ব্যর্থ হয়েছে কাতার অবরোধ

../news_img/61260 mri.jpg

মারওয়ান কাবালান :: ৫ জুন, ২০১৭ কাতারের নাগরিকরা দুঃখজনক এ সংবাদটি দিয়ে দিন শুরু করেছে যে তাদের দেশ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে।
শত্রুতামূলক এ পদক্ষেপ অন্য কারও কাছ থেকে নয়; বরং তাদেরই প্রতিবেশী আরব ও পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিত্র দেশ মিসরের পক্ষ থেকে এসেছে। এ চার দেশের কথিত জোট আচমকা কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং দেশটির ওপর ভ্রমণ ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

দুঃখ ও আতঙ্কজনক কৌশলটির উদ্দেশ্য ছিল কাতারের সরকার পতন বা নিদেনপক্ষে এর আত্মসমর্পণ। কাতারের ওপর ১৩টি শর্ত পূরণের দাবি চাপিয়ে দেয়া হয়। যার মধ্যে ছিল আলজাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়া, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করা ও দোহার কাছে অবস্থিত তুরস্কের একটি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেয়া। কাতারের কাছে আরও দাবি জানানো হয় যে, দেশটির বহু বছরের নীতির কারণে নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোর যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

পরবর্তী সময়ে প্রকাশ হয় যে, নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী চার দেশের জোট কাতারের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার লক্ষ্য স্থির করেছিল; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটির দেশ কাতারের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপের বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়েছিল। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এমন কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়টি কাতারের জন্য বিস্ময়কর ছিল এবং এ ধরনের বড় একটি অবরোধের মুখে পড়ার জন্য একেবারে অপ্রস্তুত ছিল দোহা। যা হোক, ওই অবরোধ কাতারকে নমনীয় করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তা দোহাকে আরও বেশি স্থিতিস্থাপক করেছে।

কেন কাতারকে অবরুদ্ধ করা : গত বছরের ৫ জুন অবরোধ আরোপের আগে জিসিসির ভেতরে জ্বলে ওঠা উত্তেজনা আগেও একবার জ্বলে উঠেছিল। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা সংক্রান্ত একটি নিরাপত্তা চুক্তি কাতার বাস্তবায়ন করেনি- এমন অভিযোগে কাতার থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয় ২০১৪ সালের মার্চে। দোহার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রিয়াদ এবং আবুধাবিকে বিরক্ত করে। যা হোক, ওবামা প্রশাসনের সহানুভূতির অভাব আরও বেশি পদক্ষেপ নেয়া থেকে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতকে বিরত রাখে।

দোহা ওই সময় মিটমাট করে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি নিজের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিলেন। সে মোতাবেক ২০১৪ সালের নভেম্বরে রিয়াদ চুক্তি অনুযায়ী জিসিসিভুক্ত তিন দেশ কাতারে তাদের রাষ্ট্রদূতদের ফেরত পাঠায় এবং একই বছরের ডিসেম্বরে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত জিসিসির বার্ষিক সম্মেলনে সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও বাহরাইনের নেতারা অংশগ্রহণ করেন।

২০১৫ সালে যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, তখন কাতার একে সমর্থন করে সেনা পাঠায়। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলার পর রিয়াদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ইরান থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয় কাতার। এমনকি বাহরাইনের রুগ্ণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয় কাতার সরকার। এক্ষেত্রে কাতার কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনার জন্য বাহরাইনের প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স খলিফা বিন সালমান আল খলিফা ও ক্রাউন প্রিন্স সালমান আল খলিফা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে পৃথকভাবে কাতার সফর করেন।

সংক্ষেপে, দোহার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তিন জিসিসি সদস্য দেশের সঙ্গে ২০১৪ সালের সংকটের পর চুক্তি মোতাবেক সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নতি করছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারল জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ২০১৪ সালে নতুন অধ্যায় উন্মোচনের যে পদক্ষেপ, তা সাময়িক বিরামের বেশি কিছু ছিল না। তৎকালীন ওবামা প্রশাসনের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়ে অবরোধকারী দেশগুলো বিবাদ সাময়িক মিটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং ২০ বছর আগে কাতারের সঙ্গে ঘটা অসম্পূর্ণ ঘটনাটি পূর্ণ করতে আরেকটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়। হোয়াইট হাউসে একজন নতুন প্রেসিডেন্ট তাদের সমর্থনের পক্ষ নেয়, রিয়াদ এবং আবুধাবি সংঘাতকে নতুন করে শুরু করতে এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে আনতে উৎসাহী হয়।

কেন কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি অবরোধ : সব ধরনের চাপ সত্ত্বেও অনেককে বিস্মিত করে দিয়ে কাতার পাল্টা লড়াই চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দুঃখজনক অবরোধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে দেশটি সংঘবদ্ধ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করে। মূল লক্ষ্য ছিল সংঘাতকে শীতল করে ফেলা এবং অবরোধকারী দেশগুলোর আরও শত্রুতামূলক পদক্ষেপ আটকে দেয়া। কাতারের প্রচেষ্টার মূল ফোকাস ছিল ওয়াশিংটন। কয়েক মাসের কঠোর প্রচেষ্টার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনে সফল হয় দোহা।

অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নিজের নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি আদায়ে সক্ষম হয় কাতার। ৩০ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র-কাতার প্রথম বার্ষিক কৌশলগত সংলাপের পর নিজেদের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ। যাতে ‘জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে কাতারের সীমানাগত অখণ্ডতা রক্ষায় যে কোনো ধরনের বহিঃহুমকি মোকাবেলায় দেশটির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করা হয়।

ভিন্ন আরেকটি ফ্রন্টে, কাতার তুরস্কের সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তি বাস্তবায়ন করে, যা ২০১৪ সালের সংকটের সময় স্বাক্ষর করা হয়েছিল। এতে কাতারে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বিস্তৃত করার অনুমোদন দেয়া হয়। চার দেশের কঠোর অবরোধের কারণে দোহামুখী ফ্লাইট আসা-যাওয়ার জন্য ইরানের আকাশপথ ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় তেহরানে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে ফেরত পাঠায় কাতার। এর বাইরে অবরোধকারী দেশগুলোর মধ্য দিয়ে সরবরাহ রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরান হয়ে পড়ে কাতারের খাবার, পানি ও ওষুধ সরবরাহের একমাত্র পথ। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য গত বছরজুড়ে ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।

এভাবে একদা অবরোধকারী দেশগুলোর অভিলাষ ঠিক বিপরীতমুখী ফল দেয়। ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক কমানোর পরিবর্তে অবরোধ এটিকে আরও শক্ত করার দিকে ধাবিত করে। একইসঙ্গে কাতারে সামরিক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো উপসাগরীয় নিরাপত্তার অংশ হয় তুরস্ক। আল-জাজিরা এখনও সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং অবরোধ আরোপকারী দেশগুলোর সমালোচনামূলক নানা রিপোর্ট প্রকাশ করছে।

কাতারের ইমেজ সংকটের জন্য সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের বহু মিলিয়ন ডলারের জনসংযোগ প্রচারণা এবং দেশটির কিছু কার্যক্রমকে সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রমাণের প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। জিসিসিভুক্ত দুটি দেশ গোপন তথ্যযুদ্ধ উসকে দিয়েছিল কাতারকে চাপে ফেলতে ও দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করতে। তারা অনেক পিআর ফার্ম, লবিং গ্রুপ ভাড়া করে এবং অনেক থিঙ্কট্যাংককে অর্থ দেয় কাতারবিরোধী প্রকাশ্য প্রোগ্রাম চালানোর জন্য।

সৌদি আরব ও আরব আমিরাত রাজনৈতিক পরামর্শক ফার্মও নিয়োগ করেছিল। যেমন- এসসিএল গ্রুপের সাবসিডিয়ারি ও ক্যামব্রিজ অ্যানালাইটিকাকে ভাড়া করেছিল কাতারবিরোধী মিডিয়া প্রচারণা চালানোর জন্য। এসব প্রচেষ্টা খুব কমই ফল দিয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে আর্থিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে কাতার তাদের ফাঁদে ফেলেছে।

অবশ্য অবরোধের কারণে কাতারকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে, যা ব্লুমবার্গের অনুমান মতে ৪৩ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু এতে দেশটি যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বাধীন হয়েছে। বস্তুত, বেশিরভাগ কাতারি আজ বিশ্বাস করে যে তারা নিজেদের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

আলজাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

মারওয়ান কাবালান : আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের পলিসি অ্যানালাইসিস পরিচালক