কালের সাক্ষী টাওয়ার অফ লন্ডন

../news_img/59253 mrini.jpg

পীযূষ কুরী :: একটি দুর্গকে যদি ইতিহাস এঁর পুস্তক নামে অভিহিত করা হয়, হয়তবা একটু বেমানান লাগে, তেমনই এক দুর্গ আছে লন্ডন শহরের কোল ঘেঁষে যার নাম হল ‘টাওয়ার অফ লন্ডন’। প্রায় হাজার বছরের পুরোনো রাজকীয় এই প্রাসাদ যা অনেক সময় দুর্গ ও কারাগার হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, ফলে হয়েছে ইতিহাস সমৃদ্ধ।   সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ রাজপরিবারের গহনা ও মনি-মাণিক্যের সংগ্রহশালা এবং বিশেষ আকর্ষণ বিখ্যাত হীরা ‘কোহিনুর” এঁর অবস্থানও এই দুর্গের সুরক্ষিত ভল্টে।

যথারীতি সঙ্গী হিসেবে পেলাম বাংলাদেশ থেকে আসা এক বন্ধুকে, যার অদম্য ইচ্ছাই একটা প্রবল কৌতূহল তৈরি করেছিল দুর্গের প্রতি। অনলাইনে টিকেট কাটার সময় না পেয়ে সোজা লাইনে দাঁড়িয়ে কিনে নেই ৪৪ পাউন্ড দিয়ে দুটি। অবশ্য বয়স ভেদে এই মূল্য একটু ভিন্ন, যেমন প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিট - ২২ পাউন্ড, অনূর্ধ্ব ১৬ এঁর জন্য ১১ পাউন্ড,  তাছাড়া শিক্ষার্থী, ডিসেইবল্ড, সিনিয়র সিটিজেন এঁর জন্য ১৮.৭০ পাউন্ড, ২ জন প্রাপ্তবয়স্ক ও ৩ জন শিশুর ফ্যামিলির প্রবেশ ফি ৫৯ পাউন্ড। গ্রীষ্মকালীন খোলা থাকে মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা, আর রোববার ও সোমবার সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ৫টা, সর্বশেষ প্রবেশ বিকেল সাড়ে ৫ টা। শীতকালে একটু পরিবর্তন হয় প্রবেশকালীন সময়ের।

ইতিহাসে আছে সম্রাট উইলিয়াম ১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে টেমস নদীর তীরে এই দুর্গ বানানোর আদেশ দিয়েছিলেন  যা ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রতিভূ স্বরূপ এবং সুরক্ষার প্রথম ও প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে পরিচয় বহন করবে। কালে কালে প্রতিটি রাজা বা রাণীর আদেশে এই দুর্গে কিছু না কিছু পরিবর্তন হয়েছে। মধ্যযুগীয় রাজাদের আমলে ‘টাওয়ার অফ লন্ডন’ ছিল বাসস্থান এর পাশাপাশি বহিঃশত্রু থেকে সুরক্ষার প্রথম স্তর।  আবার পরিবর্তন আসে টিউডর রাজত্বের সমকালীন সময়ে যখন মূলত অত্যাচার, শাস্তি, শিরোচ্ছেদের কেন্দ্র হিসেবে এই দুর্গকে ব্যবহার করা হয়। উনবিংস শতাব্দীর শেষের দিকে ১৯৮৮ সালে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ এর মনোনয়ন পাওয়া এই দুর্গে প্রায় ২লক্ষ এর অধিক পর্যটকের আগমন ঘটে প্রতি বছর।
লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই দুর্গে লন্ডন টিউব রেল বা বাসে করে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। টাওয়ার হিল স্টেশন এই দুর্গের কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো। আবার অল্ডগেট স্টেশন থেকে মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটলে ও পৌঁছে যাবেন এই দুর্গে। দুর্গের প্রবেশদ্বারের কাছেই বহমান টেমস নদী, নদীর বুকে টাওয়ার ব্রিজ এবং অপর প্রান্তে ইউরোপের উচ্চতম অট্টালিকা শার্ড সহ অনেক বহুতল দালান-কোটা।

প্রবেশ পথেই স্বাগত জানায় লাল রঙের পোষাক পরিহিত রাজরক্ষী। সবুজ ঘাসে ঢাকা পরিখা পেরিয়ে দ্বিতীয় তোরণ বেওয়র্ড। রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের শাসনামলে এই পরিখা এবং চারপাশের উঁচু দেওয়াল তৈরি হয়, এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট কারণে মোট ২১ টি টাওয়ার তৈরি করা হয়েছিল।

বেওয়ার্ড তোরণ এর বাম পাশে রয়েছে ‘বেল টাওয়ার’। এই ‘কার্ফু বেল‘ ৫০০ বছর বা তার ও অধিক সময় ধরে বেজেছে বন্দীদের নির্দিষ্ট জেলে ফেরার নির্দেশ দেবার জন্য। এখনও বাজে দুর্গ বন্ধ হওয়ার ১৫ মিনিট আগে, তবে বন্দীদের জন্য নয়, পর্যটকদের জানান দিতে। একটু এগোলেই ডানপাশে আছে সেন্ট থমাস টাওয়ার, ওয়েকফিল্ড টাওয়ার এবং ল্যানথর্ন টাওয়ার মিলে নির্মিত এক মধ্যযুগীয় প্রাসাদ যা তৃতীয় হেনরির শাসনকাল থেকে প্রথম এলিজাবেথের পূর্ব পর্যন্ত রাজপরিবারের সদস্যরা সাময়িক অবস্থানের জন্য ব্যবহার করেছেন এবং সেই রাজকীয় সুখ এবং সুরক্ষার জন্য সব রকাম ব্যবস্থা ছিল এই প্রাসাদে। সেন্ট থমাস টাওয়ার এ ঢোকার মুখেই নজরে পড়ে ‘ট্রেটারস্ গেট’ যার যোগসুত্র থেমস নদী থেকে সরাসরি দুর্গে এবং এই গোপন নদীপথ দিয়ে প্রথম এলিজাবেথ সহ সহ অনেক রাজবন্দীদের এই দুর্গে আনা হয়েছিল। এই টাওয়ারে প্রথম এডওয়ার্ড এর বিলাসবহুল জীবন যাপন এর পরিচয় পাওয়া যায়। 

এখানকার ওয়েকফিল্ড টাওয়ারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল ষষ্ট হেনরিকে এবং তাঁর নিজস্ব চ্যাপলে প্রার্থনা করার সময় তাকে হত্যা করা হয়। ল্যানথর্ন টাওয়ারের বাঁ দিকে সুদৃশ্য হোয়াইট টাওয়ার কিন্তু সেটি আর একটা দেয়াল ঘেরা, আর এই দুই দেয়ালের মাঝে নীচের দিকে তাকালেই নজরে আসে মধ্যযুগীয় রাজপোষাক পরা কর্মচারীরা দুর্গের ইতিহাসের কিছু ঘটনাকে সযত্নে অভিনয় করে দেখাচ্ছে। সুরক্ষার জন্য নির্মাণ করা পুর্ব দিকে অবস্থানরত সল্ট টাওয়ার, ব্রড আ্যরো টাওয়ার, কনস্টেবল টাওয়ার এবং মার্টিন টাওয়ার সহ সবগুলো ব্যবহৃত হয়েছে স্কটল্যান্ডের রাজা থেকে শুরু করে ক্যান্টরবেরী ক্যাথিড্রালের যাজক সহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বন্দী করে রাখা জেল হিসেবে। কনস্টেবল টাওয়ার একসময় প্রধান কনস্টেবল এর বাসস্থান ছিল যা সম্রাট উইলিয়ামের সময় থেকে কনস্টেবল পদটি এখনও অবধি বজায় রয়েছে এই দুর্গের প্রধান আধিকারিক হিসেবে।

বিচিত্র টাওয়ার অফ লন্ডন এ আছে প্রায় ৬০০ বছর ধরে লালন করা চিড়িয়াখানা যেখানে সারা পৃথিবী থেকে উপহার পাওয়া হাতি, ভাল্লুক, বাঘ, সিংহ, ক্যাঙারু সহ অনেক প্রাণী বর্তমানে  যাদের মডেল করে রাখা আছে এই দেওয়ালের পাশে।
একটা বিশাল সর্পিল লাইন দেখে বুঝলাম রত্নের দেখা মিলবে কিছুক্ষণের মধ্যেই এবং একটু এগোতেই দেখতে পেলাম নিথর হয়ে দাঁড়ানো এক রাজকর্মচারী। বিফীটার‘ নামে পরিচিত এই দুর্গের রক্ষী একদল সেনা অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে কুচকাওয়াজ করতে করতে উদয় হল। রাণীর মুকুট প্রায় ছটি রত্ন খচিত এবং শেষটিতে কোহিনুর থাকার কারণে মুকুটের শোভা অসামান্য। প্রতি বছর পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরুর দিন ‘স্টেট ইম্পিরিয়াল ক্রাউন’ নামে যে মুকুটটি রাণী পরেন তাতে মোট ৩০০০ মণি-মুক্তো রয়েছে এবং তার মধ্যে প্রধান হল বিখ্যাত ‘কালিনান হীরে’ এবং অপরটি এক বিশালাকৃতির চূণী যা ‘ব্ল্যাক প্রিন্সেস রুবি’ নামে খ্যাত। সংগ্রহশালায় রয়েছে রাজপরিবারের ব্যবহৃত অসংখ্য বহুমূল্য তরবারি, রাজ্যাভিষেকের সরঞ্জাম, সোনার ও রূপার বিশালাকৃতি প্লেট, গ্লাস, চামচ সহ প্রায় ১ মিটার চওড়া সোনার সুরাপাত্র!

এখান থেকে বের হয়ে ডানদিকে ‘ব্লাডি টাওয়ার’। পথে পড়ল টাওয়ার গ্রীণ – সবুজ ঘাসে মোড়া এক ফালি জমি যা দেখতে যতটা নিষ্পাপ তরতাজা, টিক ততটা রক্তাক্ত এর ইতিহাস। অতীতের শিরোচ্ছেদ উদ্যান নামে খ্যাঁত এই স্তানে  ইংল্যাল্ডের তিন রাণী অ্যান বোলিন, ক্যাথরিন হয়ার্ড ও লেডি জেন গ্রে কে হত্যা করা হয় নির্দিষ্ট সংখ্যক আমন্ত্রিত দর্শকের সামনে। প্রতিস্তার পর থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত বহু শাস্তির সাক্ষী এই টাওয়ার গ্রীণে সমাজের নামী দামীদের শিরেচ্ছেদ হত জনসাধারণের চোখের আড়ালে আর অনামীদের ভাগ্যে জুটত টাওয়ার ব্রীজের ঘাতকের হাতে মৃত্যু এবং শোনা যায় তাদের মাথা ঝোলানো থাকত টাওয়ার ব্রীজে দৃষ্টান্ত স্বরূপ।

হুবহু কাকের মত দেখতে কিন্তু আকারে বিশাল ৭টি ‘রাভেন’ বর্তমানে এই টাওয়ার গ্রীণের বাসিন্দা দ্বিতীয় চার্লসের সময় থেকে। কথিত আছে ‘যেদিন রাভেনরা টাওয়ার অফ লন্ডন ছেড়ে যাবে সেদিন ইংল্যন্ডের রাজত্ব ধ্বংস হবে’। তাই এই ৭ জন রাভেনের যত্ন আত্তির কোনো অন্ত নেই এই দুর্গে – খাবারের পাশাপাশি এক জন ‘রাভেন মাষ্টার’ ও আছেন এদের দেখাশোনার জন্য।

এই সবুজ মাঠের চারপাশে রয়েছে কুখ্যাত তিনটে টাওয়ার – ব্লাডি টাওয়ার, বিউক্যাম্প টাওয়ার ও লোয়ার উইকফিল্ড টাওয়ার যেখানে বন্দীদের অকল্পনীয় অত্যাচারের বেশ কিছু ভয়ানক উদাহরণ রাখা আছে। তবে অনেকেই তুলনামুলক স্বাধীনতার পাশাপাশি ভালো ব্যবহার ও পেয়েছেন তাদের বন্দীজীবনে। যেমন স্যার ওয়াল্টার রল্যে তাঁর বন্দী দশায় অনেক বৈঞ্জানিক পরিক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন, তেমনি ফ্রান্সের রাজা জন ও তাঁর বেশ কিছু পারিষদ নিয়ে বন্দী ছিলেন এই দুর্গে।
দুর্গের ভিতরে এক কল্পনার রাজ্যে ফিরে গিয়ে ছিলাম হাজার বছর আগে, এই ঘোরটা কাটল টাওয়ার অফ লন্ডন এর পাঁশে দাঁড়ানো জনতার কোলাহল দেখে। শুরু হল পথচলা আবার নতুন জানার সন্ধানে...