আলোচনার শীর্ষে খলনায়ক বাচ্চু

../news_img/58000 mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: ব্যাংকিং খাতে কলঙ্কজনক এক খলনায়ক শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকার তাকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তার কাজ ছিল সরকারি এ ব্যাংকটি যাতে ঋণ বিতরণ ও আদায়ে কোনো অনিয়ম না করে, ব্যাংকিং নীতি মেনে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা করে তা তদারকি করা। ব্যাংকটিকে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করে আমানতকারীদের স্বার্থসংরক্ষণ করা। কিন্তু ঘটল তার উল্টোটা। তিনি পুরো ব্যাংকটিকে তার পারিবারিক সম্পদে পরিণত করলেন এবং নজিরবিহীনভাবে লুটপাট আর ঋণ জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়লেন। ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন এ আর্থিক কেলেঙ্কারিতে তোলপাড় ছিল ২০১৭ সাল। বিশেষ করে এত অপরাধ করেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি দুর্র্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তাকে এড়িয়ে যায়; যা ছিল তীব্রভাবে সমালোচিত। শেষ পর্যন্ত উচ্চাদালতের নির্দেশে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হয় এ আলোচিত খলনায়ক। তার ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়। বছরের শেষ সময়ের এ ঘটনাও ছিল আলোচিত।

 

 

২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পুরো পরিবার মিলে আমানতকারীদের আমানত লুটেপুটে নেন তিনি। এতে ব্যাংকটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লে তাকে নিরাপদে পদত্যাগের সুযোগ করে দেয়া হয়। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা অনিয়মের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বাচ্চুকে বিচারের আওতায় আনার দাবি তোলা হলেও তিনি থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ৪ ও ৬ ডিসেম্বর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নিয়ে বাচ্চু বেশ কিছু ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেন। প্রথমে ধৃষ্টতার সঙ্গে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন- পর্ষদের কোনো দায় নেই। সব দোষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অর্থাৎ এমডি, ডিএমডি ও শাখা ম্যানেজারদের। এরপর তিনি আবার বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেছিলেন, আমাকে আবার বেসিক ব্যাংকের দায়িত্ব দেয়া হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তার এ বক্তব্যকে কেউ কেউ ‘জোক অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির জন্য বাচ্চুসহ পর্ষদ দায়ী। দিনের আলোর মতো এমন সত্য অস্বীকার করল বাচ্চু। এ ধরনের কথা সিনেমার খলনায়কও বলতে পারেন না। কেউ কেউ বলছেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতিবাজদের শীর্ষ খলনায়ক শেখ আবদুল হাই বাচ্চুু। তার স্পর্ধা দেখে অন্য দুর্নীতিবাজরাও সাহস পাচ্ছেন। সে কারণে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিলেন বাচ্চু। তবে বছর শেষে দুদকের কাছে তার ধরা দেয়া ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। এছাড়া তার মতো অন্য কোনো দুর্নীতিবাজ এতবার গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনাম হননি। সব মিলিয়ে চলতি বছর আলোচনার শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং খাতের এ খলনায়ক। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, একটি ব্যাংকের সব দায়-দায়িত্ব পর্ষদের। বোর্ডের অনুমোদন বা প্রভাব ছাড়া ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনো ঋণ দিতে পারে না। সে ক্ষেত্রে বেসিক কেলেঙ্কারির দায় বাচ্চু কোনোভাবে এড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, বাচ্চু চরম সত্য অস্বীকার করে মিথ্যার জন্ম দিয়েছেন। তাকে বেসিক কেলেঙ্কারির দায় নিতেই হবে।

 

এদিকে বেসিক ব্যাংককে দেউলিয়া ঘোষণা করা উচিত বলে মনে করেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, ব্যাংকটি যে সমস্যায় পড়েছে, তা থেকে আগামী ১৫ বছরেও উত্তরণ ঘটার সম্ভাবনা নেই। অনুমিত হিসাবসম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্দশ বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

 

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাচ্চু বেসিক ব্যাংককে রক্তাক্ত করে গেছেন। সে রক্তক্ষরণ এখনও থামেনি। আগে ক্ষতস্থান সরানোর কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হোক। তারপর দেউলিয়া ঘোষণা বা অন্য কিছু। কিন্তু এখনই ব্যাংকটিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা ঠিক হবে না বলে মনে করেন তিনি।

 

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ২০১৫ সালের শেষ দিকে রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় ১৫৬ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তা, ১১ জরিপকারী ও ৮১ ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানসহ ১২৯ জনকে আসামি করা হয়। মামলাগুলো তদন্ত করছেন দুদকের ১০ কর্মকর্তা। তবে কোনো মামলাতেই আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। এ নিয়ে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সর্বশেষ আদালত পর্যন্ত সমালোচনা করেন। এরপর বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদকে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার প্রায় চার বছর পর দুদক প্রথমবারের মতো নোটিশ দেয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের কয়েক দফা পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

 

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, কেলেঙ্কারির আগে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৪ শতাংশ। আর বাচ্চু দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ হয়েছে ৫৩ শতাংশ। ব্যাংকটিতে এত লুটপাটের পরও তাকে কেন বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না। তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। আসলে তার শক্তির উৎস কোথায়?