বিটকয়েন কী?

../news_img/57846 mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক ::  মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা টেবিলে বসানো পুরনো কম্পিউটার- ইদানীং নেট খুলতেই চোখের সামনে চকচকে মুদ্রা। বিটকয়েন! সম্প্রতি তার দাম চড়েছে হু হু করে।

হালে আগাম লেনদেনে ১ বিটকয়েনের দাম ছাড়িয়েছিল ২০ হাজার ডলার বা ১৩ লক্ষ টাকা! এখন তা ১০ লক্ষের ধারে পাশে। রীতি মতো চোখ কপালে ওঠার মতো অঙ্ক না? ১ বছরে এই মুদ্রার দাম বেড়েছে ১৮-২০ গুণ। চোখে-চিন্তায় ধাঁধা লেগে যাওয়ার মতোই বটে। আর হয়তো সেই কারণেই আছড়ে পড়তে শুরু করেছে বিজ্ঞাপন ‘এখানে টাকা রাখুন’।

এই কয়েন কোনও দেশের নয়। কোনও নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক নেই। তাই সেখানে টাকা ঢালবেন কি না, আপনার ব্যাপার। আমরা শুধু বলব, তার আগে দশ বা হাজার বার নয়, লক্ষ বার ভাবুন।

বিটকয়েন কী?
একটু খটমট, কিন্তু ব্যাপারটা মোটামুটি এ রকম
# বিটকয়েন হল অনলাইন লেনদেনে ব্যবহারের জন্য এক ধরনের মুদ্রা (ডিজিটাল কারেন্সি)। তা দিয়ে কেনাকাটা করা কিংবা টাকা মেটানো যাবে শুধু নেটেই।

# ১ টাকা মানে যেমন ১০০ পয়সা, তেমনই ১ বিটকয়েন মানে ১,০০০ মিলি-বিট কয়েন। আর ১ মিলি-বিটকয়েন সমান ১,০০,০০০ শাতোশি।

# এই মুদ্রার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ, এতে লেনদেনকারীর পরিচয় গোপন থাকে। তার বদলে ব্যবহার হয় সঙ্কেতলিপি। অর্থাৎ, অন্য ডিজিটাল লেনদেনে যেমন বলা যায় যে, তা কার কাছ থেকে কার কাছে গিয়েছে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা বলা যায় না। শুধু জানা যায় এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যটিতে তার লেনদেন হয়েছে। তবে যদি এক্সচেঞ্জে এর লেনদেন (ট্রেডিং) করতে চান অথবা বিট কয়েন ভাঙিয়ে টাকা হাতে নিতে চান, তা হলে পরিচয় গোপন রাখা শক্ত।

# ব্যবহার করা যায় মোবাইল, ট্যাবলেট, কম্পিউটার মারফত। ইন্টারনেট থাকলেই হল।

# বিশ্বের বেশ কিছু নামী সংস্থা এবং ওয়েবসাইট বিট কয়েনের মাধ্যমে টাকা নেয়। দু’জনের হাতে এই মুদ্রা থাকলে, লেনদেন করা যায় নিজেদের মধ্যেও। তবে দু’য়ের সংখ্যাই কম।

কারিগর কে?
শাতোশি নাকামোতো। ২০০৮ সালে তিনিই প্রথম তৈরি করেন এই মুদ্রার সফটওয়্যার। কিন্তু তিনি কি এক জন মানুষ? নাকি একটি গোষ্ঠী? কোন দেশের? এ সব প্রশ্নের উত্তর গত আট বছর ধরে জানা যায়নি।

অনেকের দাবি, নাকামোতোর জন্ম ১৯৭৫ সালের ৫ এপ্রিল। তিনি জাপানের মানুষ। আবার অনেকে মনে করেন, নাকামোতো কোনও এক জন ব্যক্তি নন। বরং মার্কিন মুলুক এবং ইউরোপের অনেকে মিলে তৈরি করেছেন বিটকয়েন। তাহলেই বুঝুন, এর উৎস কতখানি অচেনা।

কেনা-বেচা কী ভাবে?
# চাইলে কেনা যায় বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ অথবা কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে। বিক্রিও হয় সে ভাবেই।

# সাধারণত কেনার চেয়ে বিক্রি করা কঠিন। কারণ, যে কোনও এক্সচেঞ্জ থেকে বিটকয়েন কেনা যতটা সহজ, বিক্রি ততটা নয়। এই মুদ্রা বিক্রি করতে হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হয় কেওয়াইসি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য ইত্যাদি। তাতেও হ্যাকিংয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর আলাদা করে কাউকে বিক্রিও কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

# বিটকয়েন লেনদেনের জন্য প্রথমেই খুলতে হয় বিটকয়েন ওয়ালেট। যে কেউই তা খুলতে পারেন।

# এই ওয়ালেটে বিটকয়েন জমা থাকে। যা রাখা যায় অনলাইনে। কম্পিউটারে এবং নেট মাধ্যমে তৈরি ‘ভল্ট’ বা লকারে।

# লেনদেন করতে চাইলে ওই জমা বিটকয়েনই পাঠাতে হয়। কিন্তু এক বার বিটকয়েন চুরি গেলে, কোনও পুলিশের ক্ষমতা নেই খুঁজে আনার।

# পাসবই দেখে বা নেট ব্যাংকিং করে বলা যায় যে আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কত টাকা রয়েছে কিংবা তা থেকে কী লেনদেন করেছি। বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। বরং তার বদলে থাকে কত কয়েন ছিল আর কত আছে।

ধরুন ‘ক’ ‘খ’-কে ১ বিট কয়েন পাঠাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে লেনদেন শেষ হলে ‘ক’ ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে দেখাবে ১ বিট কয়েন কমেছে। আর ‘খ’-এর তা বেড়েছে। তা দেখেই বোঝা যাবে হাতবদল হয়েছে বিটকয়েন। তবে অ্যাকাউন্ট জানা গেলেও, এ ক্ষেত্রে লেনদেনকারীর পরিচয় জানা যায় না।

শুরু কবে?
# প্রথম বিটকয়েন নাম প্রকাশ্যে আসে ২০০৮ সালে শাতোশি নাকামোতো-র লেখা একটি প্রবন্ধে।

# ২০০৯ সালে চালু হয় বিটকয়েন লেনদেন। তবে শুধু মাত্র বন্ধুদের মধ্যে ব্যবহারের জন্য (পিয়ার টু পিয়ার)।

# ২০১০ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু বিটকয়েনের দাম ঘোষণা। সেই সঙ্গে পিৎজা কিনতে এর ব্যবহার দিয়ে শুরু লেনদেনও।

তৈরি কী ভাবে?
# বিভিন্ন দেশের সরকার বা শীর্ষ ব্যাঙ্ক নোট বা কয়েন ছাপায়। কিন্তু নেটে ব্যবহার করা হয় বলে বিটকয়েন ছাপানোর কোনও প্রশ্ন নেই। তবে এই মুদ্রা ‘মাইনিং’ করা হয়।

# নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত ১০ মিনিট) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কম্পিউটার থেকে হওয়া বিটকয়েনের লেনদেন নিয়ে তৈরি হয় এক-একটি ব্লক। আর এই ব্লকগুলির হিসেব যে ‘নেট-খাতায়’ (লেজার) লেখা থাকে, তাকেই বলে ‘ব্লক-চেন’।

লেনদেনের যে কোনও সময়ে ব্লক-চেনই বলে দেবে কোথা থেকে বিটকয়েন কোন অ্যাকাউন্টে গিয়েছে। তা বদলানো হলেও, ধরা পড়বে সঙ্গে সঙ্গে। এ ভাবে লেনদেনের হিসেব রাখার পুরো প্রক্রিয়াকে বলে ‘মাইনিং’। আর যারা এই কাজ করেন, তাদের বলে ‘মাইনার’।

এই সব মাইনার ২,১০,০০০ ব্লকের সমাধান খুঁজে পেলে তাদের বিট কয়েন ‘রিওয়ার্ড’ বা উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। এ ভাবেই বিটকয়েন বাজারে আসে। তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার