শীতের তীব্রতা কিছুটা কমেছে

../news_img/58152 mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই শীতে তীব্রতা কিছুটা কমেছে। আজ মঙ্গলবার সকালে সূর্যের মুখ দেখা গেলেও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে।
 

এর আগে সোমবার দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড পাওয়া গেছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। সেখানে ব্যারোমিটারে তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ৭০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

শৈত্যপ্রবাহের কারণে তীব্র শীতে কাঁপছে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দিনাজপুরসহ দেশের উত্তরের জনপদ। প্রচণ্ড শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দেখা দিয়েছে শীতজনিত বিভিন্ন রোগবালাই।

এর আগে সর্বশেষ তীব্র শীত পড়েছিল ১৯৬৮ সালে। ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। এরও ২০ বছর আগে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত এত কম তাপমাত্রার রেকর্ড খুঁজে পায়নি আবহাওয়া অফিস।

তবে দেশবাসীর জন্য কিছুটা হলেও সুসংবাদ জানাচ্ছে বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি)। সংস্থাটি বলেছে, আজ মঙ্গলবার ও কাল বুধবার পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি থাকতে পারে। এর পর তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে। তখন শৈত্যপ্রবাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। তবে শীতের অনুভূতি থাকবে।

এ নিয়ে সাত দিন ধরে চলছে শৈত্যপ্রবাহ। এতে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। তবে সোমবারের তীব্র শৈত্যপ্রবাহ যেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য চরম রুদ্ররূপ নিয়ে আসে।

কেননা এর আগে এ মাত্রার শীত পড়েনি এ দেশে। ভয়ংকর এ পরিস্থিতিতে মানুষের জবুথবু অবস্থা। অনেকটাই বিপর্যস্ত জনজীবন। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। এই শীতে বেশি ভুগছে বয়স্ক ও শিশুরা।

শীতে বোরো ও আলুর ফলনে প্রভাব পড়েছে। শীতে স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতেও প্রভাব পড়েছে। রাজধানীর কোনো কোনো স্কুলে সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এদিকে উষ্ণতার জন্য গরম কাপড়ের কদর বেড়েছে। ভিড় দেখা গেছে শীতবস্ত্রের দোকানগুলোয়। বিভিন্ন বয়সের মানুষের শীতজনিত নানা রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে হাসপাতালগুলোয় অসুস্থ রোগীর ভিড় বাড়ছে। শীত ও শীতজনিত রোগে গত সাত দিনে (সোমবার পর্যন্ত) ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু সরকারি হিসাবেই ৬০৬ জন আক্রান্ত হয়েছে।

শীতের এমন রুদ্ররূপকে জলবায়ু পরিবর্তনেরই আরেক কুফল বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে স্মরণকালের সবচেয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ চলছে।

বিএমডির আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ছয় কারণে এই ‘অতিতীব্র’ শৈত্যপ্রবাহ চলছে। উচ্চবলয় বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত।

তা ছাড়া মাঝরাত থেকে দুপুর পর্যন্ত কখনও বিকাল ৩টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত থাকে দেশ। ভূপৃষ্ঠ থেকে আকাশের দিকে প্রায় ২০০ মিটারের একটি কুয়াশাস্তর ছিল। এর কারণে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে আসতে পারেনি।

ফলে ভূপৃষ্ঠ এবং এর সংলগ্ন বাতাসের উষ্ণতা বাড়তে পারেনি। তা ছাড়া ভারতের হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের তাপমাত্রা অনেক কম। শীত মৌসুমে সাধারণত ওইসব এলাকা (উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক) থেকে বাংলাদেশমুখী বাতাসের গতি থাকে।

সেটিও শীতল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেঘমুক্ত আকাশ। সাধারণত আকাশ মেঘলা থাকলে বিকিরণ প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠ শীতল হতে সময় লাগে। তাপমাত্রা ভূপৃষ্ঠে বেশিক্ষণ থাকতে পারে। ফলে ধরণী শীতল হতে না হতেই নতুন দিনে সূর্যের আগমন ঘটে।

ফলে মেঘমুক্ত আকাশ ধরণীকে দ্রুত শীতল করে। পাশাপাশি দীর্ঘ-রজনী সূর্যের আগমন বিলম্বিত করে। এসব কারণ উপস্থিত থাকায় ঊর্ধ্ব আকাশের বাতাসের গতির জেট এক্সট্রিম (শীতল বাতাসের লাইন বা যেখানে তাপমাত্রা জিরো ডিগ্রি) নিচে (ভূপৃষ্ঠের দিকে) নেমে এসেছে।

এটি সাধারণত ৬০০-৭০০ হেক্টর স্কেলের মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু সেটি আরও অন্তত একশ হেক্টর নিচে নেমে এসেছে। সর্বোপরি রোববার রাতে বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ কম ছিল। ফলে দ্রুত তাপমাত্রা কমে আসে। এসব কারণ মিলিয়েই বাংলাদেশে শীতের প্রকোপ বেড়েছে।

চলছে ‘অতিতীব্র’ শৈত্যপ্রবাহ। সোমবার বিকালে বিএমডির কর্মকর্তা ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, শীতের প্রকোপ উত্তরাঞ্চলে বেশি থাকলেও রাজধানীতে কম শীত ছিল না।

সোমবার ঢাকায় তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে। দিনেও তাপমাত্রা বাড়েনি। এর আগে ১৯৬৪ সালের ১৮ ও ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল। সেই তুলনায় অবশ্য শৈত্যপ্রবাহ ঢাকায় তীব্ররূপ ধারণ করেনি। নগরায়ণের কারণেই এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তাকে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বলে। তাপমাত্রা যদি ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামে, তবে তা তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। আর ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে বলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ।

এ হিসাবে দেশের বেশিরভাগ স্থানে বর্তমানে শৈত্যপ্রবাহ বইছে। এবারের এ শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে ২ জানুয়ারি। তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার সারা দেশে শীত পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আগামীকাল নাগাদ পরিস্থিতি এমনই থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া বিভাগের (বিএমডি) কর্মকর্তারা।

এদিকে শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কুয়াশার প্রকোপ। শীতে রাস্তাঘাটে লোক চলাচল কমে গেছে।

বিএমডির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টাঙ্গাইল, শ্রীমঙ্গল ও চুয়াডাঙ্গাসহ রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ওপর দিয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলসহ ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগের অবশিষ্ট অংশের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বইছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মধ্যরাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়েছে। তা কোথাও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগরে অবস্থানরত লঘুচাপটি বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে।
0Shares