সিলেটী নাগরি লিপির গবেষণা শুধুই ব্যক্তি পর্যায়ে

../news_img/57773 mmm.png

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: নাগরি লিপির সাহিত্য ধারণ করেছে সিলেটি ভাষা। চৌদ্দ শতকের শুরুর দিকে বাংলা ভাষার সতন্ত্র এ লিপি উদ্ভবের পর থেকেই রচিত হয়েছে দু’শতাধিক গ্রন্থ, বিভিন্ন সাহিত্য ও গান। দলিল-দস্তাবেজ তৈরিসহ ওই সময়ের দৈনন্দিন কাজ চলেছে নাগরি লিপি ব্যবহার করেই। সময়ের বিবর্তনে এ লিপি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে এই লিপিটি যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য ২০০৮ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছেন সিলেটের সন্তান উৎস প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাফা সেলিম। ২০১৪ সালে ২৫ খণ্ডে নাগরি লিপির বই প্রকাশিত হয় এ প্রকাশনী থেকে।

যদিও সিলেটে নাগরি লিপি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনও গবেষণা হয়নি। তবে এ লিপি নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে গবেষণা হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। ভাষা বিজ্ঞানিরা বিভিন্ন পর্যায়ে এ ভাষা নিয়ে গবেষণা করেন। তবে এখন আর আগের মতো ব্যক্তিগত পর্যায়েও তেমন গবেষণা হয় না বলে নাগরি লিপির গবেষকরা জানান।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে উৎপত্তি নাগরি লিপি বাংলা ভাষার আরেকটি শিলালিপি। নাগরি বর্ণে এ শিলালিপি তৈরি হয়েছে। চৌদ্দ শতকের শুরুতে এ লিপির উদ্ভব হয় ঐতিহ্যসচেতন মুসলমানদের স্বাতন্ত্রবোধের কারণে। সিলেটি এ ভাষার শিলালিপি করেন সেখানকার ভাষা বিজ্ঞানিরা। এ ভাষা বাংলা ভাষার আরেকটি স্বতন্ত্র রূপ, আলাদা লিপির জন্য। এ ভাষার বর্ণসংখ্যা ৩২। বর্ণনাম এবং উচ্চারণ হুবহু বাংলার মতো। পৃথিবীতে অনেক ভাষার নিজস্ব বর্ণ নেই। কিন্তু বাংলা ভাষার দু’টি লিপি। বাংলা ভাষা ছাড়া স্কটল্যান্ডের ককনি ভাষায় দু’টি স্বতন্ত্র লিপি রয়েছে। তবে স্বাতন্ত্র্য ও সাহিত্যমূল্যের দিক দিয়ে নাগরী অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে সিলেটি ভাষার স্বীকৃতি মেলে ২০০৫ সালে। ফ্রান্সের যাদুঘরে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার পাশাপাশি সিলেটি ভাষার নাম রয়েছে। বর্তমানে এক দশমিক সাত মিলিয়ন লোক এ ভাষায় কথা বলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আঠার-উনিশ শতকে নাগরি চর্চার বিকাশ ঘটে চরম পর্যায়ে। ১৮৬০ সালে নাগরি লিপির মুদ্রণ শুরু হলে এর সাহিত্য আবেদন সিলেট অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধারা বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলমান ছিল। তখন কলকাতা, শিলচর, সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে নাগরি লিপিতে রচিত পুঁথি প্রকাশিত হতো। সিলেট অঞ্চলে সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের চেয়ে নাগরি লিপির ব্যবহার এক সময় বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। দলিল-দস্তাবেজ ও হিসাব-নিকাশে এ ভাষা ব্যবহার হতো। সিলেট নগরীর হাওয়াপাড়া নিবাসী মৌলভী আবদুল করিম ১৮৬০ সালে ইউরোপ সফর করে দেশে ফেরেন। নাগরি লিপির টাইপ বানিয়ে চালু করেন প্রথম সিলেট লিপির ছাপাখানা। সিলেট নগরীর বন্দরবাজারে প্রতিষ্ঠিত তার ছাপাখানার নাম ছিলো ‘ইসলামিয়া ছাপাখানা’। সেই ছাপাখানায় প্রথম নাগরি পুঁথি ছাপানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রেসটি পুড়ে যায়।

এভাবে ভাষাটির চর্চায় ভাটা পড়লেও গবেষণা চলেছে অনেক। নাগরি লিপি নিয়ে গবেষণা করে এ পর্যন্ত তিনটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জিত হয়েছে। এরমধ্যে এস এম গোলাম কাদির ‘সিলটী নাগরি লিপি ভাষা ও সাহিত্য’ শিরনামে গবেষণা করে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ভারতের আব্দুল মুছাব্বির ভূইয়া আসাম রাজ্যের গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সিলটী নাগরি লিপি’র ওপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। তার ‘জালাবাদি নাগরি, এ ইউনিট স্ক্রিপ্ট’ শীর্ষক থিসিস ইংরেজি ভাষায় মুদ্রিত হয়ে ২০০১ সালে বই আকারে বেরিয়েছে। ‘সিলেটি নাগরি: ফকিরি ধারার ফসল’ শীর্ষক থিসিসের জন্য ড. মোহম্মদ সাদিক ২০০৫ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

নাগরি লিপির গবেষক, পুঁথি সংগ্রহক ও প্রকাশক মোস্তফা সেলিম বলেন, ‘নাগরি লিপি পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে উৎস প্রকাশনী। লিপিটি বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমরা ২৫টি নাগরি লিপির বই প্রকাশ করেছি, যা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পাওয়া যাচ্ছে ২০০৮ সাল থেকে। পঞ্চাশ থেকে সত্তর বছর আগে নাগরি লিপি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। সময়ের ব্যবধানে এ লিপির মূদ্রণ, চর্চা আর পাঠকও কমে যায়। নাগরি লিপির মূদ্রণ, চর্চা আর পাঠক ধরে রাখতে উৎস প্রকাশনীর পক্ষ থেকে সিলেটসহ দেশের অন্যান্য স্থানে আলোচনা-সভা ও সেমিনার করে যাচ্ছি।’

মোস্তফা সেলিম বলেন, 'নাগরি লিপিসহ সিলেটের ঐতিহ্য নিয়ে আমরা এ অঞ্চলে বিশাল একটি যাদুঘর করতে যাচ্ছি। এজন্য জায়গা খুঁজে বের করা হচ্ছে। আগ থেকে এ লিপি নিয়ে এখন গবেষণা বেড়েছে। অনেকেই লিপি সংগ্রহ করে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করে গান, কবিতা গল্প প্রকাশও করছেন।'

তিনি আরও বলেন, ‘নাগরি লিপি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ভাষা। এটাকে ধরে রাখতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

সাহিত্য গবেষক ও লেখক সুমন কুমার দাস  বলেন, ‘নাগরি লিপি সিলেটে একটি ঐতিহ্য। এই লিপি বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায়। বাংলা ভাষা যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তার মূলে রয়েছে নাগরি লিপি। সিলেটের মরমী সাধক সৈয়দ শাহনূর, দিন ভবানন্দ’র নাগরি লিপি দিয়ে লেখা গানগুলো বাংলা ভাষায় সম্পাদন করার কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় চার বছর থেকে। ইতোমধ্যে কাজটি প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই উৎস প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হবে।’

সুমন কুমার দাস জানান, নাগরি লিপি সংরক্ষণসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন নাগরি লিপির গবেষক, পুঁথি সংগ্রহক মোস্তফা সেলিম। মূলত তার কারণেই নাগরি লিপিটি এখন টিকে আছে।

জানা গেছে, নাগরি চর্চায় ভাটা পড়লেও আশার আলো ফুটে উঠেছে। নাগরি ফন্ট এখন কম্পিউটারে উদ্ভাবিত হয়েছে। সিলেট নগরীতে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কম্পিউটার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার নামের কম্পিউটার বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা খায়রুল আক্তার চৌধুরী ও ফয়জুল আক্তার চৌধুরী— এ দুই ভাই তাদের যুক্তরাজ্য প্রবাসী চাচা বিশিষ্ট নাগরি গবেষক রসায়নবিদ আবদুল জলিল চৌধুরীর নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে ১৯৯৪ সালে সিলেটে নাগরি ফন্ট উদ্ভাবন করেন।