নকল ওষুধের কারবার তিন বছরেই শতকোটি টাকার মালিক দুলাল

../news_img/58021 mmm.jpg

নুরুল আমিন :: দশ বছর ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রুহুল আমিন ওরফে দুলাল হোসেন। সাত বছর সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করলেও তিন বছর ধরে শুরু করেন মরণব্যাধি ক্যান্সারের নকল ওষুধের রমরমা বাণিজ্য। জুয়া খেলে লাখ লাখ টাকা হেরে নকল ওষুধের ব্যবসার পথে পা বাড়ান তিনি। চীন থেকে নকল ওষুধ এনে সরবরাহ শুরু করেন দেশের বাজারে। এভাবেই আলাদীনের চেরাগ হাতে পাওয়ার মতো কয়েকশ’ কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি। সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ ক্যান্সারের নকল ওষুধসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন সিআইডির কর্মকর্তারা।
 

সিআইডি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দুলাল মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার ভাগ্যকুল এলাকার পান্নু চৌধুরীর ছেলে। এলাকায় তিনি জুয়াড়ি দুলাল নামে পরিচিত। নকল ওষুধের কারবার করে এলাকায় গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাংলো। ঢাকায় রয়েছে তার নামে একাধিক ফ্ল্যাট। আবার জুয়ার আসরে গিয়ে প্রতিদিন উড়ান লাখ লাখ টাকা। সিআইডির হাতে গ্রেফতারের দিনও তার কাছে জুয়া খেলার আড়াই লাখ টাকার চিপ পাওয়া যায়।

সিআইডির মুখপাত্র ও অর্গানাইজ ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম  বলেন, দুলাল খুবই চতুর ব্যবসায়ী। প্রথমে আসল ওষুধের ব্যবসা করলেও জুয়ার বোর্ডে অনেক টাকা হেরে যাওয়ার পর শুরু করেন নকল ওষুধের ব্যবসা। দেশের বাজারে বিক্রি হয় এমন বিদেশি ওষুধ নকল করে চীন থেকে তৈরি করিয়ে আনতেন তিনি। আর এসব বিক্রি করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

সিআইডি সূত্র জানায়, চীন থেকে মোবাইল, টিভির পর এবার নকল ওষুধ তৈরি করে দেশে সরবরাহ শুরু করেছে বেশ কয়েকটি চক্র। আর ওইসব মরণ-ওষুধ দেশে আনা হচ্ছে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে। এ কাজে তাদের সহায়তা করছেন কাস্টমসের কিছু অসাধু সদস্য।

জুয়ার টেবিলে বসে নকল ওষুধ আমদানির পরিকল্পনা হয় জানিয়ে সিআইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতাররা মূলত জুয়াড়ি। বিভিন্ন ক্যাসিনোয় গিয়ে জুয়া খেলতে গিয়ে তাদের পরিচয়। এরপর পরস্পরের যোগসাজশে চীনে ভেজাল ওষুধ তৈরি করে আমদানির পরিকল্পনা করে। তারা স্বীকার করেছে, বেশি লাভের আশায় এসব নকল ওষুধ চীন থেকে তৈরি করে তারা দেশে এনে বাজারজাত করছে। আমরা এর সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম পেয়েছি। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরের ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শত শত কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে লেনদেন করেছে তারা।

বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকে এ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তারা হল- রুহুল আমিন ওরফে দুলাল চৌধুরী, নিখিল রাজ বংশী ও সাঈদ। পরে তাদের তথ্যের ভিত্তিতে তাঁতীবাজারের একটি গোডাউন থেকে ২১ হাজার পাতা ওষুধ এবং ৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে।

দুলালের এলাকা মুন্সীগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শৈশবে মারা যায় দুলালের বাবা পান্নু চৌধুরী। এরপর তার মা রহিমা বেগম তাকে নিয়ে মামার বাড়ী শ্রীনগরের ষোলঘর এলাকায় চলে যান। সেখানে হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় তাকে। তবে পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। ছোটবেলা থেকে চতুর দুলালের ঝোঁক ছিল জুয়ার প্রতি। এমন খারাপ অভ্যাসের কারণে তার বড় মামা মহসিন তাকে ২০ বছর বয়সে সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে দেন। সেখানে কয়েক বছর চাকরি করে দেশে ফিরে ওষুধের ব্যবসা শুরু করে সে। এরপর গত ১০ বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যায়।

স্থানীয় সাবেক মেম্বার গাজী কাওসার  বলেন, অবৈধ চোরাকারবারির টাকায় এলাকায় বিলাসবহুল বাংলো তৈরি করেছে দুলাল। সপ্তাহে দু’দিন সেখানে বসে মদ, জুয়া ও নারী নিয়ে আড্ডা। আর সেই আড্ডায় যোগ দিতে প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে গাড়িতে করে বন্ধুবান্ধব নিয়ে শ্রীনগরে আসে দুলাল। এলাকায় সে জুয়াড়ি দুলাল নামেও পরিচিত।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতাররা প্রতি মাসেই চীনে যাতায়াত করত। সেখানে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী নকল ওষুধ তৈরির অর্ডার দিত। ক্যালসিয়াম ক্লোরাইডসহ নিন্মমানের উপাদান দিয়ে নামিদামি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করা হতো। এরপর ইলেকট্রুনিক্সসামগ্রী আমদানির আড়ালে কাস্টমসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় এসব ওষুধ কনটিনারে আমদানি করত এ চক্র।- যুগান্তর