দক্ষিণ কোরিয়ায় বাড়ছে মুসলমান

../news_img/60450mmm.jpg


মৃদুভাষণ ডেস্ক::গত ৫০ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ৫৪ গুণ বেড়েছে। ১৯৬৫ সালে যখন কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশন স্থাপিত হয়, তখন মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার ৭০০। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে
২ লাখের কাছাকাছি
 

জানেন কি, কোন দেশে কোনো শিশু জন্মগ্রহণের পরপরই তার বয়স এক বছর গণ্য করা হয়? এটা কোন দেশ, যার অধিবাসীরা মারা গেলে বা মুমূর্ষু অবস্থায় থাকলে লাল কালি দিয়ে লেখা হয় তার নাম? জন্ম-মৃত্যুর বেলায় এমন বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আছে যাদের, তাদের যাপিত জীবনের নানা অঙ্গন বাহারি বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যম-িত থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক। এই যেমন ১ লাখ ২১০ বর্গকিলোমিটারের দেশটির প্রতি ৭৭ জন নাগরিক প্লাস্টিক সার্জারি করে থাকেন। তারা মনে করেন, সারারাত ফ্যানের নিচে থাকলে ফ্যান পড়ে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। দেশটির নাম কি জানেন? সংক্ষেপে তার একটা পরিচয় হচ্ছে দেশটির জিডিপির ২০ শতাংশ আসে স্যামসাং থেকে। হ্যাঁ, সেলফোন, টেলিভিশনসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানির কথাই বলা হচ্ছে।
এতক্ষণে পাঠক নিশ্চয়ই ধরে ফেলতে পেরেছেন, দেশটির নাম দক্ষিণ কোরিয়া। নাগরিক সুবিধা ও উন্নত জীবনধারার জন্য প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র কোরিয়ার সুখ্যাতি সর্বজনবিদিত। ৯ প্রদেশ ও ৬টি মেট্রোপলিটন শহর নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া গঠিত। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উচ্চ আয়সম্পন্ন উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।

কোরিয়ায় মুসলমান
কোরিয়া এমন একটি দেশ, যেদেশ সর্বাধিক পেন্টাকোস্টাল গির্জার আবাস এবং যে দেশের ৪৬ শতাংশ মানুষ আমেরিকান পিউ রিসার্চ অনুসারে কোনো প্রকার ধর্মের সঙ্গেই যুক্ত নয়। ১০২৪ খ্রিষ্টাব্দে আরব বণিক ও ধর্ম প্রচারকরা সর্বপ্রথম কোরিয়ায় আসেন। পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে মুসলমানরা কোরিয়ায় জড়ো হতে থাকেন। এ দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুসলমানরা কর্মরত।
১৯৫০ সালের প্রথম দিকে কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০-৫৩) চলাকালে জাতিসংঘ বাহিনীর অধীনে তুর্কি সেনা ব্রিগেড কোরিয়ায় এলে ইসলাম প্রচার বিশেষ গতি লাভ করে। এক্ষেত্রে তুর্কি সেনা ব্রিগেডের ইমাম আবদুল গফুর কারাইমাইলাগলুর ভূমিকা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। রাজধানী সিউলে বসবাস করা মুসলমানদের ১ লাখ ৫০ হাজারেরই বসবাস ইতেওয়ান জেলায়, যাদের এক-তৃতীয়াংশই নৃত্বাত্ত্বিক দিক থেকে কোরীয়। রাজধানী সিউলের এটি একটি ব্যস্ততম জেলা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম কেন্দ্রীয় মসজিদের অবস্থান এই জেলায়। ১৯৭৬ সালে এই মসজিদটি প্রথম নামাজের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কোরীয়ার হালাল রেস্টুরেন্টের অনেকগুলোই ইতেওয়ানে অবস্থিত। এর মধ্যে বিখ্যাত ‘ঈদ হালাল রেস্টুরেন্ট’, যেটি এক কোরীয় মুসলিম পরিবার পরিচালনা করছে।
সাংবাদিক করিম জর্দানের ভাষ্য মতে, বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোট ১৫টি মসজিদ রয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় বড় অনেক শপিং কমপ্লেক্সে নামাজের জায়গা রয়েছে। বিভিন্ন মসজিদে ছুটির দিন রোববারে আরবি ভাষা শিক্ষার কোর্স চালু রয়েছে। এ পর্যন্ত কোরীয় ভাষায় ইসলামের ওপর লিখিত ১৭টি গ্রন্থ বেরিয়েছে। দ্য মুসলিম উইকলি নিউজ ও আল-ইসলাম নামের দ্বিমাসিক ও দ্বিভাষিক জার্নাল নিয়মিত প্রকাশিত হয়।
দাওয়াতি তৎপরতার অংশ হিসেবে কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশন কর্তৃপক্ষ সিউল কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধানে ধর্ম অনুশীলন ও ধর্ম প্রচারের স্বীকৃতি থাকায় মুসলমানরা স্বচ্ছন্দে দাওয়াতি মেহনত চালিয়ে যাচ্ছেন। এ দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ২০০। মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে কোনো বাধা নেই। প্রতি বছর বিভিন্ন কাফেলা হজব্রত পালনে সরকারের সহযোগিতা লাভ করে।
হানবক হচ্ছে কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক। সম্প্রতি কোরীয় টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে তরুণ কোরীয় নারীরা জানায়, যখন তারা হানবক পরিধান করে, তখন তারা তাদের নিজেদের মধ্যে সম্মান এবং মর্যাদাবোধের অনুভূতি অনুভব করে। এটি কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী শালীন পোশাক এবং অনেকাংশেই ইসলাম নির্দেশিত পোশাকের সঙ্গে এর সাদৃশ্য রয়েছে।
মুসলিম মহিলাদের হিজাবের মতোই কোরীয় নারীরা এ পোশাকের সঙ্গে মাথা ঢাকার জন্য ‘জাঙ-ওট’ নামক একপ্রকার কাপড় পরিধান করে। যদিও বর্তমানে কোরীয়রা পশ্চিমা পোশাকে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটক ও কোরীয়দের মাঝে এই পোশাক খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কোরিয়ার বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্যে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকে পর্যটকরা অনেক সময় বিনা খরচে প্রবেশ করতে পারে। বর্তমানে কোরীয় ফ্যাশন ডিজাইনাররা এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকের আধুনিকায়ন ও সর্বসাধারণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন।

কিছু সংকট কিছু আশা
সিউল ফোরাম নামের একটি সংগঠন সম্প্রতি তাদের পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, কোরিয়ায় মুসলিম ছাত্রদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মসজিদ ও হালাল খাদ্যের অভাব। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণেও এখানে তারা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এছাড়া এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে ভাষা না জানার জন্যও সমস্যায় পড়তে হয় আরব ছাত্রদের।
এদিকে মুসলিম দেশ থেকে আসা অর্থ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে কোরিয়ান নির্মাণ কোম্পানিগুলো কাজ করে যাচ্ছে। সূত্রমতে, কোরিয়ান নির্মাণ কোম্পানির মাধ্যমে ১৯৮০ সালে মধ্য এশিয়া থেকে ৮.২ বিলিয়ন ডলার দরপত্র লাভ করে। বর্তমানে বুর্জখলিফা, আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রসহ সৌদি আরবে বেশ কয়েকটি বড় প্রজেক্টে কাজ করছে কোরিয়ান স্থাপনা কোম্পানি।
ধর্ম-ভীতির এই যুগে কোরীয় মুসলমানরা সক্ষম হয়েছেন কোরীয় জনগণকে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে। ‘মুসলমান ও কোরিয়ান : বিস্ময়কর সংমিশ্রণ’ শীর্ষক এক নিবন্ধে করিম জর্দান লিখেনÑ আমার প্রিয় চিত্রশিল্পী মুনা হুনমিন বে একজন কোরীয় মুসলিম এবং বর্তমানে তিনি আরব আমিরাতে বাস করছেন। তার শৈল্পিক দক্ষতার সাহায্যে তিনি চেষ্টা করছেন ইসলাম ও কোরীয় সংস্কৃতির মধ্যে সাদৃশ্য স্থাপন করতে। তিনি জানান, প্রথম যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন নিজেকে খুব একাকী বলে অনুভব করতেন। কিন্তু যখন সুন্নাহ ও হাদিসের অধিক বিস্তারিত পাঠ শুরু করলেন, তখন তিনি আবিষ্কার করলেন, ইসলাম ও কোরীয় সংস্কৃতি কতই না কাছাকাছি! ইসলাম ও কোরিয়ার এই সাদৃশ্য তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তার চিত্রকর্মের সাহায্যে।
তিনি জানান, ‘কোরিয়ার মানুষ কখনও কখনও আমার ধারণাকে নেতিবাচকতাভাবে প্রকাশ করে, ফলে আমি দূরপ্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের মেলবন্ধন ঘটাতে আরও নির্ভরযোগ্য সূত্রের খোঁজ করি।’ অনেক সময় ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনাকেও তিনি তুলে আনেন, যার মাধ্যমে কোরীয় সংস্কৃতি ও ইসলামের মধ্যকার সম্পর্ক উন্মোচিত হয়।
মোটকথা, এটা আজ অনস্বীকার্য যে, দক্ষিণ কোরিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। হ্যানকক ইলবোর তথ্য অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ৫৪ গুণ বেড়েছে। ১৯৬৫ সালে যখন কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশন স্থাপিত হয়, তখন মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার ৭০০। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ২ লাখের কাছাকাছি। তার সঙ্গে উচ্চ অভিবাসী নীতি মেনে চলায় দেশটিতে ক্রমেই বেড়ে চলছে মুসলমানের সংখ্যা।