কান্নাও যেখানে হারিয়ে যায়

../news_img/59939mm.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক::পুরো ভারত, এমনকি সারা পৃথিবীতে এখন এক আলোচিত শব্দ ‘আসিফা’। জম্মু-কাশ্মীরের আট বছরের শিশুকন্যা আসিফা। পৃথিবীকে ভালো করে বোঝার আগেই নির্মম পৃথিবীর অতি নির্মম এক ঝাপটায় চলে গেল সে। যে পাশবিক নির্মমতার শিকার হলো আসিফা, তা কি ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব?
ঘটনাটি গত ১০ জানুয়ারির। সেদিন এই ছোট শিশুটিকে অপহরণ করা হয়। এর আট দিন পর, ১৮ জানুয়ারি কাঠুয়ার এক জঙ্গলে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। খবরে জানা যায়, ঘোড়া চরাতে নিয়ে গিয়েছিল আসিফা। সেখান থেকে ১৯ বছর বয়সি একজন তাকে প্রথমে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর জোর করে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে অচেতন করে একটি মন্দিরে আটকে রাখে। মন্দিরে আটকে রাখার পর চলে পালাক্রমে ধর্ষণ! একবার নয়, বারবার। সবশেষে তার মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয় এবং তার লাশ ফেলে দেওয়া হয় জঙ্গলে। ফুলের মতো ফুটফুটে একটি শিশুকে এভাবে দলবেঁধে ধর্ষণ, তা-ও আবার একটি মন্দিরের ভেতর, সবশেষে তার মাথা থেঁতলে দিয়ে হত্যা করাÑ পৃথিবীর ইতিহাসে কি এর দ্বিতীয় কোনো নজির আছে!

এর চেয়েও শরীর হিমকরা সংবাদ হলোÑ এই অপরাধের সঙ্গে অভিযুক্ত বলে যাদের নাম এসেছে পুলিশের তদন্তে তারা সবাই সমাজের চোখে ভদ্র-শিক্ষিত মার্জিত মানুষ। এর মূল হোতা হিসেবে নাম উঠে এসেছে সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা সাঞ্জি রামের। তার ছেলে ভিশাল, ভাতিজা কিশোর আর স্পেশাল পুলিশ অফিসার দিপাক খাজুরিয়াও এই অপরাধে অভিযুক্ত। বাবা-ছেলে মিলে একই ধর্ষণের অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার নজিরও কি পৃথিবী দেখেছে কখনও! এখানেই শেষ নয়, এ অপরাধে অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছে আরেকজন স্পেশাল পুলিশ অফিসার সুরিন্দার কুমার, রয়েছে কিশোরের বন্ধু প্রাভেশ কুমার।

এই অপরাধটি এখানেই শেষ নয়। যে নৃশংসতা এই ধর্ষকরা দেখিয়েছে, বলা যায় এর চেয়েও বড় অমানবিকতার ঘটনা ঘটেছে এর পরে। বড় অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল পুলিশের আরও দুই বড় কর্মকর্তাÑ সাব ইনস্পেক্টর আনন্দ দত্ত এবং হেড কনস্টেবল তিলক রাজ। তারা একদিকে এ ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেনি, আবার অভিযুক্তদের বাঁচানোর জন্য মেয়েটির পোশাক ধুয়ে দিয়েছিল! কিন্তু এখানেও যে শেষ নয়! পশু ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে তিন মাস পর হলেও ভারত যখন উত্তাল, ঠিক তখনই এই অভিযুক্ত ধর্ষকদের পক্ষে মাঠে নেমেছে একটা দল। সেই দলে ভারত সরকারের পদস্থ লোক যেমন রয়েছে, রয়েছে সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও। যেই বিজেপি এখন ভারতের ক্ষমতায়, সেই দলের দুই রাজ্যমন্ত্রী যখন এমন পৈশাচিক ঘটনায় ধর্ষকদের পক্ষ নেয়, তখন কি আর কান্নারও কোনো ভাষা থাকে!

ছোট একটি মেয়ে আসিফা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার একটি কবিতা আবৃত্তির ভিডিও ভাইরাল হয়ে আছে। মায়াবী চেহারার এই মেয়েটি যে এলাকায় থাকত, যে পরিবার বা গোত্রের সদস্য সে, তারা সাধারণত খবরের আড়ালেই থাকে। আধুনিক ভারতের কোনো সুযোগসুবিধাই তারা পায় না। পাহাড়ে ছাগল, গরু আর ঘোড়া চরিয়েই তাদের জীবিকা চলে। কিন্তু এই আসিফা-হত্যাকা-ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের সমস্যাগুলো সামনে আসে।
ভারতে হিন্দুদের একটি বড় অংশ এমন, যারা তাদের দেশকে শতভাগ হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। এই ঘোষণাও তারা দিয়েছে সদম্ভে। মুসলমানদের অস্তিত্বকে তারা সহ্য করতে পারে না। সাম্প্রদায়িকতার নেশায় উন্মাদ এই গোষ্ঠী সুযোগ পেলেই হামলে পড়ে সেখানকার অসহায় মুসলমানদের ওপরÑ এই সংবাদও পুরানো নয়। কিন্তু শত পাশবিকতার পরও আসিফার এই ঘটনা, তাকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা করার ঘটনা এবং তাকে হত্যা করার পর অভিযুক্তদের পক্ষে আন্দোলন করার ঘটনা ভারতীয় সমাজের ঘৃণ্য এক চেহারাই আমাদের সামনে তুলে ধরে। তবু সান্ত¡নার কথা হলো, দেরিতে হলেও ভারত সরকার এ বিষয়ে কঠোর হচ্ছে বলে আমরা সংবাদ পাচ্ছি। জম্মু-কাশ্মীরের দুজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। ধর্ষকদের গ্রেফতার করা হয়েছে। পাঁচ দিনের বিদেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী মোদির দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মন্ত্রিপরিষদের সভায় ১২ বছরের নিচে শিশু ধর্ষণে মৃত্যুদ-ের আইন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ধর্ষণের ঘটনা বরাবরই দুঃখের, বেদনার। কিন্তু আসিফার ঘটনা তো বেদনার সব স্তর অতিক্রম করে যায়! আমরা এই ঘটনার নিন্দা জানাই। আসিফার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। আর কঠোর ভাষায় আমরা এই ঘটনায় সব অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানাই। বিচারের দাবি জানাই ধর্ষণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বর্বরদেরও।