হত্যা ও সশস্ত্র মহড়ায় তটস্থ টিলাগড়

../news_img/58154 mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক ::  রাজা গৌড়গোবিন্দের গড়ের টিলা থেকে ‘টিলাগড়’ এলাকার নামকরণ। সিলেট নগরের একটি উপকণ্ঠ। সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের মোড়। এক পাশে রয়েছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ ও সরকারি কলেজ। অপর পাশে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য টিলাগড় এলাকার বিভিন্ন মহল্লার রয়েছে শিক্ষার্থীদের মেসবাড়ি। অন্তত ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর বসবাস এখানে। টিলাগড় ঘিরে ছাত্রসংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা তাই নতুন কিছু নয়। সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে অস্ত্রের মহড়ার জের ধরে গত রোববার রাতে ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ঘটেছে আরও তিনটি হত্যাকাণ্ড। অবৈধ অস্ত্রের প্রকাশ্য মহড়া হয়েছে আরও দুটি। একের পর এক ঘটনায় যেন সন্ত্রস্ত টিলাগড়।

রোববার মধ্যরাতে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, তানিম খানের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন তাঁর স্বজন ও সহপাঠীরা। কান্নার মধ্যেই হাতের মুঠোফোনে একটি ছবি দেখালেন কামরুল ইসলাম চৌধুরী। ছবিটি ৫ জানুয়ারি প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ছাপা হওয়া এক অস্ত্রধারীর। কামরুল বলেন, ‘ঘটনার পিঠে ঘটছে ঘটনা। সর্বশেষ এই ছবির অস্ত্রধারী যদি ধরা পড়ত, তাহলে আজকে লাশ পড়ত না।’ বিলুপ্ত জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন কামরুল। তাঁর কান্না ছড়িয়ে পড়ে আর সবার মাঝে।

সিলেট নগরের টিলাগড়কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের এক পক্ষে সক্রিয়তা ছিল তাঁর। তানিম হত্যার ঘটনা ৪ জানুয়ারি সশস্ত্র মহড়ার জের ধরে ঘটেছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এ জন্য নগর আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক, সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমানের অনুসারী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দায়ী করা হচ্ছিল।

আগের রাতে হত্যা, পরদিন থমথমে ভাব নিয়ে গতকাল সোমবার সকাল হয় টিলাগড়বাসীর। প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে টিলাগড়ের একটি স্থাপনা ঘিরে কিছু উৎসুক মানুষের জটলা দেখা যায়। পুলিশও ছিল আশপাশে। একজন রিকশাচালক দেখিয়ে দিলেন রোববার রাতে টিলাগড় মোড়ের যে স্থানে তানিম খুন হয়েছিলেন, সেই স্থানটি। পথচলতি মানুষের একজন এমসি কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। খেদের সুরে বললেন, ‘অস্ত্রের মহড়া হলে এই জায়গায় লোড-আনলোড চলে। আবার প্রাণসংহারও হয়। আমাদের সময়ের ছাত্র উদয়েন্দু সিংহকে এখানেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।’

মণিপুরি ছাত্র উদয়েন্দু সিংহ ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ছাত্র উদয়েন্দু মুক্তিযোদ্ধা বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন। ২০১০ সালের ১২ জুলাই দুপুর বেলা তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করেছিলেন ছাত্রলীগেরই একদল কর্মী। একের পর এক ঘটনা ঘটেছে টিলাগড়ে। সূত্রপাত এমসি ও সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসের আধিপত্য নিয়ে।

জানা গেল, প্রকাশ্যে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া ও তিন খুনের ঘটনায় জড়িত টিলাগড় ছাত্রলীগ। যেখানে তানিম খুন হন, সেই একই স্থানে গত ১৬ অক্টোবর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়া ছাত্র ওমর মিয়াদ খুন হন। ওমর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ পক্ষের কর্মী ছিলেন। হিরণ জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকারের অনুসারী। ১৩ সেপ্টেম্বর টিলাগড়ে ছোট ভাইকে জিম্মি করে বড় ভাই জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুমকে শিবগঞ্জে এনে হত্যা করা হয়। মাসুম ছাত্রলীগের ‘সুরমা গ্রুপ’–এর কর্মী ছিলেন। এ ঘটনায় হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগ ক্যাডার টিটু চৌধুরী পলাতক। তিনি এমসি কলেজ ছাত্রাবাস ভাঙচুর মামলারও আসামি। উদয়েন্দু সিংহ, জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম, ওমর মিয়াদ ও সর্বশেষ তানিম খান—এ চার খুনের স্থান একটি এবং খুনিও একই বলে মন্তব্য করলেন আইন বিভাগে পড়াশোনা করা জেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আক্ষেপ একটাই, পুলিশ স্থান আর লোকগুলোকে চেনার পরও গ্রেপ্তার করতে পারে না। এ জন্য একের পর এক হত্যা, সন্ত্রাসও থামছে না।’

খুন ছাড়াও অস্ত্রবাজির ক্রমিক ঘটনাও ঘটেছে টিলাগড় এলাকায়। ২০১৩ সালের ১৯ মে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার ছবি ২০ মে প্রথম আলোয় ছাপা হওয়ার তিন বছর পর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন অস্ত্রধারী আবদুল হান্নান। এরপর ২০১৬ সালের ৭ মার্চ আরেক দফা অস্ত্রবাজি হয়। সেই অস্ত্রধারীরা শনাক্ত হয়নি প্রায় দুই বছরেও। সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশ হওয়া আলোচিত ছবির অস্ত্রধারীও গ্রেপ্তার হয়নি। ওই অস্ত্রধারী ছাত্রদলের উপশহর এলাকার ক্যাডার ও সংঘর্ষের সময় ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহৃত হন বলে অভিযোগ ছাত্রলীগের।

তানিম খুনের পর রোববার রাতে হাসপাতালে কথা বলেন সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার বাসুদেব বণিক। অস্ত্রধারী ধরা না পড়ায় হত্যার ঘটনা ঘটছে—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘আপাতত সব অভিযোগ নিয়েই আমরা মাঠে তৎপর আছি। এবার নিশ্চয়ই আর কেউ পার পাবে না।’- প্রথম আলো