সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি নিয়ে কিছু কথা

../news_img/60839 mri nu.jpg

মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ :: ভাবছিলাম আর এনিয়ে কলম ধরবো না, কিন্তু ছাত্রদের আহাজারিতে ধরতে হলো। আমি ছিলাম এক কলেজ শিক্ষক। সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর সদরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী যখন ডেকে নিয়ে আমাকে বুঝালেন, তখন এমপিও ভুক্ত একটি স্থায়ী চাকুরি ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ালাম। ওখানে গিয়ে পেলাম একটা সুন্দর পরিবেশ। ভিসি স্যার আমাকে বাড়তি দায়িত্ব হিসাবে ডেপুটি রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব দিলেন। আস্তে আস্তে কাজ বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। কিছুদিন পরই রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালনের আদেশ পেলাম।

ওখানে গিয়ে পরিচয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জনাব কুতুব উদ্দিন আহমেদের সাথে। উনার বিচক্ষণতা ও ভিষন নিয়ে কাজ করা দেখে চমকিত হলাম।আমাকে বলতেন 'মাউন্ড এলিজাবেথ হসপিটালে যেমন দেশ বিদেশের রোগীরা যায় চিকিৎসার জন্য। আমার ইউনিভার্সিটিতে তেমনি দেশ বিদেশের ছাত্ররা আসবে পড়াশুনার জন্য। এজন্য এর নামে ইন্টারন্যাশনাল শব্দটি যোগ করেছি;। উনি ভিসিকে দিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি চালাবার দায়িত্ব- সে জন্য এটাকে ইউজিসি চেয়ারম্যান স্যার বলেছিলেন, The VC dominated only university of Bangladesh and it is the university for common people। পেলাম ডিন হিসাবে প্রফেসর সৈয়দ আকমল মাহমুদ স্যারকে। বিশাল পান্ডিত্য দেখে অভিভুত হলাম। লেগে গেলাম কাজে। ডিপার্টমেন্টের হেড হিসাবে সিলেবাসকে আপডেট করা, রিসার্চের কাজ, রেজাল্ট প্রসেসিং এর জন্য সফটওয়ার তৈরির কাজ।কম্পিউটার সায়েন্সের খালেদ সাহেবের সহায়তায় এক সপ্তাহের মধ্যে সফটওয়ার তৈরি করলাম। ব্যবসায়িক কাজে ডাটাবেইস তৈরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগল।

 সদরুদ্দিন স্যারের সুবাদে দেশ বিদেশের পন্ডিতরা নিয়মিত আসতো। ওদের সাথে পরিচয় হতে থাকলো। একটা স্বপ্নের মধ্যে সময় পার করছিলাম। হঠাৎ করে স্যারের উপর একটা প্রেসার তৈরি হলো। স্যার রিজাইন দিয়ে প্রফেসর আকমল মাহমুদ স্যারের কাছে দায়ীত্ব দিয়ে চলে গেলেন। আকমল মাহমুদ স্যার অনেক চেষ্ঠা করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজ ধরে রাখার জন্য। কিন্তু দূর্ভাগ্য শিক্ষকদের মধ্যে একজন নন একামেডিশিয়ান ঢুকে কিছু শিক্ষককে দিয়ে পরিবেশ ঘোলাটে করে তুললো। আকমল মাহমুদ সাহেব ও মতিন সাহেবকে চলে যেতে হলো। বিশ্ববিদ্যালয় চলে গেলো এক বিশেষ গ্রুপের হাতে। কিছুদিন পরে ওদেরই মাধ্যমে এলেন প্রফেসর সুশান্ত কুমার দাস- বিশাল পন্ডিত ব্যক্তি। আমরা অনেকেই আশায় থাকলাম উনি নিশ্চয়ই ভিসির চেয়ারের মর্যাদা রাখবেন। কিন্তু দূর্ভাগ্য সব কিছুই পজিটিভ হলেও উনিও এই বিশেষ গ্রুপের নির্দেশনায় চলতে থাকলেন। তবে বিভাগের বিভিন্ন কাজে উনার উৎসাহ সব সময়েই ছিলো। আমি বুঝতাম, অনেক প্রতিকূলতার পরেও উনি আমাকে সাপোর্ট দেয়ার চেষ্ঠা করে যেতেন। অনেক কায়দা কসরত করেও যখন উনাকে তার বৃত্তের বাহিরে আনতে পারলাম না, তখন ফেসবুকে পরোক্ষভাবে ইংগিতপুর্ণ স্টাটাস দেয়া শুরু করলাম। লাভ হলো না। উলটা কয়েকবার বিভিন্ন ধরনের কথা শুনতে হলো। এরি মধ্যে ছাত্রদের মধ্যে কোন্দল বাড়তে থাকলো। দু দুটো মার্ডার হয়ে গেলো। সুশান্ত বাবুর চার বছরের লিয়েন শেষ হলে উনি চলে গেলেন।

কিছুদিন পরে আসলেন সিলেট বোর্ডের প্রাক্তন পরিক্ষা নিয়ন্তক মনির উদ্দিন সাহেব ভারপ্রাপ্ত ভিসি হয়ে। ঘুরে ফিরে উনিও সেই নন একামেডিসিয়ানের দেয়া নাম সেই প্রভাবশালীদের হাতের পুতুল হয়ে কাজ করতে শুরু করলেন। ফলাফল হলো আমাকে বের করে দেয়া হলো আযোগ্যতার অভিযোগে এবং আরো কয়েকজন ভাল শিক্ষককে বিভিন্ন অভিযোগে অব্যাহতি দেয়া হলো। ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে দ্বন্ধ থাকাতে কোন পক্ষের দেয়া ভিসি প্যানেল সরকারী অনুমোদন পেলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যন্সেলরের নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি, প্রভিসি, ট্রেজারার না থাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জায়গা না থাকা, মালিকানা নিয়ে দ্বন্ধ থাকাতে ইউজিসি আগামী জুলাই ২০১৮ থেকে ছাত্র ভর্তি না করার নির্দেশ দিয়েছে। এর আগে থেকে ছাত্র কমতে কমতে এখন রেভিনিঊ যে পর্যায়ে নেমে এসেছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ নির্বাহ করা সম্ভব না। এর পর ছাত্র ভর্তি না হলে কয়দিন চলবে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে- এনিয়ে নতুন পুরাতন সব ছাত্রদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় মালিক পক্ষের দুই গ্রুপের সমঝোতা আশু প্রয়োজন। সরকার বিদ্যমান আইনে কোথাও বিশ্ববিদ্যালয় চালানোতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তাই মালিক পক্ষ না চালাতে পারলে তা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া সরকারের হাতে আর কোন বিকল্প নেই। আর মালিক পক্ষের নিজেদের স্বার্থে এর সমাধান দরকার। কারন যেহেতু গত সাত বছর থেকে এখানে মাননীয় চ্যান্সেলরের নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি, প্রভিসি, ট্রেজারার নেই কিন্তু বিভিন্ন লিফলেটে, প্রচার পত্রে ভিসির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাই স্বভাবতই ছাত্ররা প্রতারনার স্বীকার হয়েছে। এমতাবস্থায় এসব ঝামেলা থেকে বাচতে এর একটা আশু সমাধান প্রয়োজন। এতে সবাই উপকৃত হবেন।

আসলে দুঃখের সাথে বলতে হয়- প্রফেসর আকমল মাহমুদ সাহেবের পরে যে দুজন ব্যক্তি বিশেষ করে সুশান্ত কুমার দাস যদি নিজের চেয়ারের মর্যাদা রেখে একটু ঘুরে বসতেন, তবে এই সমস্যা এতটুকু গড়াতো না আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান অনেক উপরে থাকতো। উনারও চ্যান্সেলরের অনুমোদন পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। সর্বোপরী প্রফেসর সদরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর শোক সভায় বক্তারা যেমন বলেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল উনিভার্সিটিকে যদি সরকার দেখভাল করে তবে উনার আত্না শান্তি পাবে | আসলেই সিলেটের এ রকম স্বনামধন্য সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ নোংরামির বলি হয়ে ধ্বংস হবে তা মেনে নেয়া যায় না।



প্রাক্তন রেজিস্ট্রার ও বিভাগীয় প্রধান, ব্যবসা প্রশাসন বিভাগ
সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি