কারাগারের অনেক পুরনো বাসিন্দা আমি : আসিফ

../news_img/61369 mri.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক :: তৃতীয় দিন সেলে সেলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি যেদিন গ্রেফতার হই, ওইদিন আমার বিদেশি বন্ধু আর বড় ভাইরা একসঙ্গেই সাহরি করার কথা। তৃতীয় দিন এলেন মালয়েশিয়ার আনিস ভাই আর কুমিল্লার জসিম ভাই। তারা এসে পিসিতে (প্রিজনারস ক্যাফেটেরিয়া) টাকা জমা দিলেন।

অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শিখে গেলাম। প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে লিস্ট বানিয়ে দিলাম। সাক্ষাৎ শেষে কারা কেবিনের পথে যেতে হাজারো কয়েদির ভিড়ে পড়ে আমার সঙ্গে থাকা শাওন হারিয়ে গেল।

কয়েদিদের উচ্ছ্বাস স্লোগান আর সেলফিমুক্ত পরিবেশে কেবিনে ফিরলাম। এখন আর খারাপ লাগছে না, মনে হচ্ছিল এই কারাগারের অনেক পুরনো বাসিন্দা আমি।

ওপরের কথাগুলো জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী আসিফ আকবরের। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তেজগাঁও থানায় সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী শফিক তুহিনের করা একটি মামলায় আসিফকে গ্রেফতার করা। গ্রেফতারের পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে কীভাবে কেটেছে আসিফের সময়। এ বিষয়ে কারামুক্তির পর নিজের ফেসবুকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন এই জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী।

ফেসবুকে আসিফ শেয়ার করা কথাগুলো  পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

আসিফ লিখেছেন, সকালে ঘুম থেকে উঠতে চাই না, দিন বড় হয়, ঝামেলাও বড় হয়। দুপুরের আগে আমাকে দেখতে আসলেন আগে থেকেই কারাবন্দি ভাই-ব্রাদাররা, তাদের পেয়ে ভালো লাগল।

তারপর অফিস কলে চলে এলাম, ঢাকা থেকে আমার বস শওকত আলী ইমন ভাই এসেছেন, প্রথম ভিজিটর, সঙ্গে স্বপ্ন প্রধান ভাই আর গীতিকার দ্বীপ। আলাপের ফাঁকে ইমন ভাই সমস্যা সমাধানে জোর দিচ্ছিলেন। উনার পরিকল্পনা শেয়ার করলেন।

তারপর এলো রণ রুদ্র আর বেগম। তাদের সঙ্গেও সময় কাটালাম, ছেলেদের মানসিকতা দৃঢ়। বেগমকে শুধু বলে দিলাম– কোন Deal এ যাওয়া যাবে না। কাউকে ঘুষ দেয়ার জন্য আমার পরিশ্রমের রোজগার না। প্রয়োজনে আমি আরও জেলে থাকব, কারো কাছে মাথানত করার সুযোগ নেই। সততাই আমার শক্তি, আইনি প্রক্রিয়ায়ই নিজেকে অভিযোগের খড়গমুক্ত করব।

ফেসবুকে আড্ডা আর খেলা দেখার কথা উল্লেখ্য করে আসিফ লেখেন, ফিরে এলাম কেবিনে, জমে গেল আড্ডা। সন্ধ্যায় ইফতারি আর রাতে খাবার একসঙ্গে করলাম সবাই। একসঙ্গে বাংলাদেশের খেলা দেখলাম , তুমুল আড্ডা শুরু হলো। একে একে সবাই নিজেদের পরিচয় এবং এখানে আসার বিবরণ দেয়া শুরু করল। ছোট্ট সবুজ (ছদ্মনাম) কীভাবে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হয়ে উঠল।

রাজনৈতিক গডফাদার, পরিবারের অসহায়ত্ব, নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলতে বলতে মানুষ শিশু হয়ে গেলেন। তাদের কথাবার্তা হাসিঠাট্টা, আবার ছোট বাচ্চা, মা স্ত্রীর জন্য হাহাকারের অনুভূতি আমাকে মুগ্ধ করেই যাচ্ছে। এরা আসলেই অপরাধী নয়, সমাজ এবং সিস্টেম তাদের অপরাধী বানিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৫ জুন রাত দেড়টায় তেজগাঁওয়ের এফডিসি এলাকায় নিজ স্টুডিও থেকে আসিফ আকবরকে গ্রেফতার করে সিআইডির একটি টিম।

পরে সিআইডি জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তেজগাঁও থানায় সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী শফিক তুহিনের করা একটি মামলায় আসিফকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

শফিক তুহিন মামলার এজাহারে অভিযোগ করেছেন, গত ১ জুন রাত ৯টার দিকে চ্যানেল ২৪-এর সার্চলাইট নামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, আসিফ আকবর অনুমতি ছাড়াই তার সংগীতকর্মসহ অন্যান্য গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর ৬১৭টি গান সবার অজান্তে বিক্রি করেছেন।

পরে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, আসিফ আকবর আর্ব এন্টারটেইনমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে অন মোবাইল (প্রা.) লিমিটেড কনট্যান্ট প্রোভাইডার, নেক্সনেট লিমিটেড গাক মিডিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গানগুলো ডিজিটাল রূপান্তরে ট্রু-টিউন, ওয়াপ-২, রিংটোন, পিআরবিটি, ফুলট্রেক, ওয়াল পেপার, অ্যানিমেশন, থ্রিজি কনট্যান্ট ইত্যাদি হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যবহার করে অসাধুভাবে ও প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে।

পরে ১১ জুন সোমবার বিকাল ৪টায় কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান জনপ্রিয় এ শিল্পী।