দেশ ছাড়ব না কেন?

../news_img/61230 mri.jpg

ফারুক ওয়াসিফ :: এশিয়ার বৃহত্তম কবরস্থানটি এখন বাংলাদেশে। কথাটা আমার না। আসাদগেটের উল্টা দিকে এমন দাবি করা একটা বিলবোর্ড কয়েক বছর আগেও শোভা পেত। উন্নয়নের এটাও হয়তো একটা সূচক। রায়েরবাজারের বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধের ঠিক পেছনে দেয়ালঘেরা ওই বিশাল কবরস্থানের পাশ দিয়ে গেলে মনে হয়, এটা কি জীবনের দেশ, নাকি মরার দেশ? দেশটাকে আশার সমাধিক্ষেত্র বলা কি ভুল হবে? বন্ধু-আত্মীয়দেরও কতজন দেশ ছেড়ে গেল। অনেকে ফিরবে বলে গেলেও ফেরার চিন্তা বাদ দিয়েছে। অনেকে ফিরতে চাইলেও দেশে থাকা স্বজনেরা ‘না’ করে দেয়। দুর্নীতি, ভয়, কষ্টকর নাগরিক জীবন, কর্মসংস্থানহীনতা আর চূড়ান্ত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় মধ্যযুগীয় কবিতাখানি মনে পড়ে: সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল। অমিয় সাগরে সিনান করিতে সকলি গরল ভেল।

জরুরি অবস্থা জারি হলো, সুখের লাগিয়া ‘দুর্নীতিমুক্ত স্বদেশ’ এবার হবেই হবে; বলা হলো। বিরাট তোড়জোড়, ধুন্ধুমার অভিযান চললো—অনেকের মধ্যে আশার লতা লকলকিয়ে বেড়ে উঠল। সে সময়ই একদল তরুণ বন্ধু-বান্ধবী বিদেশের পাট চুকিয়ে দেশে ফিরলেন। তাঁরা দেশের কাজ করবেন, দেশে থেকে যে যা পারেন, তা করবেন। পরে দেখা গেল, সকলই গরল ভেল। দুর্নীতির বিরুদ্ধের অভিযান রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পর্যবসিত হলো। এর কর্ণধারেরা আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় রেখে গেলেন দেশটাকে। তারপর যাঁরা এলেন, তাঁরা প্রায় সব ব্যাপারে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেললেন।

সেই বন্ধুরা আবার যাঁর যাঁর পশ্চিমা ডেরায় ফিরতে লাগলেন। বিদেশে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবার জন্য একটা ইংরেজিভিত্তিক ওয়েবসাইট খুলেছিলেন। দেশি-প্রবাসী তরুণেরা সেখানে লিখতেন। কিন্তু ৫৭ ধারার ভয় সীমান্ত পেরিয়ে সেখানেও তাঁদের টুঁটি চিপে ধরল। অচিরেই ওয়েবসাইটটি বন্ধ হয়ে গেল। আর এদিকে দেশে, মতপ্রকাশ, গবেষণা, এমনকি সাহিত্য করাও দিনকে দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তরুণ গবেষক-শিক্ষকদের অনেককে দেখি, সুযোগ পেলেই দেশ ছাড়ার জন্য তৈরি।

এক বাংলাদেশি নাবিক জীবনের কয়েকটা দশক বহু সমুদ্র ঘুরে ক্লান্ত হয়ে দেশে স্থায়ী ফিরেছিলেন। বাড়ি কিনে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরের জ্বালাও-পোড়াওয়ের মধ্যে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। ছেলেকে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন আগেই, এবার নিজেও দেশ ছাড়ার চিন্তা করছিলেন। রাজনৈতিক দুর্যোগের ভয়, সময়ে সময়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হরেক রকম ‘যুদ্ধের’ শিকার হওয়ার ভয়, রাজনৈতিক সন্ত্রাসীর ভয়, বেকারত্বের ভয়, নির্যাতিত হওয়ার ভয় তো কমার লক্ষণ নেই। হাজার হাজার ‘বিরোধীদলীয়’ তরুণ কারাগারে। মামলা-হামলার ভয়ে অনেকেই পগাড়পার, অর্থাৎ দেশান্তরি। জঙ্গিবাদের ফাঁদের ভয়েও ছেলেমেয়েকে দেশে রাখতে চান না অনেকে। সবাই এসবে আক্রান্ত হচ্ছেন বা হবেন তা না, কিন্তু লাখে একজনও যদি মর্মান্তিক বা করুণ পরিণতি পান, অন্যরা ভয়ে বসে পড়েন। মানসিক চাপে অসহ্য হতে থাকে। প্রতিকার নেই, আইনের শাসনের আশ্বাসটুকুও নেই। ভয় সংক্রামক, শান্তি না।

সম্প্রতি কথা হলো এক আধা সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে। বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি করা শেষে স্ত্রীকে নিয়ে ফিরলেন, কিন্তু আনলেন না পুত্রকে। তাকে রেখে এলেন অস্ট্রেলিয়ায়। সৎ ও দেশপ্রেমিক এই মানুষের কণ্ঠে চিকন এক কষ্টের সুর। জন্মভূমিতে ছেলেকে রাখতে না পারা, কিংবা ফিরতে না বলার কষ্ট। সন্তানের জীবন ও ভবিষ্যতের ভয় আরও বড়। তাই কষ্ট গিলে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়াই উত্তম ভাবছেন অনেকে। যাঁরা পারছেন, পার করে দিচ্ছেন ভবিষ্যতের স্বার্থে। সেই ভবিষ্যৎটা এখানে নয়, অন্য কোনোখানে—বিদেশে। ‘জীবন-মরণ এক বাজি/ বাংলাদেশকে ভালবাসি’ বলা তরুণদেরও তো আর দেখি না।

গত পাঁচ বছরে ১ হাজার ৫৮৩ জন বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে ২০১২-১৩ অর্থবছরেই ত্যাগ করেছেন ২৯৯ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত, বিশেষ করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও আইটি দক্ষতাসম্পন্ন বাংলাদেশিরা দেশ ত্যাগ করছেন। নাগরিকত্ব ত্যাগের হার দিন দিন বাড়ছে। [বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৭ জুন]

দেশ কিন্তু এখন মহা উন্নত, মহাপরাক্রমশালী। এর মধ্যেই গত বছরের মে মাসের খবর হলো, নৌকাযোগে ইউরোপে অবৈধ অভিবাসী হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশিরা মহাপরাক্রমে সবার সামনেই আছে। এদিকে সকল ক্ষেত্রেই নিকৃষ্টরা ভেসে উঠছে। তলিয়ে যাচ্ছে সৎ, সাহসী, ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান মানুষেরা।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, দেশ ছাড়ার হারও তত বাড়ছে। উচ্চবিত্তদের বড় অংশই এক পা শুধু নয়, বাড়িঘর, ব্যাংক-ব্যালান্স, পরিবারের অর্ধেক বাইরেই রাখছেন। অদৃষ্টপূর্বভাবে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। বড় বড় রাজধানীতে বাংলাদেশিদের ‘সাহেবপাড়া’ ‘বেগমপাড়া’ গড়ে উঠেছে। অবস্থা দেখে মনে হয়, দেশটার উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতাবানদের বড় অংশই মনে করে, বাংলাদেশ বোধ হয় বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং, যত দ্রুত পারেন টাকা কামিয়ে সটকে পড়াই ভালো।

সুবিধাপ্রাপ্তদেরই যখন দেশের ব্যাপারে আস্থা তলানিতে, সেখানে আমজনতার ভরসা আসবে কোত্থেকে? গত বছরে প্রথম আলো পরিচালিত তারুণ্য জরিপ বলছে, ৮২ শতাংশের বেশি তরুণ ভবিষ্যতে দেশের ভেতরে কর্মক্ষেত্র নিয়ে ভরসা রাখতে পারছেন না। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউই) থেকে করা জরিপেও দেখা যায়, ভালো জীবনযাপন ও পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশের ৮২ শতাংশ তরুণ দেশ ছাড়তে চান। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ‘একবার যেতে দে না, আমার ছোট্ট সোনারগাঁয়’ গানের কথা কাউকে আর আটকাতে পারছে না। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ তৈরি না হওয়ায় তরুণেরা যদি হতাশ হন, তাঁদের কোনো দোষ দেওয়া যাবে কি? আবার জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৬৩ শতাংশই বলছে, তারা জানে না তাদের জীবনের লক্ষ্য কী। দেশের দুর্নীতি নিয়ে তারা চিন্তিত, দেশের আইনকানুন নিয়ে আছে তাদের উদ্বেগ, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও তরুণেরা চিন্তিত। ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ তরুণের ভয় নিরাপত্তা নিয়েই। সামনের পথে আলো দেখছেন না অনেকেই।

এই হতাশারই বিস্ফোরণ তরুণদের কোটা সংস্কার আন্দোলন। চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটার বাধা ডিঙিয়ে ভাগ্যের শিকা ছেঁড়ার আশা তাঁরা করেন না বলেই মরিয়া হয়ে রাজপথে নেমেছিলেন। সেই আন্দোলনের দাবি পূরণে অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও। মাদকে ধ্বংস হচ্ছে অনেকে, অনেক পরিবার থেকে মানুষের নাম চলে যাচ্ছে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা গুমের তালিকায়।

জীবনের জন্য, পড়ালেখার জন্য, চাকরির জন্য এবং একটা সম্মানজনক নিরাপদ জীবনের জন্য বাংলাদেশ আর প্রথম পছন্দ নয় এর অনেক নাগরিকের। এমনকি বিনিয়োগের দিক থেকেও আমরা মিয়ানমার থেকেও পিছিয়ে পড়েছি। এসবের আলোকে আমাদের রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, আইন, রাজনীতি, উন্নয়নের মিথসহ সবকিছু যাচাই করার সৎ সাহস যদিবা আমাদের হয়, একে বদলানোর আত্মবিশ্বাস কেন জাগে না?

জীবন একটাই, দেশও একটাই। কিন্তু যখন আমরা জীবন বদলাতে পারি না, তখন দেশ বদলের নিরুপায় যাত্রা কি ব্যর্থ করে দেয় না মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের রাষ্ট্রকে? বহু সংগ্রাম ও আত্মদানের এ ফসল এভাবে বেহাত হতে পারে না।

ওপরে বলা পরিস্থিতির ইশারা একটাই: পরিবারগুলো ভালো নেই। এ দেশে ব্যবসা করা যেতে পারে, মুনাফা কামানো যেতে পারে, কিন্তু পরিবার নিয়ে বসত করার ঝুঁকি আছে। মানুষ পরিবার ও সন্তানের জন্যই তো সব করে। যারা যেতে পারবে না বা যেতে চায় না, যাদের আর কোনো ঠিকানা হবে না; নিজ নিজ পরিবারের স্বার্থেই তারা হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে। একবার পাওয়া জীবন, একবার পাওয়া দেশ, একবার পাওয়া স্বাধীনতা রক্ষায় এ দেশের মানুষ আবারও জাগবে। কারণ, দেশটাকে নিজের করে বুঝে নিজেদের জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় করা ছাড়া তখন আর কোনো উপায় থাকবে না। আশার সমাধিতে আমরা সেই অপেক্ষাই করি—দিন বদলাবে।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info