মালয়েশিয়ায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন বাংলাদেশিরা

../news_img/58188 mmm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: অজপাড়া গাঁয়ের যে ছেলেটি ভাগ্য অন্বেষণের লক্ষ্যে বৈধ বা অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় এসেছিল। আজ সেই ছেলেটি মালয়েশিয়ায় একজন সফল বাংলাদেশি। মালয়েশিয়ায় এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন যাদের প্রথম পর্বের ইতিহাস খুবই কষ্ট অপমান বিজড়িত স্মৃতি। তাদেরই একজন শরীয়তপুরের অজপাড়া গাঁয়ের ছেলে মো. নীরব হোসেন।
 

নীরব হোসেনের মতো অনেকে মালয় ভাষা না জানার কারণে মালিকের বকাঝকা, থাপ্পড় খেয়েছেন, তারা আজ অনর্গল মালয় ভাষা বলতে পারেন। যে ছেলেটি দিনরাত প্লান্টেশনে বা কনস্ট্রাকশনে কাজ করে হাত লোহা করে ফেলেছেন। আজ তিনি হয়তো একটি মিনি মার্কেট বা রেস্টুরেন্ট অথবা একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক। তার প্রতিষ্ঠানেই হয়তো ১০-১২ জন মালয়েশিয়ান লোক চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

দেশটির রাজধানী কুয়ালালামপুর বা আশপাশের শহরগুলোতে চোখে পড়ে বাংলাদেশি বহু প্রতিষ্ঠান। যারা তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন প্রবাসে স্বপ্নের পৃথিবী। প্রকৃত অর্থে তাদের জন্যই স্বার্থক এ পরবাস। ধৈর্য ধরে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তারা চলেছেন সঠিক পথে।

শুধু তাই নয়, মালয়েশিয়ায় মাল্টিমিডিয়া কোম্পানি, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন ব্যাংক বিমা প্রতিষ্ঠানে বহু বাংলাদেশি চাকরি করছেন ঈর্ষণীয় পদে। যশ সম্মান, খ্যাতি ছড়িয়ে তারা উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। শুধু শ্রমজীবী প্রবাসীই নন, বাংলাদেশের ছাত্ররাও তাদের স্বকর্মে প্রতিভায় অধিষ্ঠিত আছেন বিশাল দায়িত্বে। এমনকি মালয়েশিয়ার বহু উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নীতিনির্ধারকের ভূমিকাও পালন করছেন বাংলাদেশিরা।

শরীয়তপুরের অজপাড়া গাঁয়ের ছেলে মো. নীরব হোসেন তার একক যোগ্যতায় এক বৃটিশ বন্ধুর অনুপ্রেরণায় মালয়েশিয়ার মাটিতে কৃষিকাজ করে সাফল্য অর্জন করেছেন। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের উঁচু পাহাড় ঘেরা গেন্তিং হাইল্যান্ড এলাকায় সবজি ফার্ম করে তিনি এখন স্বাবলম্বী।

বুধবার কথা হয় নিরবের সঙ্গে। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ থানার মনুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী আব্দুল আজিজের একমাত্র ছেলে মো. নীরব হোসেন। ২০০১ সালে উচ্চশিক্ষা অর্জনে পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। হোটেল ম্যানেজমেন্টে শুরু করেন পড়াশোনা। এর পাশাপাশি একটি রেস্টুরেন্টে পার্টটাইমের চাকরি নেন।

চাকুরির সুবাদে পরিচয় হয় ব্রিটিশ নাগরিক অ্যালেস্টারের সঙ্গে। দুজনই একটি থ্রি-স্টার রেস্টুরেন্টে চাকুরি করতেন। নীরবের ইচ্ছা ছিল মালয়েশিয়া থেকে পড়াশোনা শেষ করে ইউরোপের ভালো কোনো দেশে পাড়ি জমানো। কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিকের পরামর্শে থেকে যান মালয়েশিয়ায়। তিনিই মূলত নীরব হোসেনকে পরামর্শ দেন মালয়েশিয়াতে সবজি ফার্ম করার। সেই থেকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নীরব।

এদিকে কলেজে পড়ার সময়ে পরিচয় হয় মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্যের রয়েল পরিবারের তরুণী ফাতেমা বিনতে ইসমাইলের সঙ্গে। একদিন ক্লাস শেষে ফাতেমার কাছে তার স্বপ্নের কথা বলতেই ফাতেমা তাকে গ্যান্টিং হ্যায়ল্যান্ডে তাদের নিজেদের জমির কথা বলেন এবং তার বাবা মোহাম্মদ ইসমাইল উদ্দীনের সঙ্গে পরিচয় করে দেন।

মালয়েশিয়াতে ব্যবসা শুরু করতে লোকাল লোকের প্রয়োজন। যার নামে থাকবে অফিসিয়াল কাগজপত্র। আর এই দিক থেকে সকল সহযোগিতা করেন ইসমাইল উদ্দিন। আকার হাসিল এসডি এন. বিএইসডি নামক কোম্পানির তত্ত্বাবধানে সালাদ (সবজি )ফার্মের নাম দেন গেন্টিং গ্রীন গার্ডেন। রাজধানী কুয়ালালামপুর শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরে মাটি থেকে ৮৫০ মিটার ওপরে পাহাড়ের ওপর গেন্টিং নামক স্থানে ১০ একর জমি থাকলেও ৫ একর জমির মধ্যে স্থাপন করেন সবজি বাগান। বাগানে উৎপাদিত হয় বিশ্বমানের কয়েক প্রকার সালাদ পাতা। যার মধ্যে রয়েছে লেটুস পাতা, লোল্লো বিয়ানদো, রেডিসচিও, ওয়াটারক্রেস,বাটার লেটুস, রকেট/আরুগুলা, রেড ওরাস, গ্রীন রোমাইন, ড্যান্ডেলিয়নের পাতা।

উৎপাদিত এসব সালাদ মালয়েশিয়ার ফাইভ স্টার হোটেল, কেএফসি, ম্যাকডোনালস, নান্দুস, স্টারহাবের মতো বড় বড় সুপারশপ প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সিংগাপুর এবং দুবাইতে রফতানি করা হয়। ফার্মে ব্যবহারিত সব প্রকার বীজ থেকে শুরু করে ইকিউইপমেন্ট সবই জার্মান থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে এবং ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়।

নীরব হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে তার ফার্মে সাতজন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করে থাকেন। তারাই মূলত ফার্মটির দেখভাল করে থাকেন। আমি যখন অন্যান্য দেশে ব্যবসার জন্য যাই তখন তারা নিজ দায়িত্বে ফার্মটি দেখাশোনা করেন।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে তিনি জার্মান, ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়িক সফর করেছেন। যার মধ্যে নেদারল্যান্ডের এনজা কোম্পানি, টোকিওর সাকাতা ও জার্মানির বায়ার নামক ৩টি নাম করা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। আগামী জুন মাসে তিনি নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেবেন। সেখানে তিনি নিজস্ব সালাদ ফার্মেও ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন।

এদিকে নীরব হোসেন ওয়ার্ল্ড তাইকোন্ড ফেডারেশন দক্ষিণ কোরিয়া মার্শালআটে ব্লাকবেল্ট প্রাপ্ত।

সফল এ ব্যবসায়ী ২০১৬ সালে এই ব্যবসায়ী পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং জীবনের নতুন ইনিংস শুরু করেন। নীরব হোসেন নিজেকে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি কৃষক বলতে গর্ববোধ করেন।

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় কয়েক পর্বে বাংলাদেশিদের আগমন ঘটে। ব্রিটিশ শাসনামলে অনেক বাংলাদেশি পেশাজীবী এ দেশে আসেন। তারপর স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সত্তর দশকে কিছু বাংলাদেশি কৃষিকাজে মালয়েশিয়ায় যান। আশির দশকে অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, ছাত্র আসতে থাকেন, নব্বই দশক থেকেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে দেশের প্রশাসনিক কাজে যোগ দেন শত শত বাংলাদেশি। এদের মধ্য থেকে অনেকে আজ সফল বাংলাদেশি হিসেবে সে দেশে সম্মানের সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন।