আমাদের সময়ের সাধারন জীবনের আসাধারন শিক্ষকেরা

../news_img/58131 mmm.jpg

শেখর ভট্টাচার্য  :: আনন্দময় পরিবেশে, বন্ধু সুলভ আচরণের মাধ্যমে সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করাই শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব । শিশু কিশোর শিক্ষায় মেধার বিকাশের জন্য এটাই সর্বজন গ্রাহ্য উপায় । এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই। অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আমদেরকে নিয়ত প্রশ্নের সম্মুখে দাড় করিয়ে দেয়। এসব প্রশ্ন কখনো কখনো দ্বন্দ্বে ফেলে দেয় আমাদেরকে, পিছন ফিরে তাকিয়ে তখন বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে উপসংহারে পৌছা জরুরী হয়ে পড়ে।আমরা যারা ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে সত্তরের দশকের মধ্য পর্যায়ে বা তার ও অনেক পূর্বে মাধ্যমিক শিক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছি, শিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের মনে বেশ কিছু দন্ধ প্রবণ প্রশ্নের উদয় হয়।


প্রশ্নগুলো হল,  আমাদের শিক্ষকরা কি খুব অনাধুনিক ছিলেন ? তারা কি পাঠদানে সৃজনশীল ছিলেন না ? তাঁদের নিবেদন বা কমিটমেন্ট কি যথেষ্ট ছিলোনা না ? তাঁরা কি পাঠদানে আন্তরিক ছিলেন না?শিক্ষকদের পাঠদানের কার্যকারিতা কি যথেষ্ট ছিল না?
সাধারণত আমরা অতি সরলীকরণ করে এ প্রশ্ন গুলোর খুব নিষ্ঠুর ও একপেশে উত্তর দিয়ে থাকি। তাঁদের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলি।অতি সরলীকরণ/সাধারণীকরণ করে অনেকেই বলে থাকেন আমাদের শিক্ষকরা ছিলেন পাঠদানে খুবই গতানুগতিক।আনন্দময় পরিবেশ তৈরিতে তাঁদের ছিল সীমাবদ্ধতা।শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠুর শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে মেধা বিকাশের পথ কখনো কখনো রুদ্ধ করে তুলতেন তাঁরা।মেধা বিকাশে তাঁদের ভূমিকা যথেষ্ট সহায়ক ছিলোনা।

 

এই যে অন্ধ বিশ্লেষণ করে খুব দ্রুত উপসংহারে পৌঁছে যাই আমরা অনেকে, তা কতোটুকু যৌক্তিক এবং আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের জ্ঞান ও উচ্চমানের  পাঠদানের  ক্ষমতার প্রতি কতোটুকু সুবিচার প্রসূত উপলব্ধি । আমরা কি আমাদের সময়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং তাঁদের শিক্ষাদান পদ্ধতির নৈর্ব্যক্তিক ও নিরাসক্ত বিশ্লেষণে সক্ষম?

 

আমরা যারা সিলেট শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম, সময়ের প্রেক্ষিত বিবেচনা করে, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের  পাঠদানের কৌশল,শিক্ষাক্ষেত্রে সৃজনশীলতার বীজ বপনের প্রয়াস, পাঠদানের আন্তরিকতা,ছাত্রদের নিকট তাদের দায় বদ্ধতার বিষয়গুলো কখনো নিরাবেগ ভাবে ভেবে দেখেছি ? সময় যন্ত্র ব্যবহার করে কিংবা নিজেদের স্মৃতিকে শানিত করে ছাত্র জীবনে ফিরে গেলে আমরা দেখবো, সাধারণীকরণ করে তাঁদের কে গতানুগতিক ও কম সৃষ্টিশীল বলে বিবেচনা করা কতোটুকু অবিবেচনা প্রসূত চরম সিদ্ধান্ত।

 

আমার মনে আছে আমাদের অধিকাংশ শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা কঠোর আবরণের মধ্যে থাকলে ও তাঁদের হৃদয় ছিল কোমল। আমরা নিজেদেরকে খুবই ভাগ্যবান মনে করতে পারি, আমরা ছিলাম ষাট ও সত্তর দশকের প্রবাদ প্রতিম শিক্ষকদের ছাত্র। আমাদের শিক্ষকরা শুধু বৃহত্তর সিলেট পর্যায়ে নয় জাতিয় পর্যায়ের উচ্চমান সম্পন্ন শিক্ষকদের সমতুল্য। আমাদের শিক্ষকদের মানবিক গুন ছিল অতি উচ্চ পর্যায়ের। খুব সাধারন জীবন যাপন করে ও তাঁরা ছিলেন নিজ পেশায় অসাধারণ।আমদের অনেক শিক্ষককে দেখেছি অতি সাধারন লুঙ্গি বা ধুতি পরে স্কুলে উপস্থিত হতে।কোন শিক্ষকের বাড়িতে শ্রেণীকক্ষের মত আয়োজন করে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা দানের মানসিকতা তারা পোষণ করতেন না । তাঁদের অনেকেই দরিদ্র ছাত্রদের নিজ উদ্যোগে ক্লাসের সময়ের বাইরে অতিরিক্ত পাঠদান করতেন, মানবিক গুনের উৎকর্ষতা কোন পর্যায়ে থাকলে শিক্ষকরা নীরবে তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করতেন। আমার মনে হয় অপ্রস্তুত সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলনের এ যুগে এ ধরনের উদাহরণ বিরল।

 

সিলেট এই-ডেড হাইস্কুলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বারি মিয়া স্যারের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে জ্ঞান ছিল প্রশ্নাতীত। শক্ত আবরণের মধ্যে থেকে শিক্ষাদান করতেন বলে তার ক্লাসে পিনপতন নিরবতা পরিলক্ষিত হতো । স্যারের বিখ্যাত বকুনি কখনো আমাদের মনঃকষ্টের কারণ হত না বরঞ্চ এ গুলো ছিল আমদের বিনোদনের খোরাক। অবাক হতাম, যে বারি মিয়া স্যারের ভয়ে ক্লাসে কম্পমান ছিলাম, সেই স্যারকেই সামাজিক অনুষ্ঠানে অনেক স্নেহ পরায়ণ মনে হত। এরকম প্রবাদ প্রতিম শিক্ষক ছিলেন এই-ডেড হাইস্কুলের অবনী বাবু স্যার। তাঁর গনিত বিষয়ে জ্ঞান ও পাঠদান ছিল অতুলনীয়। পরবর্তীতে অবনীবাবু স্যার এই-ডেড হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মইন উদ্দিন স্যার বিজ্ঞানে এ ছাড়া লতিফস্যার, মানসবাবু স্যার, রশিদ স্যার নিজ নিজ বিষয়ে ছিলেন অতুলনীয়। যেহেতু আমি মাধ্যমিক পর্যায়ে এই-ডেড হাইস্কুলের ছাত্র ছিলাম তাই উদাহরণ হিসাবে এই স্কুলের শিক্ষকদের কথাই উল্লেখ করলাম। সিলেট শহরের অন্যান্য স্কুলে ও সমমানের শিক্ষক রা ছিলেন যাদের জ্ঞান,  পাঠদানের মান, মানবিক গুণাবলী ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের।

 

আমরা কি খুব নিরানন্দ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করেছি আমাদের শ্রেণীকক্ষে ?  আমার সব সহপাঠীরা জানেন আমাদের শিক্ষকরা প্রায়ই সঙ্গীত চর্চা করাতেন ক্লাসের ফাকে ফাকে। ক্রীড়া অনুশীলন, আন্ত স্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল আমাদের সময়ের শ্রেণি বহির্ভূত নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ । ক্রীড়া শিক্ষকরা নিজেদের স্কুলের বাইরে ও ছিলেন সমান জনপ্রিয়। এই-ডেড হাই স্কুলের মানস বাবু স্যার, সিলেট সরকারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের মান্নান স্যার ও রাজা স্কুলের খালেখ স্যার ছিলেন বৃহত্তর সিলেটে সুপরিচিত ও সম্মানিত।

 

আমদের শিক্ষকদের পাঠদান এতোই কার্যকরী ও ফলপ্রসূ ছিল যে তাঁদের শিক্ষার্থীরা তাই আজ সর্বক্ষেত্রে সফল। দেশ ও দেশের বাইরে আমাদের সহপাঠীরা আজ নেতৃত্ব দিচ্ছে সকল উল্লেখ যোগ্য পেশায়! শিক্ষা, সমাজ সেবা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, আইন পেশা,আন্তর্জাতিক সংস্থা, রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতৃত্ব সর্ব ক্ষেত্রে
যোগ্যতার মাধ্যমে সফলতার উদাহরণ হয়ে আছেন আমাদের সহপাঠীরা। এ সফলতা হচ্ছে আমাদের প্রাণ প্রিয় শিক্ষকদের অক্লান্ত শ্রম, মেধা ও নিবেদিত শিক্ষা প্রদানেরই ফলাফল।

 

ক্ষুদ্র পরিসরের এ বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে আমাদের শিক্ষকরা কতটুকু নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন পাঠদানে,তাঁরা কখনো সীমাবদ্ধ সৃজনশীল ছিলেন না । মেধায়, জ্ঞানে,নিবেদনে, মানবিক গুণাবলীতে তাঁরা ছিলেন ছাত্রদের কাছে উৎসাহব্যঞ্জক উদাহরণের মত।


আমাদের সময়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের উল্লেখিত জ্ঞান, দক্ষতা, মানবিক গুণাবলীর সাথে পরিকল্পিত সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থাই পারে মানবিক গুণাবলি সমৃদ্ধ প্রকৃত শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে। আমদের সময়ের শিক্ষকরা হতে পারেন এ বপারে ভবিষ্যৎ শিক্ষকদের রোল মডেল বা অনুসরণয় ব্যক্তিত্ব।  প্রজন্মান্তরে আমাদের সময়ের শিক্ষকরা জীবনের জয়গানে উদ্বুদ্ধ করবেন এবং প্রতিটি ছাত্রকে উদ্দীপ্ত করে তুলবেন যারা এগিয়ে যাবে পরস্পরের সুখ দুঃখে হৃদয়ের টানে। আমরা সে সময়ের প্রতীক্ষায়।

 

( ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০১৭ ইংরেজি, রেইন বো গেস্ট হাউস, সিলেটে অনুষ্ঠিত, সিলেটের সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১৯৭৬ বাচের শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলন অনুষ্ঠানের জন্য লিখিত)

- লেখক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত