ একর জমির কথা বলা হচ্ছে, এটি আমাদের হিসাব নয়, যুবক কর্তৃপক্ষের হিসাব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল অর্থমন্ত্রী যুবকের এক মিটিং থেকে বেরিয়ে বলেছেন যুবকের মাত্র ৯৮ একর জমি রয়েছে। এটা সঠিক হিসাব নয়। এটি অর্থমন্ত্রীকে কেউ ভুল বুঝিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যুবকে দ্রুত প্রশাসক নিয়োগ না দিলে বাকি সম্পত্তি রক্ষা সম্ভব হবে না।’
 
প্রশাসক নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে। তবে যুবকের কোনো প্রসঙ্গ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এলে তা দেখা হবে।’ তিনি বলেন, সরকার যুবকের প্রতারণা ব্যবসা বন্ধ করেছে। গ্রাহকদের মানবিক দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে যুবক নতুন করে কোনো ব্যবসা করলে তা হবে বেআইনি।
 
যুবক বিষয়ে সরকার ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি কমিশন (প্রথম কমিশন) গঠন করে। ‘দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট- ১৯৫৬’-এর ৪ নম্বর ধারার গ্রাহকের টাকায় কেনা সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পতির হিসাব দাখিল করতে ওই সময় কমিশন যুবকে নোটিশ দেয়। নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে ৬৭৪ একর জমি রয়েছে উল্লেখ করে যুবক কর্তৃপক্ষ কমিশনের কাছে হিসাব দাখিল করে।
 
এরপর ২০১১ সালে মো. রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে দ্বিতীয় কমিশন গঠন করা হয়। একই ভাবে দ্বিতীয় কমিশনও সম্পত্তির হিসাব চায় যুবকের কাছে। এ সময় যুবক কর্তৃপক্ষ ৫১৮ একর জমির একটি হিসাব কমিশনের কাছে দাখিল করে। যুবকের দেয়া সম্পত্তির দুটি তালিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সম্পত্তির হিসাবে গড়মিল রয়েছে। এ ব্যাপারে যুবক কর্তৃপক্ষ বলেছে, ১১৬ একর জমি অবশিষ্ট নেই। কিন্তু রফিকুল ইসলাম কমিশন বিপুল পরিমাণ জমির অস্তিত্ব না পেলেও রিপোর্টে এর কারণ হিসেবে কোনো কিছু উল্লেখ করেনি।
 
সূত্র মতে, যুবকের সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রির ওপর সরকারের গঠিত ড. ফরাসউদ্দিন কমিশন নিষেধাজ্ঞা জারির সুপরিশ করে। সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তা কার্যকর করে। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গোপনে দেশের বিভিন্ন স্থানের সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এখনও কিছু কিছু অঞ্চলে গোপনে যুবকের সম্পত্তি বিক্রি করা হচ্ছে।
 
রফিকুল ইসলাম কমিশনের রিপোর্টে দেখা গেছে, ১১৬ একর বা ১১ হাজার ৬১৭ শতাংশ জমি হিসাব থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এরমধ্যে সাভার বাগ্নিবাড়ি ১ এবং ২ প্রকল্পের প্রায় ১২৭ শতাংশ, ঢাকার উত্তরার মিতালী স্যাটে ১ ও ২ প্রকল্পের প্রায় ২৩২ শতাংশ, মাদারীপুর প্রকল্পের ১২১ শতাংশ, মুন্সীগঞ্জের দ্বিতীয় প্রকল্পের ৬৮৫ শতাংশ, ময়মনসিংহ প্রকল্পের ২২৫ শতাংশ, বরিশালের কাশিমপুর ২ ও ৩ প্রকল্পের ৫৭০ শতাংশ, আমানতগঞ্জ ১ ও ২ প্রকল্পে ৭৫০ শতাংশ, রূপাতলী প্রকল্পের ৫১৪ শতাংশ জমি রয়েছে।
 
এছাড়া পটুয়াখালীর পায়রা প্রকল্পের ৮৩ শতাংশ, বাউফলে ২৬৮ শতাংশ, বরগুনা আমতলায় ৩১৩ শতাংশ, চরফ্যাশনে ৩৩৫ শতাংশ, ভোলা যুবক গার্ডেনের ৮৮ শতাংশ, সিলেটের খোয়াইয়ে ৫২ শতাংশ, হবিগঞ্জের তরফে ৫৬৮ শতাংশ, বগুড়া ১ ও ৩ প্রকল্পের প্রায় ৬৩৪ শতাংশ, যমুনা ব্রিজের পশ্চিম পাশে যমুনা প্রকল্পে ৩৬০ শতাংশ, খুলনা ১ ও ২ প্রকল্পে ৯৭৯ শতাংশ, বনলতা ১ ও ২ প্রকল্পের ৮৩৭ শতাংশ, বাগেরহাট রূপসী প্রকল্পে ৪৩৪ শতাংশ এবং সুন্দরবন প্রকল্পের ১২৮ শতাংশ, সাতক্ষীরা প্রকল্পের ৩৬৬ শতাংশ ও চুয়াডাঙ্গা প্রকল্পের ৫৬ শতাংশ জমি রয়েছে।
 
উধাও হওয়া জমির মধ্যে আরও রয়েছে সীতাকুন্ড ১ ও ২ প্রকল্পের ২০৪ শতাংশ, চটগ্রামের বরাইহাট, হাটহাজারী, মিরসরাই, সৈয়কত ১ ও ২ প্রকল্পের ১ হাজার ১২ শতাংশ, ফেনীর ১,২, ছায়াবিথী ও ওয়েস্টা টাউন প্রকল্পের ১১৬৫ শতাংশ; কুমিল্লার ১ ও ২ প্রকল্পের ৫৮০ শতাংশ, গোমতি ১ ও ২ প্রকল্পে ৮৬ শতাংশ, দাউদকান্দিতে ৩০০ শতাংশ, চাঁদুপুরের লাকশাম, সদর, মুন্সিরহাট, খলিসাডুলি ও মতলব প্রকল্পের ৫৩৯ শতাংশ এবং লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জে ১০৪ শতাংশ জমি রয়েছে।