দুঃসময় কাটিয়ে ওঠা শক্তি-সাহসের এক নাম বড়লেখার ‘মীরা দে’

../news_img/60713 mri nu.jpg

লিটন শরীফ, বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি :: নানা বাধা-বিপত্তি তুচ্ছ করে স্বপ্নপূরণের যুদ্ধে সন্তানকে জয়ী করেন মা। প্রতিটি জয়ের নেপথ্য যোদ্ধা জয়ী হওয়া মায়েদের গল্পই পারে অন্য অনেকের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হতে। এমনি এক অনুপ্রেরণা ও শক্তি-সাহসের নাম মীরা দে। বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার পৌরসভার আহমদপুর এলাকায়।

স্বামী আর দুই সন্তানসহ চার সদস্যের সংসার জীবনে স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে হঠাৎ বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বামী সুনীল চন্দ্র দের অকাল মৃত্যু। ২০০৪ সালে অসুস্থ স্বামীর মৃত্যু আর সাথে ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা অবস্থা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মীরা দের। তবে ওই দুর্যোগটা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়লে।

দুই সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের ব্যয়। পাশাপাশি ঋণের বোঝা। এক প্রতিকূল পরিস্থতিতে পড়েন তিনি। তবে প্রতিকূলতা দমাতে পারেনি মীরা দেকে। কোথাও যেন গোপন শক্তি তাকে পথ চলার সাহস জুগিয়েছে। দুটি সন্তানকে কষ্টে-সৃষ্টে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বহুদূর। আর মায়ের সাহস বুকে ধারণ করে আলোকিত হওয়ার পথে এগিয়ে গেছেন দুই সন্তান শুভ্রাংশু শেখর দে ও সৌরভ কান্তি দে। এর মাঝে বড় ছেলে ডা. শুভ্রাংশু শেখর দে ৩৫তম বিসিএসে মেডিকেল অফিসার। আর ছোট ছেলে ডা. সৌরভ কান্তি দে ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট।

বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে গত রবিবার (১২ মে) রাজধানীর ইস্কাটনে এক অনুষ্ঠানে সংগ্রামী এ মাসহ ৫ স্বপ্নজয়ী মাকে সম্মাননা দিয়েছে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।

আলাপকালে মীরা দে বলেন, ১৯৮৮ সাল। ছোট জীবনে দ্বিতীয় ধাপটি শুরু হয়েছিল অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে। স্বামী ছিলেন পূবালী ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার। সীমিত আয়ের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে ঘরসংসারের শুরু। পাশাপাশি প্রাইমারি স্কুলে চাকরি। ১৯৯০ এবং ১৯৯২ সালে দুই ছেলের জন্ম। ছিমছামভাবে চলছিল সবকিছু। কিন্তু সেটা বেশি স্থায়ী হলো না।

দুর্যোগটা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়লে। যৌথ পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বামীর ঋন ছিল প্রায় দুই লাখ টাকা। ধারণা ছিল হয়তো সময়মতো পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে ব্যয় বহুল চিকিৎসায় ঋণ আরও বেড়েছে। ইতিমধ্যে যৌথ পরিবারটি ভেঙে গেছে। চোখে তখন অন্ধকার।

দুই সন্তান নিয়ে এবার শুরু হলো জীবনের সবচেয়ে কঠিন ধাপ। দুটি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর পাড়ি দিতে হয়েছে পথের পর পথ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বেতনের টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা, তিনটি মুখের আহার আর সন্তানদের লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করা। দিনগুলো ছিল অনেক হিসাবি আর দীর্ঘ। সমস্যা অন্তহীন। কিন্তু একলা পথচলায় খেয়ে না খেয়ে কেটেছে কত যে দিন। কত বিনিদ্র রাত কেটেছে, সুদিনের আশায়।

মীরা দে বলেন, ‘সময়টা কঠিন হলেও বাচ্চাদের পড়ালেখার ব্যাপারে ছাড় দেইনি কখনো। এরাই ছিল আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন। বড় ছেলে যখন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেল। আমি তখন প্রথমবারের মতো সার্থকতা অনুভব করলাম। ইতিমধ্যে ছোট ছেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিআরপিতে ভর্তি হলো।’

তিনি জানান, বড় ছেলে শুভ্রাংশু এমবিবিএস পাশ করে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিল ২০১৭ সালে। আর ছোট ছেলেও পাশ করে বের হল সিআরপি থেকে। এখন সে সিলেট সিআরপিতে কর্মরত। কিন্তু ইতিমধ্যে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৩টি বছর। শ্রমে, ঘামে স্বপ্নের দীর্ঘ পথযাত্রায় আশা পূরণ হয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি দুটি সন্তন যেন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে।’

মীরা দের বড় ছেলে ডা. শুভ্রাংশু শেখর দে বলেন, ‘বাবার মৃত্যুতে অনেক সংকটে পড়ে আমাদের পরিবার। কিন্তু মা সেই সংকট আমাদের বুঝতে দেননি। মা বাবা ও মায়ের ভূমিকা নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাকে নিয়ে গর্ব করি আমরা।’

দীর্ঘ কঠিন পথচলার শেষে সন্তানের সাফল্যে এখন মীরা দের মুখে হাসি। মায়ের হাসিটিই যেন এখন সন্তানদেরও শক্তি ও সাহসের সম্ভল।