জন্মদিনে কবি ‘শেখর দেব’ এর পাঁচটি কবিতা

../news_img/57793 mmm.jpg

শেখর দেব, আপাদমস্তক এক বিনীত কবির নাম। কবিতার শহর চট্টগ্রামে জন্ম।  শৈশব নিংড়ে পান করেছেন কবিতার রস। তাই হয়ত গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ এবং প্রবন্ধে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলে ও আজীবন কবিতার কাছেই সমর্পণ করতে চান নিজেকে।  তার কবিতায় রয়েছে এক বিশেষ রাজনৈতিক চেতনা, যে চেতনা ধারণ করেছে মহান মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আমাদের গ্রাম ও শহুরে নাগরিক দৈনন্দিনতা ।

আজ ২১ ডিসেম্বর কবির জন্মদিন। পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘মৃদুভাষণ’ এর পক্ষ থেকে জন্মদিনের নিরন্তর শুভেচ্ছা কবিকে। পাঠকদের জন্য সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিতি সহ প্রকাশিত হলো কবির পাঁচটা কবিতা।

শেখর দেব
জন্ম : ২১ ডিসেম্বর, ১৯৮৫ খিস্টাব্দ।
শেখেরখীল, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
পিতা : শংকর কান্তি দেব
মাতা : নীলমণি দেব।
পড়াশুনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিশুদ্ধ গণিতে স্নাতকোত্তর।
প্রকাশিত গ্রন্থ : প্রত্নচর্চার পাঠশালা (২০১৪), বাঞ্ছাকল্পতরু (২০১৬) এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ কবিতার করিডোর (২০১৭)।

শেখর দেব এর কবিতা :

স্বল্পমাত্রার কবিতা

কখনো ভাবেনা কেউ এতো এতো নদী কোথায় গিয়েছে থেমে
কোথায় জন্মেছে তারা, কোন জনপদ ছুঁয়ে, আসে নিত্যধামে।

বাড়ি-পাশে ডেকে ডেকে উড়ে গেছে কতো শতো পাখি অবিরত
কখনো ভেবেছি কভু কোথায় তাদের ঘর, কোথায় বিগত?

ঝড়ের অবাধ্য নেশা, বাতাস তুমুল বাজে, উড়ে গেছে ঘর
পথিমধ্যে কাদের করেছে সর্বনাশ, কাদের করেছে পর।

কাছে আসার নামে কল্পনায় বেঁধে ঘর চলে গেছো দূরে
শূন্যতা বেঁধেছে আজ, অবাধ্য তুমুল অন্ধকার মিছে মরে !

 

ম্যামোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং

ডানে বামে অচেনা এক দোল খেয়ে বুঝেছি-শহর দুভাগ হয়ে উঠে এসেছে দুহাতে। মূলত দুটি শহর ঠিক ঝুলে আছে দুপাশে।  ডানের শহরে যে হারিয়ে গেছে তাকে খোঁজার কোন অবকাশ নেই। বামের শহর হতে অবিকল অনুতাপ নিয়ে একজন এগিয়ে আসে কাছে। বিবিধ প্রাপ্তির প্যাকেজ হাতে বলে-পরিণতি এমনি হবে, শুধু ইচ্ছে রঙে সাজাবো দুজনার স্বপ্নগুলো।  অতঃপর পুতুল খেলা শেষে ঘুমিয়ে পড়বো যে যার মতো।  ঠিক জানা গল্পের সুনিপুণ মঞ্চায়ন। দুজন মিলিত হলে হাজার পায়রা উড়ে যাবে কর্ণফুলীর দিকে। অথচ বামের শহরে এ নামের কোন নদী নেই। পরস্পরের কর্ণফুলীতে তবু জোয়ার আসবে, দুলে উঠবে পরিযায়ী জাহাজ।  সজ্ঞানে সম্মোহনে মিছেমিছি বলে যাবো ভালোবাসি ভালোবাসি !

 

কবিতার কঙ্কাল

তোমাকে গ্রন্থিত করেছি বহুকাল আগে। সেই থেকে পাতার ভাঁজে জমে আছে স্মৃতির আয়ু।  একদিন আচানক পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে দেখিপাতার মগ্নতায় শুয়ে আছে তোমার কঙ্কাল। বিশ্বাসই হয়না-একদিন সযতনে তোমাকে করেছি জীবন্ত গ্রন্থিত। অসভ্য সময়ের ভেতর কখন কোন ফাঁকে নীরবে বেরিয়ে এসেছো পাতার ভাঁজ হতে। ধরেছো আগন্তুকের অর্বাচীন হাত।  এভাবে কবিতার আত্মাজীবন্ত চলে যায় দূরে, পড়ে থাকে কবিতার কঙ্কাল !


মৌনমুদ্রা

কখনো সহজ হতে পারিনি নদীদের পাঠশালায়। কুলকুল বহমান শরীরে কতকিছু তলিয়ে যায় অলক্ষে। মীনের মুদ্রাগুলো রপ্ত করেও বুঝিনি জালের জুয়া।  নদীর কাছে কতো আগে রেখে এসেছি লৌকিক আবেগ আর প্রচ্ছন্ন প্রেম। তবুও নীরব স্রোতের কাছে গিয়ে বুঝিনি ভাসমান শ্যাওলার ভাষা।  অথচ নদীরা কাছে এসে করেছে কুর্নিশ ।

বন্ধনের বেলুন উড়িয়ে পুনর্বার লুফে নিতে চেয়ে বুঝেছি-আকাশ বেলুনের সহোদরা।  বেলুন শূন্যের কাছাকাছি কিছু আবদ্ধ মোহের স্মৃতি। সমস্ত বন্ধন থেকে সরে এসে দেখেছি-আকাশ নুয়ে পড়ে ক্ষণিক স্মৃতির কাছে।  বায়ুর অসংলগ্ন সুর কানে এসে বলে জীবন অব্যক্ত নিয়মের নদী আর অনন্ত মোহের মমতা।

 

লীলাসমগ্র

তরতাজা জীবন দেবো ভেবেছি যাকে, সে জীবন মানে বোঝে লীলা।  আদিগন্ত আকাশ উপহার দিয়ে দেখেছি, জড়িয়ে নিতে নিতে ভেবেছে  দেয়া হলোনা কেন পাতাল।  সে এমন কাউকে খুঁজে, যে তাকে দিতে পারে পাতাল উপহার। এভাবে দ্বিতীয়জনের কাছে ছুটে যাবার ঘটনাটাও লীলা! মন্দির, মসজিদ, চার্চ ও প্যাগোডা সব জায়গায় সে নুয়ে রাখে মাথা। সর্বব্যাপী লীলার মায়া। তাই পাতালের লোভে সে রপ্ত করে নেয় অবহেলার বহুবর্ণ কলা, হয়ে যায় নর্দমার কীট। ধর্মালয় থেকে লীলা সংগ্রহ করে লীলাময় করে তোলে জীবন। নর্দমা বাড়ে, সাথে কীটের কিলবিল !