কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, টেন্ডার ছাড়া চীনের সঙ্গে চুক্তি সই

../news_img/60474 mrini.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক ::  বিশেষ ক্ষমতা আইন (দ্রুত সরবরাহ আইন) প্রয়োগ করে কোনো টেন্ডার ছাড়াই সরকার চীনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করেছে। ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০০ একর জমির ওপর কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত হবে।
‘বে অব বেঙ্গল’ নামে নতুন কোম্পানি গঠন করে সমান মালিকানায় কেন্দ্রটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ও চীন। চুক্তির অধীনে ৩০ দিনের মধ্যে এ যৌথ বিনিয়োগ কোম্পানি গঠন করা হবে। নতুন কোম্পানি ৪৮ মাসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করবে।

রোববার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও চীনের হয়াদিয়ান কোম্পানি এই যৌথ বিনিয়োগ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। বিদ্যুৎ ভবনের মুক্তি হলে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

প্রকল্প ব্যয় ১৬ হাজার কোটি টাকা বলা হলেও বাস্তবে এর ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এমনটি মনে করেন জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, এখন পর্যন্ত এ ধরনের যেসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, তার সব ক’টির প্রকল্প ব্যয়ই এ রকম আকাশছোঁয়া।

বাস্তবে এ প্রকল্পের কাজও শুরু হওয়ার পর প্রতি বছর নানা অজুহাতে ব্যয় বাড়ানো হবে। এছাড়া তেল ও কয়লার দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়বে।
ডলারের বাজারমূল্য চড়া হলে খরচের লাগামটানা কঠিন হবে। সব মিলিয়ে আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রকল্পটি যদি নির্ধারিত সময়ে আলোর মুখ দেখেও, তবু খরচ ৩৫ হাজার কোটি টাকার নিচে হবে না। এছাড়া সময়ক্ষেপণ হলে তা আরও বাড়তে থাকবে।

এদিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় টেন্ডার ছাড়াই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগে দুর্নীতি আরও বাড়বে বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম রোববার যমুনা টিভিকে বলেন, এই আইনের কারণে ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অপচয় বাড়ছে। একই কারণে এ খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হচ্ছে না। এটা জনস্বার্থ সংরক্ষণ করছে না। তিনি বলেন, আমার ক্ষমতা থাকলে এই বিশেষ আইনটি এখনই বাতিল করতাম।

প্রসঙ্গত, বিদ্যুৎ উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে ২০১০ সালে বিনা টেন্ডারে কাজ দেয়ার সুযোগ রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইন পাস করে সরকার। ২০১৪ সালে আবারও ৪ বছরের জন্য বাড়ানো হয় আইনটির মেয়াদ।

এর আগে চীনের সঙ্গে ১৩২০ মেগাওয়াটের আরও দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করে বাংলাদেশ। এর একটি পটুয়াখালীর পায়রাতে ও অপরটি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নির্মিত হবে। এছাড়া বাগেরহাটের রামপালে ভারতের সঙ্গেও ১৩২০ মেগাওয়াটের আরও একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করে সরকার। তবে এর কোনোটিরই কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগেও অসন্তোষ রয়েছে। তা সত্ত্বেও আরও একটি কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে এ প্রকল্পটি উৎপাদনে আসতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের পর নসরুল হামিদ দাবি করেন, মহেশখালী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বেশি সময় লাগবে না। তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই আমরা উৎপাদনে আসতে পারব। তাছাড়া এ ধরনের পাওয়ার প্ল্যান্ট তো আমাদের নতুন। এ ধরনের প্রকল্পে বিভিন্ন সংস্থাকে একসঙ্গে করে ফাইন্যান্সিয়াল পজিশন তৈরি করা, বিলিয়ন ডলারের ফান্ড রেইজ করে এবং ইনভেস্টরদের কনফিডেন্ট নিয়ে কাজ করাটা আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জের। তিনি দাবি করেন, হয়তো এভাবে যখন ৫-৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলে আসবে, তখন আর কোনো সমস্যা হবে না।

দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পরিস্থিতির অনেক উন্নতি সত্ত্বেও কেন দ্রুত সরবরাহ আইন প্রয়োগ করে দরপত্র ছাড়াই চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হল এমন প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, টেন্ডার করলে আরও ৬ বছর লেগে যেত। আরও দেরি হতো। আমরা চাচ্ছি যত দ্রুত সম্ভব পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো নিয়ে আসা। তাই আমার মনে হয়, আরও কিছু বছর এই বিশেষ আইনটি প্রয়োগের প্রয়োজন হবে। কারণ ২০২১ সাল পর্যন্ত সরকারের একটা ভিশন ও লক্ষ্য আছে। আমরা আশা করছি, অন্তত ২০২১ সাল পর্যন্ত আইনটির সাস্টেইন করা লাগবে।

বিদ্যুৎ সচিব বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এখনই জরুরি।যুগান্তর