এবার টার্গেটে নিউ ইয়র্ক পুলিশের মুসলিম অফিসাররা

../news_img/58182 mmm.jpg

মনির হায়দার, নিউ ইয়র্ক থেকে :: ডনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকায় ঘৃণা-বিদ্বেষের বাড়বাড়ন্ত দিনদিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এবার উগ্রবাদীদের ঘৃণার টার্গেটে পড়েছেন ঐতিহ্যাবিাহী নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এনওয়াইপিডি) মুসলমান অফিসাররা। নগরীর একটি পুলিশ স্টেশনের ভেতরেই কয়েকজন পুলিশ অফিসারের ব্যক্তিগত লকারের কে বা কারা লিখে রেখে গেছে মুসলিম-বিদ্বেষী উগ্র ঘৃণাবার্তা। বিষয়টি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে নিউ ইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষকে। তারা বিশেষ তৎপর হয়েছেন ঘটনার হোতাদের দ্রুত চিহ্নিত করতে। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তদন্ত।


তবে এ ধরনের অন্যসব ঘটনার মতো এ ব্যাপারেও পুরোপুরি নির্বিকার রয়েছেন নিউ ইয়র্কে জন্ম নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড জে. ট্রাম্প। এনওয়াইপিডির সূত্রগুলো জানিয়েছে, মোট ৫ জন অফিসারের লকারে পাওয়া গেছে ঘৃণাবার্তার চিরকুট। এরমধ্যে ৪ জনই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। অবশ্য চার বাংলাদেশির মধ্যে একজন অমুসলিম অফিসার রয়েছেন বলেও জানা গেছে।

এদিকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা বিশ্বখ্যাত নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ভেতরেই নজিরবিহীন ঘৃণাবার্তা ছড়ানোর ঘটনা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও এবং পুলিশ কমিশনার জেমস পি. ও’নেইল। কারণ, ধর্মীয় ও বর্ণগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ার পটভূমিতে নিউ ইয়র্ক নগরীর বাসিন্দাদের হেটক্রাইম বা ঘৃণাজনিত অপরাধের হাত থেকে বাঁচানোর দায়িত্বে এনওয়াইপিডি। মেয়র ও পুলিশ কমিশনার প্রায় নিয়মিতভাবেই নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে থাকেন, তারা যেন যেকোনো ধরনের হেটক্রাইম বা বিদ্বেষপ্রসূত ঘটনার ব্যাপারে দ্রুত পুলিশে খবর দেন। কিন্তু এই ঘটনায় প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে যে, খোদ এনওয়াইপিডি’র মুসলিম অফিসাররাই যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজ বাহিনীর অভ্যন্তরে ঘৃণা-বিদ্বেষের শিকার সেখানে তারা কীভাবে অন্যদের বাঁচাবেন। যদিও ঘটনার পরপরই নগরীর মেয়র, পুলিশ কমিশনার, নগর পার্লামেন্টের স্পিকার, পাবলিক অ্যাডভোকেট এবং সিটি কম্পট্রোলার সরাসরি এনওয়াইপিডি মুসলিম অফিসার্স সোসাইটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আশ্বাস দিয়েছেন ঘটনার হোতাদের দ্রুত খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের। তার পরও এ ঘটনায় মুসলিম অফিসারদের উদ্বেগ ও বিস্ময় যেন কাটছে না।


প্রসঙ্গত, নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ৩২ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে মুসলিম কর্মকর্তার সংখ্যা ১১ শ’র কিছু বেশি। এরমধ্যে একক সর্বাধিক সংখ্যক ২৬০ জন মুসলিম অফিসার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। অবশ্য বাংলাদেশি অরিজিনি বেশ কয়েকজন অমুসলিম পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন এনওয়াইপিডিতে এবং ঘৃণাবার্তার চিরকুট পাওয়া চার বাংলাদেশি কর্মকর্তার মধ্যে একজন প্রকৃতপক্ষে অমুসলিম। এছাড়া নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের আওতাধীন ট্রাফিক এনফোর্স এজেন্ট পদে এবং স্কুল সেফটি ইউনিটের বিভিন্ন পর্যায়ে আরও অন্তত হাজারখানেক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।


সোমবার স্থানীয় মূলধারার দৈনিক পত্রিকা ডেইলি নিউজে প্রকাশিত এক খবরের মাধ্যমে দেশের মানুষ জানতে পারেন যে, নিউ ইয়র্ক নগরীর ব্রোঙ্কস কাউন্টিতে অবস্থিত পুলিশের ট্রানজিট ডিস্ট্রিক্ট-১১ (ইয়াঙ্কি স্টেডিয়াম এলাকা) এর কয়েকজন মুসলিম অফিসারের লকারে গত শনিবার রাতে উগ্র মুসলিম বিদ্বেষী ঘৃণাবার্তা (হেইট ম্যাসেজ) লেখা চিরকুট পাওয়া গেছে। পুলিশ স্টেশনটির ভেতরেই এমন ঘটনা কে বা কারা ঘটাতে পারে সেই প্রশ্নে তোলপাড় শুরু হয় সর্বত্র। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো ওই পুলিশ স্টেশনের প্রধান বা কমান্ডিং অফিসার হলেন জহির আজিজ, যিনি নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিও বা স্টেশন প্রধান। ঠিক তার স্টেশনেই এমন ঘটনা বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক বলেও সন্দেহ করছেন কেউ কেউ।
অবশ্য ঘটনার পরপরই এনওয়াইপিডি’র হেইট ক্রাইম ইউনিটের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে এবং ঘটনার হোতাদের দ্রুত চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ প্রধান। সোমবার সন্ধ্যায় এনওয়াইপিডি মুসলিম অফিসার্স সোসাইটির প্রেসিডেন্ট আদিল রানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানা গেছে যে, খবরটি প্রকাশ হওয়ার পর সোমবার নগরীর মেয়র, পুলিশ কমিশনার, সিটি পার্লামেন্টের স্পিকার, পাবলিক অ্যাডভোকেট এবং সিটি কম্পট্রোলার সরাসরি সোসাইটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সাহস যুগিয়েছেন এবং আশ্বস্ত করেছেন দোষীদের খুঁজে বের করার ব্যাপারে। বিবৃতিতে আদিল রানা নগর কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ ঘটনায় আমরা খুবই হতাশ। তবে বাহিনী প্রধান জেমস পি. ও’নেইলের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং আমরা নিশ্চিত যে এ ধরনের ঘটনা সহ্য করা হবে না। তদন্তের মধ্য দিয়ে প্রকৃত দোষীরা চিহ্নিত হবে এবং তাদের বিরূদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আমরা জানি। বিবৃতিতে নগরীর মেয়র বিল ডি ব্লাজিও’র প্রতি আহ্বান জানানো হয় নগরীর ঐতিহ্য অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রের উপযুক্ত পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য। এ সময় আদিল রানা সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক ফায়ার ডিপার্টমেন্টের একজন মুসলিম সদস্য কেবলমাত্র তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সহকর্মীদের তারা নিগৃহীত হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না যে, ওই ধরনের ঘটনা নগরীর পুলিশ বাহিনীতেও ঘটুক। নিউ ইয়র্ক নগরী ও এখানকার পুলিশ বাহিনীর মহান দায়িত্ব হলো এই ঘটনার তদন্ত ও দোষীদের বিরূদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে নগরবাসীকে নিশ্চিন্ত রাখা। বিবৃতিতে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, কল্পনা করা যায় যে সাধারণ মানুষের অপরাধ তদন্ত এবং তাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরাই নিরাপদ নয়! বিবৃতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়। আদিল রানা বলেন, আমরা এমন এক শ্রেষ্ঠ নগরীর বাসিন্দা যেখানে ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলিম, হিন্দু ও শিখসহ আরও বিভিন্ন ধরনের মানুষ একসঙ্গে সব ধরনের ছুটি ও বৈচিত্র্য উপভোগ করি। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে এবং সঠিক বোঝাপড়ার মধ্যদিয়ে নগরীকে একই ধারায় এগিয়ে নিতে তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান।


বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো: হুমায়ন কবির মানবজমিনকে বলেন, নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ঐতিহ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এই ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। তবে পুলিশ কমিশনার জেমস পি. ও’নেইল এবং মেয়র বিল ডি ব্লাজিওসহ নগর কর্তৃপক্ষের সব শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা নিশ্চিত যে ঘটনার হোতারা চিহ্নিত হবে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের কোনোই সন্দেহ নেই যে, এনওয়াইপিডি তথা নিউ ইয়র্ক নগরী তার ঐতিহ্যের ধারায় শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখেই এগিয়ে যাবে, যেখানে অপরাধীরা কখনও পার পেয়ে যায় না। এম জমিন