কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন দেড় দশক পর চালুর লক্ষ্যে শীঘ্রই শুরু হচ্ছে পুনর্বাসনের কাজ

../news_img/58325 mmm.jpg

লিটন শরীফ, বড়লেখা (মৌলভীবাজার)::  দেড় দশক বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে রেল লাইনের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনে পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে। পুনর্বাসনের কাজ শুরু লক্ষ্যে সম্প্রতি রেলওয়ের একটি উচ্চতর প্রতিনিধি দল রেল লাইন পরিদর্শন করে গেছেন। 

২০০২ সালে এ রেল লাইনটি বন্ধ হয়েছিল। কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই চালুর দাবিতে এলাকাবাসী আন্দোলন করে আসছেন। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চুরি হয়েছে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল পথের নাট-বল্টুসহ রেলের মূল্যবান লোহার পাত। মাটিচাপা পড়েছে স্লিপারের কাঠ, খেয়েছে উইপোকায়। সংস্কারের অভাবে রেললাইনের ছয়টি স্টেশনের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বেহাত হয়েছে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার সম্পদ। গত ১৬ বছর ধরে বন্ধ থাকায় এ রল লাইনের অনেক মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে। প্রাণচাঞ্চল্যহীন হয়ে পড়ে রেল লাইনের ছয়টি স্টেশন।

রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৫ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অংশ হিসেবে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন চালু হয়েছিল। বড়লেখা উপজেলার লাতু সীমান্ত দিয়ে কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন হয়ে আসাম রেলওয়ের ট্রেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আসা যাওয়া করতো। কুলাউড়া-শাহবাজপুর লাইনে চলাচলকারী ট্রেনটি এলাকাবাসীর কাছে ‘লাতুর ট্রেন’ নামে পরিচিত ছিল। প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনে রয়েছে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা। এই অঞ্চলের মানুষ কম খরচে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের জন্য লাতুর ট্রেনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। রেল লাইন রেল চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ায় রেল লাইন সংস্কার না করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ২০০২ সালের ৭ জুলাই লাইনটি বন্ধ করে দেয়। ট্রেন বন্ধ থাকায় প্রাণচাঞ্চল্যহীন হয়ে পড়ে জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলি, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর এই ছয়টি রেল স্টেশন। এদিকে ট্রেন চালুর দাবিতে ট্রেন লাইন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখার মানুষ সিলেট বিভাগ উন্নয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন ব্যানারে সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন করেন।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে মহাজোটের প্রার্থী মো. শাহাব উদ্দিন (বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ) অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল বিজয়ী হলে কুলাউড়া-শাহবাজপুর ট্রেনলাইন চালু করবেন। তখন নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থী মো. শাহাব উদ্দিন। এরপর ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক বৈঠকে বাংলাদেশ রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্প পাস হয়। এই প্রকল্পে রেললাইন পুননির্মাণ, রেলস্টেশনের ভবন সংস্কার, সংকেত-ব্যবস্থার উন্নতিসহ ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ১১৭ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এটির পুনর্বাসন কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে এ প্রকল্পটি তখন আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর ২০১৩ সালের ৯ নভেম্বর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বড়লেখা সফরকালে বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত জনসভায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য মো. শাহাব উদ্দিন রেল লাইন চালুর দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে রেল লাইন চালুর ঘোষণা দেন।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল লাইন পুনর্বাসন ও চালুর লক্ষ্যে গত ১৩ জানুয়ারি রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হাইর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রেল লাইন পরিদর্শন করে গেছেন। এখন লাইনে কাজ শুরু হওয়ার পালা। জানুয়ারির শেষদিক অথবা ফেব্রুয়ারির শুরুতে কাজ শুরু হবে। ট্রেন লাইন পুনর্বাসনে খরচ হবে ৬৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এরমধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিবে ১২২ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ভারত সরকার দিবে ৫৫৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ৪৪ দশমিক ৭৭ কিলোমিটারের পুরোটাই দ্বৈত গেজ লাইনে পুনর্বাসন করা হবে। এরমধ্যে সাত দশমিক ৭৭ কিলোমিটার লুপ লাইনের (ট্রেন দাঁড়ানো ও ক্রসিংয়ের জন্য লাইন) কাজ হবে। ট্রেন লাইন পুনর্বাসনের পাশাপাশি ছয়টি স্টেশনের মধ্যে জুড়ী, দক্ষিণভাগ, বড়লেখা ও শাহবাজপুর বি শ্রেণি এবং কাঁঠালতলি ও মুড়াউল স্টেশন ডি শ্রেণিতে পুনসংস্কার করা হবে। ভারতীয় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পুনর্বাসনের কাজ করবে। এই রেললাইনটি চালু হলে কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত প্রতিদিন পাঁচটি ট্রেন চলাচল করবে। লোকাল ট্রেন ছাড়াও আন্তঃনগর ট্রেন চলবে। পরবর্তী সময়ে ভারতের সাথে কানেকটিভিটি ট্রেনও চলবে এ পথ দিয়ে। রেল লাইনটি চালু হলে লাইনের ছয়টি স্টেশনসহ কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনটি আরও প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠবে। কাজ শুরুর পর ২৪ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনের পুনর্বাসন প্রকল্প পরিচালক এবং রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পথ) মো. তানভিরুল ইসলাম মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) বিকেলে বলেন, ‘জানুয়ারির শেষ দিকে কাজ শুরু করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে রেল লাইন পুনর্বাসনের কাজ শুরু হবে। রেল লাইন চালু হলে এই লাইনে দেশের অভ্যন্তরের লোকাল ট্রেন ছাড়াও আন্তনগর ট্রেন চলাচল করবে।’