মৌলভীবাজারে মনু নদীর ভাঙনে জনমনে আতংক

../news_img/58062 mmm.jpg

রিপন দে, মৌলভীবাজার থেকে ::  মৌলভীবাজার জেলার উপর দিয়ে প্রভাহিত মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ  ভাঙনের ফলে আতঙ্কে আছেন সদর উপজেলা ও কুলাউড়া উপজেলার মানুষ। ইতোমধ্যেই অনেক জায়গায় প্রতিরক্ষা বাঁধের অনেক অংশ নদীর্গভে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পাড় সম্পূর্ণ ভেঙে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাবার ভয়ে আছেন এলাকার মানুষ।

সদর উপজেলার সরেজমিনে দেখা গেছে , মনু নদীর তীরবর্তী চানপুর ও সুমারাই গ্রামে অনেক অংশে ভাঙনের চিত্র। এই বছর চানপুর গ্রামের হরেকৃষ্ণ, যতিনদ্র, বলাই বর্ণম সহ ১০ জনের ভিটেমাটি মনু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে আছে আরো ২০ টি বসত ঘরসহ স্থানীয় মসজিদ।

আখাইলকুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম আহমেদ  জানান, “গত বছর ২৪ টি ঘর নদীতে বিলীন হয় এই বছর আরো ১০ টি। পানি উন্নয়ন র্বোডের কাছে যোগাযোগ করার পর তারা পরিদর্শন করে কিন্তু ২ বছরের নদী ভাঙ্গন রোধে কোন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেনা। এভাবে ভাঙন অব্যহত থাকলে হলদিপুর পাকা রাস্তাটিও মনুনদীতে বিলীন হয়ে যাবে।

কুলাউড়া উপজেলার মন্দিরা এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, মনু নদীর বিশাল ভাঙনে পাড়ের মাটি গাছপালা ধসে নদীর মধ্যে পড়েছে। গ্রামের সুধাংশু শীলের বাড়ি দুই-তিন ফুটের মতো অবশিষ্ট আছে। পানি বাড়লে যেকোনো মুহূর্তে এই অংশটিও নদীর গর্ভে বিলীন হবে। এই পাড় দিয়ে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজন আসা-যাওয়া করেন বলে দুর্ঘটনা এড়াতে গ্রামবাসী ভাঙনকে ঘিরে বাঁশের বেড়া দিয়ে রেখেছেন।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, গত অক্টোবরে মনু নদীর পানি বাড়লে মন্দিরা অংশে বিশাল ভাঙন দেয়। গাছপালাসহ বাঁধের প্রায় দুহাজার ফুটের মতো এলাকার পাড়ের মাটি ধসে পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি ভাঙন দিয়েছে সুধাংশু শীলের বাড়ির কাছে। এই অংশটি এখন এতোটাই নাজুক খরস্রোতা মনু নদে পানি বাড়লে বাঁধ টিকানো কঠিন হবে। এতে করে মন্দিরা গ্রামে অন্তত ৪০টি পরিবার ঝুঁকি ও আতঙ্কের মধ্যে আছেন। হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রনতি আচার্যের বাড়ি মন্দিরা গ্রামে। তিনি বলেন, ’নদী ভাঙতে ভাঙতে একবাররে ভিটার কাছে আইছে। আমরা খুব আতঙ্কিত ও অসহায়বোধ করছি।’
অন্যদিকে রাজাপুরসহ আশপাশের কলিরকোনা ও ছইদল বাজার এলাকার প্রায় দুই হাজার লোক নদীর বাঁধ দিয়ে পৃথিমপাশা ইউনিয়নসহ উপজেলা সদরে চলাচল করেন। কিন্তু বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। বাঁধটি ১৫ থেকে ২৫ ফুট চওড়া হলেও ভাঙনকবলিত স্থানে তা ৫ থেকে ৭ ফুট হয়ে গেছে। এরই মধ্যে লোকজন ঝুঁকি নিয়ে ওই স্থান দিয়ে চলাচল করছে। রাজাপুরসহ নদের বিভিন্ন স্থানের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামতে সম্প্রতি এলাকাবাসী ও কৃষক সমিতি উপজেলা সদরে মানববন্ধন করেছে। কলেজ শিক্ষার্থী ফয়জুল হক বলেন, ’আমরা দীর্ঘদিন থেকে ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ মেরামতের দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিচ্ছেনা। এই শীত মৌসুমে বাঁধ মেরামত করা না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে এই এলাকা প্লাবিত হবে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ঠ হবে।’ মন্দিরা গ্রামের দীলিপ মালাকার, সুবল শীল, হোসেন আলীসহ উপস্থিত সবাই জানালেন, এই ভাঙন ঠেকানো না গেলে গ্রাম টিকানো মুশকিল হবে। বর্ষায় পানি ঢুকে মন্দিরা, হরিচক, সাধনপুর, উত্তর ও দক্ষিণ বাড়ইগাঁও এলাকা প্ল¬াবিত হবে। এ পানি গিয়ে বন্যার সৃষ্টি করবে কমলগঞ্জের পতনউষার ও রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নেও। এ ছাড়া মনু নদীর বাঁধের মন্দিরা এলাকা দিয়ে হাজীপুর ইউনিয়নের আট-নয়টি গ্রামের হাজারো মানুষ এলাকার কটারকোনা বাজার, কটারকোনা এলাকার স্কুল-কলেজ, মনু রেল স্টেশন, ইউনিয়ন অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে আসা-যাওয়া করেন। বাঁধটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লে এই চলাচলও ব্যাহত হবে।

হাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান জানান, ‘ অতীতের ভাঙনে শতাধিক বাড়ি বিলীন হয়েছে। মানুষ নতুন করে ফসলি জমিতে বাড়িঘর করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সাথে যোগাযোগ হয়। কিছু মাটি ভরাটের কাজ হয়। এই অপরিকল্পিত কাজ কোনো উপকারে আসছে না। ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে মনু নদীর ভাঙন চলছে। পরিকল্পিতভাবে এই ভাঙন রোধ না করলে গোটা ইউপির মানচিত্র পরিবর্তন হয়ে যাবে।’

পাউবো মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান,‘মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙনকবলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘুরে  ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্ধ চেয়ে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে মেরামতের জন্য । আপাতত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোয় কাজ করানো হবে।’